

নিদাঘ সূর্যের প্রচণ্ড উত্তাপে তপ্ত ধরণীতে এক টুকরো শীতল ছায়া যেমন প্রশান্তি আনে, সন্তানের জীবনে পিতার অস্তিত্ব ঠিক তেমনই। তপ্ত মরুর বুকে পরম আশ্রয়ের এক বিশাল বটবৃক্ষ হলেন বাবা। ইসলামে পিতাকে দেওয়া হয়েছে এক অনন্য ও সুউচ্চ মর্যাদা, যা অন্য কোনো আদর্শ বা জীবনব্যবস্থায় খুঁজে পাওয়া ভার। সন্তানের অস্তিত্বের শেকড় এই বাবার সন্তুষ্টির মাঝেই নিহিত রয়েছে মহান রবের সন্তুষ্টি।
বংশ পরিচয় ও ইসলামে পিতার অবস্থান
ইসলামে বাবার সম্মান-মর্যাদাকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে, আপন বাবা ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে নিজের জন্ম পরিচয় বা বংশধারা সম্পৃক্ত করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, নিছক শ্রদ্ধা বা ভক্তি প্রদর্শনের ছলে হলেও জন্মদাতা ছাড়া অন্য কাউকে বাবা বলে সম্বোধন বা পরিচয় দেওয়া ইসলামি শরিয়তে গর্হিত কাজ। এই দৃঢ় অবস্থানের মাধ্যমেই ইসলাম বুঝিয়ে দিয়েছে, একজন মানুষের আত্মপরিচয় ও সম্মানের মূল ভিত্তি হলেন তার পিতা।
আল্লাহর সন্তুষ্টির সোপান
পিতার মর্যাদা সম্পর্কে বিশ্বনবী রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘বাবার সন্তুষ্টিতে আল্লাহতায়ালা সন্তুষ্ট হন; আর বাবার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহতায়ালা অসন্তুষ্ট হন’। (তিরমিজি: ১৮৯৯)
সন্তানের জন্য জান্নাত লাভের পথ কতটা অবারিত, তা নির্ভর করে বাবা-মায়ের প্রতি তার আচরণের ওপর। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমার পালনকর্তা আদেশ প্রদান করছেন যে, তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ বা উভয় যদি জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উহ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদের সঙ্গে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বলো’। (সুরা বনি ইসরাইল: ২৩)
জান্নাত লাভের সুবর্ণ সুযোগ
পিতা-মাতাকে বার্ধক্যে পেয়েও যারা তাদের সেবা করে জান্নাত নিশ্চিত করতে পারল না, তাদের জন্য হাদিস শরিফে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সে দুর্ভাগা! সে দুর্ভাগা!! সে দুর্ভাগা!!!’ সাহাবিগণ আরজ করলেন, সে কে? উত্তরে তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তি পিতা-মাতা উভয়কে অথবা যেকোনো একজনকে বৃদ্ধাবস্থায় পেয়েও (তাদের সেবা করে) জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না’। (মুসলিম শরিফ: ৬৬৭৫)
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, একদা রাসুল (সা.) বললেন, ‘আমি যখন মিম্বরের তৃতীয় সিঁড়িতে পা রেখেছি তখন জিব্রাইল (আ.) এসে বললেন, যে ব্যক্তি পিতা-মাতাকে বৃদ্ধাবস্থায় পেয়ে তাদের সেবা করে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না, সে ধ্বংস হউক। তখন আমি বললাম আমিন। (সুনানে তিরমিজী: ৩৫৪৫)।
প্রিয় আমলের মর্যাদা
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী করিম (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজ কোনটি? তিনি বললেন—
পিতার অবর্তমানে সন্তানের দায়িত্ব
পিতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য কেবল তার জীবদ্দশাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মৃত্যুর পরও তা জারি থাকে। বাবার বন্ধুদের সম্মান করাও বাবার প্রতি সম্মানেরই নামান্তর। আবু উসাইদ (রা.) বর্ণিত হাদিসে এসেছে, বনি সালামা গোত্রের এক ব্যক্তি মৃত্যুর পর বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে রাসুলুল্লাহ (সা.) পাঁচটি বিশেষ কাজের নির্দেশ দেন:
পিতার ১৪টি বিশেষ অধিকার
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী সন্তানের ওপর পিতা-মাতার মোট ১৪টি অধিকার রয়েছে।
জীবিত থাকাকালীন ৭টি অধিকার
তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, ভালোবাসা প্রকাশ, সেবা করা, আনুগত্য করা, তাদের সুখ-শান্তির চিন্তা করা, প্রয়োজন পূরণ করা এবং মাঝে মাঝে তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা।
মৃত্যুর পরবর্তী ৭টি অধিকার
তাদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করা, ঋণ পরিশোধ করা, আমানত আদায় করা, বৈধ অসিয়ত পূরণ করা, তাদের বন্ধু ও স্বজনদের সম্মান করা, তাদের সহযোগিতা করা এবং মাঝে মাঝে তাদের কবর জিয়ারত করা।
বাবা হলেন সেই বটবৃক্ষ, যার ছায়াতলে সন্তান নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পায়। একজন আদর্শ সন্তানের কর্তব্য হলো জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে বাবার সঙ্গে শিষ্টাচার বজায় রাখা এবং শরিয়তসম্মত প্রতিটি বিষয়ে তার আনুগত্য করা। আমাদের মনে রাখতে হবে, বাবার দোয়া যেমন সন্তানের জন্য আসমানি রহমত বয়ে আনে, তেমনি তার দীর্ঘশ্বাস সন্তানের ইহকাল ও পরকালকে বিপন্ন করে তুলতে পারে।