

প্রযুক্তির অগ্রগতিতে এখন ভারী বৃষ্টি, লঘুচাপ কিংবা সম্ভাব্য বন্যার পূর্বাভাস অনেক আগেই পাওয়া যায়। আবহাওয়া অধিদপ্তর নিয়মিত পূর্বাভাস দেয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি এবং বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আগাম সতর্কবার্তা প্রকাশ করে। অর্থাৎ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি সম্পর্কে রাষ্ট্র আগে থেকেই ধারণা রাখে। প্রশ্ন হলো, তাহলে প্রতি বছর একই মৌসুমে লাখো শিক্ষার্থীকে কেন অনিশ্চয়তার মধ্যে পাবলিক পরীক্ষায় বসতে হবে?
এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা শুধু পরীক্ষা স্থগিত হবে কি না—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। বিষয়টি আসলে বাংলাদেশের শিক্ষা পরিকল্পনা জলবায়ু বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি বলেছে, ১২ লাখ ৭০ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী, ১১টি শিক্ষা বোর্ড এবং অভিন্ন প্রশ্নপত্র ব্যবস্থার কারণে একটি অঞ্চলের সমস্যায় সারা দেশের পরীক্ষা স্থগিত করা বাস্তবসম্মত নয়। প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই যুক্তির ভিত্তি রয়েছে। পরীক্ষা পেছালে ফল প্রকাশ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি এবং সামগ্রিক শিক্ষা ক্যালেন্ডারেও প্রভাব পড়তে পারে।
তবে এই যুক্তির পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। যদি জুলাই মাসে প্রতিবছর অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি থাকে, তাহলে সেই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে একাডেমিক ক্যালেন্ডার পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে না কেন?
আবহাওয়া অধিদপ্তর ইতোমধ্যে জানিয়েছে, কয়েক দিনের বিরতির পর ১৭ জুলাই থেকে আবারও সারা দেশে বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে। মাসের শেষ দিকে বঙ্গোপসাগরে নতুন লঘুচাপ সৃষ্টিরও সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি নদীর পানি বৃদ্ধির কথা জানিয়ে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কার কথা বলেছে।
অর্থাৎ পরিস্থিতি আকস্মিক নয়; এটি পূর্বানুমেয়।
এই বাস্তবতায় শিক্ষার্থীদের শুধু নির্ধারিত সময়ের আগেই পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানোর পরামর্শ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। কোথাও যদি একজন পরীক্ষার্থী হাঁটুসমান পানি পেরিয়ে, নৌকায় চড়ে বা ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ব্যবহার করে কেন্দ্রে পৌঁছায়, আর অন্য অঞ্চলের পরীক্ষার্থী স্বাভাবিক পরিবেশে পরীক্ষা দেয়, তাহলে তাদের জন্য পরীক্ষার সুযোগ বাস্তবে সমান থাকে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়। বরং বর্ষা আরও অনিয়মিত ও তীব্র হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশও নিজেদের জলবায়ুগত বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে শিক্ষাবর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার সময় নির্ধারণ করে। বাংলাদেশেও দীর্ঘমেয়াদে সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
সমাধান অবশ্যই প্রতি দুর্যোগে সারা দেশের পরীক্ষা স্থগিত করা নয়। বরং এমন একটি পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি, যা জলবায়ু-সহনশীল। বড় পাবলিক পরীক্ষা তুলনামূলক অনুকূল মৌসুমে আয়োজন, দুর্যোগপ্রবণ এলাকার জন্য বিকল্প সময়সূচি বা ‘রিজার্ভ ডে’ রাখা এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সীমিত পরিসরে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার মতো বিষয়গুলো নীতিনির্ধারণে বিবেচনা করা যেতে পারে।
সরকার ইতোমধ্যে পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা জানুয়ারিতে এবং এইচএসসি পরীক্ষা জুনে শুরু হবে। তবে প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের এইচএসসি পরীক্ষা চলবে ৬ জুন থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত। অর্থাৎ পরীক্ষার একটি বড় অংশ এখনও বর্ষা মৌসুমের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে।
বাস্তবতা হলো, ২০২৪-২৫—দুই বছরই বন্যার কারণে এইচএসসি পরীক্ষা ব্যাহত হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার পরও যদি পরীক্ষার সময়সূচি এমন থাকে, যেখানে একই ধরনের ঝুঁকি বহাল থাকে, তাহলে ভবিষ্যতেও একই বিতর্ক ফিরে আসার আশঙ্কা থেকে যায়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকানো সম্ভব নয়। কিন্তু সেই দুর্যোগের প্রভাব কমিয়ে আনার মতো পরিকল্পনা করা সম্ভব। শিক্ষা প্রশাসনের লক্ষ্য শুধু নির্ধারিত দিনে পরীক্ষা নেওয়া নয়; এমন একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেখানে কোনো শিক্ষার্থী ভৌগোলিক অবস্থান বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না পড়ে।
প্রতি বছর যদি একই মৌসুমে একই প্রশ্ন ফিরে আসে, তাহলে সমস্যাটি আর শুধু আবহাওয়ার নয়; পরিকল্পনারও। তাই এখনই সময় বাংলাদেশের একাডেমিক ক্যালেন্ডারকে জলবায়ু বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে পুনর্বিবেচনা করার। দীর্ঘমেয়াদে সেটিই হবে শিক্ষার্থী, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্র—সবার জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ।
লেখক : সিনিয়র সহকারী পরিচালক, ইউজিসি