

জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার নির্মাণের আলোচিত প্রকল্প ‘ইন্সটলেশন অব ইআরএল ইউনিট-২ (ইআরএল-২)’ বাস্তবায়নে সরকার বিশেষ তহবিল গঠন করতে যাচ্ছে। এ প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগ না পাওয়ার কারণে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এ তহবিল গঠনের জন্য সব ধরনের জ্বালানি তেলের লাভ থেকে লিটারপ্রতি ২ টাকা করে রাখা হবে। শিগগির এ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে গেজেট প্রকাশ করা হবে। জ্বালানি বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এ তথ্য জানান।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের (ইএমআরডি) সচিব মো. সাইফুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, এ তহবিল ইআরএল-২-এর ঋণ পরিশোধ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর ও শুল্ক পরিশোধে ব্যবহার হবে।
জ্বালানি বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ইআরএল-২ প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনা চললেও কার্যত বাস্তবায়নে অগ্রগতি খুবই সামান্য। এ প্রকল্পের জন্য বিনিয়োগকারী খোঁজা হলেও তা পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর নিজস্ব অর্থ ও ঋণ নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে কাজ শুরু করেছে। এজন্য জ্বালানি তেল বিক্রির লভ্যাংশ থেকে লিটারপ্রতি ২ টাকা দিয়ে একটি বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২ টাকার মধ্যে ১ টাকা ব্যয় হবে প্রকল্পটির বিপরীতে নেওয়া ঋণ পরিশোধে এবং বাকি ১ টাকা এনবিআরের কর ও শুল্ক পরিশোধের জন্য।
ইআরএল-২-এর আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৪২ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। এ ব্যয়ের মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ২৯ দশমিক ৩ শতাংশ দেবে। বাকি অর্থ সরকার দেবে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে এ প্রকল্পটি শুরু করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
এদিকে, ইআরএল-২ প্রকল্পটির জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করেছে বিপিসি। আগামী ডিসেম্বর নাগাদ দরপত্র আহ্বান করা হবে। বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, ৫৬ বছর আগে নির্মিত বাংলাদেশের একমাত্র তেল শোধনাগারটির পরিশোধন ক্ষমতা দেড় মিলিয়ন টন, যা দেশের জ্বালানি চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ পূরণ করে। নতুন তেল শোধনাগারটি অতিরিক্ত ৩ মিলিয়ন টন পরিশোধন করবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা দেশের জ্বালানি চাহিদার ৬০ শতাংশ পূরণ করবে। পাশাপাশি ইআরএল-২ রিফাইনারিটিতে ইউরো-৫ মানের জ্বালানি তেল উৎপাদন করা হবে, যা পরিবেশবান্ধব। এ ছাড়া ইআরএল-২ দুটি নতুন পণ্য—লুব বেস অয়েল এবং কম সালফারযুক্ত জ্বালানি তেল (১০ পিপিএমের নিচে) উৎপাদন করবে। এ ছাড়া তরল বর্জ্য পরিশোধনের জন্য একটি আধুনিক ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) থাকবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ইআরএল-২ চালু হওয়ার পর সরকার প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলে প্রায় ১৯ ডলার সাশ্রয় করার আশা করছে। প্রকল্পটি অপরিশোধিত তেল সংরক্ষণ ক্ষমতাও বাড়াবে, ইআরএলের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা জোরদার করবে এবং দক্ষতা উন্নত করবে। একই সঙ্গে এ রিফাইনারিটি সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিংয়ের (এসপিএম) সঙ্গে যুক্ত হলে অপরিশোধিত তেল খালাসের সময় ১৫ দিন থেকে কমে মাত্র দুদিনে নেমে আসবে। পাশাপাশি এ প্রকল্পের অধীনে ৪৩টি তেল সংরক্ষণ ট্যাঙ্ক এবং ২১টি অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণ ইউনিটও নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে বিপিসির।
এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর গত বছরের ২৯ আগস্ট বিশেষ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ আইনের অধীনে এস আলম গ্রুপের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ হিসেবে প্রস্তাবিত ইআরএল ইউনিট-২ প্রকল্পটি বাতিল করে দেয়। একই সঙ্গে প্রকল্পটির ডিপিপি বৈদেশিক মুদ্রার হালনাগাদ রেট অনুযায়ী প্রাক্কলন এবং সব ক্রয় পরিকল্পনা পিপিআর-২০০৮ অনুযায়ী প্রণয়নপূর্বক পরিকল্পনা কমিশনে পুনর্গঠিত ডিপিপি প্রেরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
জ্বালানি বিভাগে সূত্রে জানা গেছে, ক্ষমতাচ্যুত সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে প্রকল্পটিতে এস আলম গ্রুপকে যুক্ত করা হয়। গ্রুপটি এখানে বিনিয়োগের বিপরীতে ৫১ শতাংশ মালিকানা চেয়েছিল। তবে বিপিসি ৬০ শতাংশ মালিকানা সরকারের হাতে রাখার পক্ষে মত দেয়। পরে অংশীদারত্বের বিষয়টি চূড়ান্ত না করে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের সিদ্ধান্ত হয়। সমঝোতা স্মারকের খসড়াটি ভেটিংয়ের জন্য জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে পাঠানো হয় আইন মন্ত্রণালয়ে। এস আলম গ্রুপের অংশীদারত্বে পরিশোধনাগার নির্মাণ নিয়ে সম্মত ছিল না জ্বালানি বিভাগও। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চুক্তি বাতিলের প্রস্তাব করা হয়। বর্তমান ইস্টার্ন রিফাইনারির পরিশোধনাগারটি নির্মাণ করেছিল ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান টেকনিপ। নতুন পরিশোধনাগারটি তাদের মাধ্যমে করার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল সরকার। দেশে জ্বালানি তেল পরিশোধনের সক্ষমতা না বাড়ায় বেশি পরিমাণে ডিজেল আমদানি করতে হয়। এতে প্রতি বছর বাড়তি ডলার খরচ করতে হচ্ছে সরকারকে। বছরে ৬০ থেকে ৬৫ লাখ টন জ্বালানি তেল বিক্রি করে বিপিসি। এর মধ্যে ৪৬ লাখ টন ডিজেল। দেশের একমাত্র পরিশোধনাগারটি থেকে পাওয়া যায় ছয় লাখ টন ডিজেল, বাকিটা আমদানি করতে হয়।