আহমেদ সোহেল বাপ্পী
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৬, ০৯:১৭ পিএম
আপডেট : ২১ জুন ২০২৬, ০৯:২২ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

একটি কিডনি, এক জীবন এবং একজন বাবা

প্রতীকী ছবি : সংগৃহীত
প্রতীকী ছবি : সংগৃহীত

মধ্য সমুদ্রের বুকে একটা ক্ষুদ্র নৌকা। চারদিকে শুধু জল, অসীম, নির্মম ও নিঃশব্দ। কোনো তীর নেই, কোনো আলো নেই, কোনো ভরসা নেই। শুধু আছেন এক বাবা, আর তার বুকে লেপ্টে আছে একটা অসুস্থ ছেলে। ছেলেটির নাম ইয়াহিয়া। কিডনি রোগ তার শরীর থেকে প্রতিদিন একটু একটু করে জীবন কেড়ে নিচ্ছে। প্রতি মাসে ডায়ালাইসিস করতে হয়, লাগছে ১২০০ ইউরো — একজন নির্মাণ শ্রমিকের কাছে যা স্বপ্নের চেয়েও দূরের কিছু।

হতভাগা সেই বাবার নাম আব্দুল আজিজ। তিনি অনেক চেষ্টা করেছেন। হাতজোড় করেছেন, দরজায় দরজায় গেছেন। হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে শুনেছেন একই কথা বারবার— ‘টাকা নেই তো ব্যবস্থা নেই।’ লেবাননের ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামনে একজন গরিব বাবার প্রার্থনা পৌঁছায় না। আর কোনো কূল না পেয়ে আব্দুল আজিজ সিদ্ধান্ত নিলেন— নিজের কিডনি দেবেন ছেলেকে। কারণ? কারণ নেই আসলে। একজন বাবা কখনো হিসাব করেন না কেন তিনি সন্তানের জন্য সব দিয়ে দেন। এটা সিদ্ধান্ত নয়, এটা তার স্বভাব।

নিজের শেষ সঞ্চয় ও পরিবারের জমানো টাকা, সব মিলিয়ে পাঁচ হাজার ইউরো জোগাড় হলো। স্ত্রী আর আট সন্তানকে গ্রামে রেখে তিনি বেরিয়ে পড়লেন। বেরিয়ে পড়ার সময় স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন কি না, জানা নেই। হয়তো তাকাননি— তাকালে হয়তো পা আর সরত না। ছোট মেয়েগুলো জানত না বাবা কোথায় যাচ্ছেন। শুধু বড় মেয়েটা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বাবার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল, যেন মনে মনে বলছিল, ‘ফিরে এসো, বাবা’।

একদিন ভোরবেলা ইয়াহিয়াকে বুকের কাছে নিয়ে আব্দুল আজিজ উঠলেন একটা কাঠের নৌকায়। গন্তব্য সাইপ্রাস। সঙ্গে কিছু খেজুর, সামান্য পানি। দালালরা বলেছিল, বেশিক্ষণ লাগবে না। কিন্তু সমুদ্রের কাছে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।

প্রথম দিন গেল। দ্বিতীয় দিন গেল। তৃতীয় দিন সকালে খাবার শেষ হয়ে গেল।

ইয়াহিয়া বলল, ‘বাবা, পানি।’ আব্দুল আজিজ আকাশের দিকে তাকালেন। তৃষ্ণায় তার নিজের গলাও ফেটে যাচ্ছে। তবু ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘একটু পরেই আসবে, জান। একটু পরেই।’ মিথ্যে কথা। কিন্তু এই মিথ্যেটুকু ছাড়া সেই মুহূর্তে আর কী দেওয়ার ছিল তার? রাতে যখন ইয়াহিয়া ঘুমিয়ে পড়ত ক্লান্তিতে, আব্দুল আজিজ জেগে থাকতেন। নৌকার দুলুনিতে নিজের শরীরটাকে দেয়ালের মতো ধরে রাখতেন, যাতে ছেলেটা একটু আরাম করে শুতে পারে। নিজের ঘুমের কথা তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন।

চতুর্থ দিন বৃষ্টি নামল। আব্দুল আজিজ নিজের দুই হাত পেতে দিলেন আকাশের দিকে। বৃষ্টির পানি জমল হাতের তালুতে। সেই হাত এগিয়ে দিলেন ছেলের ঠোঁটের কাছে। ‘খা, বাবা।’ ইয়াহিয়া পানি খেল। আব্দুল আজিজ শূন্য হাত নামিয়ে রাখলেন। নিজের ঠোঁট দুটো তখনো শুকনো, ফাঁটা, কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই।

পাঁচ মিটার উঁচু ঢেউ এলো। নৌকা যেন আকাশে উঠে গেল, তারপর পাতালে। ইয়াহিয়া চিৎকার করে বাবার হাত চেপে ধরল। আব্দুল আজিজ সেই ছোট্ট হাতটা বুকের ভেতর চেপে নিলেন— যেভাবে মানুষ বাঁচাতে চায় সবচেয়ে দামি জিনিসটাকে।

সপ্তম দিন। শরীরে আর শক্তি নেই। ইয়াহিয়া অচেতনের মতো বাবার কোলে পড়ে আছে। শুকনো ঠোঁট, বসে যাওয়া গাল, বন্ধ চোখ। আব্দুল আজিজ মনে মনে বললেন, ‘না। তোকে ছাড়ব না। এখনো না।’ তারপর দিগন্তে একটা কালো বিন্দু দেখা গেল। একটা জাহাজ।

তারা উদ্ধার পেলেন। সাইপ্রাসে পৌঁছালেন। জাহাজের নাবিকরা যখন ইয়াহিয়াকে কোলে তুলে নিচ্ছিলেন, আব্দুল আজিজ ছেলেকে ছাড়তে চাইছিলেন না। সাত দিনের সেই আঁকড়ে ধরাটা যেন তার হাতের পেশিতে গেঁথে গিয়েছিল। একজন নাবিক পরে বলেছিলেন, ‘আমি অনেক উদ্ধার অভিযানে ছিলাম, কিন্তু ওই বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে আমি নিজেও কেঁদে ফেলেছিলাম।’

দুই বছর পর ২০০৫ সালে গ্রিসের একটি ট্রান্সপ্লান্ট সেন্টারে অপারেশন টেবিলে শুয়ে আব্দুল আজিজ সেই কাজটি করলেন, যার জন্য সমুদ্র পেরিয়েছিলেন। নিজের শরীর থেকে একটা কিডনি বের করে দিলেন ছেলের শরীরে। অপারেশনের পর যখন ইয়াহিয়া চোখ খুলল, বাবা পাশে বসে ছিলেন। শরীরে ব্যথা, চোখে ক্লান্তি। কিন্তু মুখে একটা হাসি, যে হাসির কোনো নাম হয় না।

আজ ইয়াহিয়া বেঁচে আছে। স্কুলে যায়। বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ায়। হয়তো কখনো সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে, বোঝার চেষ্টা করে সেই সাত দিন তার বাবার বুকের ভেতর কী চলছিল। সে কোনোদিন বুঝবে না পুরোটা। কারণ, বাবার ভালোবাসা ভাষায় ধরা যায় না, এটা সমুদ্রের গভীরতার মতো, দেখা যায় না, কিন্তু সব কিছু ধরে রাখে।

এই গল্পটা যখনই কোথাও শেয়ার হয় মন্তব্যের ঘরে একই দৃশ্য বারবার ফিরে আসে। কেউ লেখেন, ‘পড়তে পড়তে চোখ ভিজে গেল, নিজের বাবার কথা মনে পড়ল।’ কেউ লেখেন, ‘আমার বাবাও এমনই ছিলেন, কখনো বুঝতে দেননি কতটা কষ্ট করেছেন আমাদের জন্য।’ আবার কেউ লেখেন, ‘এই গল্প পড়ার পর বাবাকে একটা ফোন করলাম, শুধু বললাম— ভালোবাসি।’

এটাই হয়তো এমন গল্পের আসল শক্তি— এরা শুধু একজন বাবার কথা বলে না, প্রতিটি পাঠকের নিজের বাবাকেও মনে করিয়ে দেয়।

আজ, এই দিনে আব্দুল আজিজ কোনো বীর নন। তিনি একজন সাধারণ মানুষ, যার পকেটে টাকা ছিল না, ক্ষমতা ছিল না, পরিচয় ছিল না। শুধু ছিল একটাই সংকল্প— ছেলেকে বাঁচাতে হবে।

পৃথিবীর প্রতি বাবা যিনি ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে রোজগারের জন্য বেরিয়ে পড়েন, যিনি নিজের শখ ভুলে সন্তানের স্কুলের বেতন জমান, যিনি অসুস্থ হয়েও মুখে বলেন, ‘আমি ঠিক আছি, তুই পড়াশোনায় মন দে’, যিনি নিজের প্রিয় খাবারের ভাগটাও সন্তানের পাতে তুলে দেন বলে কখনো নিজে তৃপ্তি করে খেতে পারেন না তাঁরা প্রত্যেকেই আব্দুল আজিজ। শুধু সমুদ্র আলাদা, ঝড় আলাদা, কিন্তু লড়াইটা একই।

আজকের এই দিনে, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে উঠছে বাবাকে নিয়ে লেখা স্ট্যাটাস আর ছবিতে, তখন একটা প্রশ্ন থেকেই যায়— বছরের বাকি ৩৬৪ দিন কি আমরা বাবাকে ঠিক ততটাই মনে রাখি? নাকি ভালোবাসাটা শুধু একটা দিনের ক্যাপশনে আটকে থাকে? আব্দুল আজিজের মতো লাখ লাখ বাবা প্রতিদিন নিঃশব্দে নিজের জীবনের একটা অংশ বিলিয়ে দিচ্ছেন। কেউ সমুদ্র পেরিয়ে, কেউ প্রবাসের নির্জন ঘরে একা থেকে, কেউ ভাঙা শরীর নিয়ে রিকশার প্যাডেলে। তাদের কারো গল্প খবরের শিরোনাম হয় না, কারো ছবি ভাইরাল হয় না। কিন্তু তাঁদের ত্যাগ সমান মূল্যবান।

পৃথিবীতে ভালোবাসা অনেক রকমের আছে। কিন্তু বাবার ভালোবাসা একটু আলাদা। এই ভালোবাসা কথা বলে না, গান গায় না, ফুল দেয় না। এই ভালোবাসা শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। ঝড়ে, অন্ধকারে, সমুদ্রের মাঝে দাঁড়িয়েই থাকে। সন্তানের পাশে। বাবা তো, বাবার এমনই হয়।

আজ যার বাবা পাশে আছেন, তাকে একবার জড়িয়ে ধরুন। আর যার বাবা আর নেই, তিনি হয়তো আজ আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু একবার বলবেন— ‘ভালো থেকো, বাবা। তোমার ভালোবাসা এখনো আমাকে বাঁচিয়ে রাখে।’

শুভ বিশ্ব বাবা দিবস, পৃথিবীর প্রতিটি বাবার জন্য।

লেখক : মানবধিকার কর্মী, গবেষক পর্যবেক্ষক গণতন্ত্র সীমান্তহীন প্যারিস, ফ্রান্স

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ছুরিকাঘাতে শিবির নেতাকে হত্যা, যুবদলের মুকুল বহিষ্কার

দেশের নারী উদ্যোক্তা আন্দোলনের অগ্রদূত সেলিমা আহমাদ

ভোর চারটায় উঠে কারখানায় যাওয়া সেই শ্রমিকই বিশ্বকাপের নকআউটে তুললেন জার্মানিকে

অফসাইডে বাতিল হলো ইরানের গোল

মেসিকে ছাড়িয়ে রেকর্ড বইয়ে ইয়ামাল

পেলের ৬৮ বছরের রেকর্ডে ভাগ বসালেন ইয়ামাল

বাংলাদেশকে ১ হাজার ফুটবল উপহার দিল পাকিস্তান

বিস্ফোরণের সূত্র ধরে কবরস্থানে অভিযান, এক বালতি ককটেল উদ্ধার

সৌদির জালে ৪ গোল দিয়ে বুঝিয়ে দিল স্পেন আছে স্পেনেই

স্বামী পরিত্যাক্তা নারীকে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যা, বৃদ্ধ গ্রেপ্তার

১০

মালয়েশিয়ায় বন্দি বাংলাদেশিদের ফেরানোর আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর

১১

মিয়ানমারে আটক ২৭ বাংলাদেশিকে ফেরাতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা

১২

তুরস্ক, হাইতি ও তিউনিসিয়া যে কারণে বিশ্বকাপ থেকে বাদ

১৩

বারান্দা থেকে পড়ে অভিনেত্রী ঝিলিকের মৃত্যু, স্বামীর জামিন নামঞ্জুর

১৪

আকাশ পথে ইয়াবা পাচারকালে নারী আটক

১৫

আর্জেন্টিনা-অস্ট্রিয়ার কতবার দেখা হয়েছিল, গোল কয়টি ও জয় বেশি কার?

১৬

চমক দিয়ে দল ঘোষণা করল ভারত

১৭

একসঙ্গে ৫ প্রবাসীর মৃত্যুতে শোকে কাতর গ্রামবাসী

১৮

২৪ মিনিটেই স্পেনের ৩ গোল

১৯

ছয় জেলায় বজ্রপাতে তিন মাদ্রাসাছাত্রসহ ১১ জনের মৃত্যু

২০
X