

রাশিয়ার দুটি বৃহৎ তেল কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই নতুন নিষেধাজ্ঞা রুশ অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। কারণ মস্কোর কেন্দ্রীয় বাজেটের এক-চতুর্থাংশ আসে দেশটির তেল ও গ্যাস শিল্পের ট্যাক্স থেকে। তাদের এই তরঙ্গের প্রভাব রুশ ভূখণ্ডের বাইরেও অনুভূত হতে পারে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—রুশ তেলের বৃহৎ আমদানিকারক দেশ ভারতে কি এর প্রভাব পড়বে? এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া থেকে তেল আমদানি পর্যায়ক্রমে হ্রাস করতে পারে ভারত। তবে নিষেধাজ্ঞার কারণে ভারতে তেমন প্রভাব পড়বে না। কারণ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া রুশ কোম্পানি দুটি থেকে সরাসরি খুব বেশি তেল কেনে না ভারত। তারা মূলত বেশিরভাগ রুশ তেল মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কেনে।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার দুটি বৃহত্তম তেল কোম্পানির ওপর ‘ব্যাপক’ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া রুশ তেল কোম্পানি রোসনেফট ও লুকোয়েলকে ‘ওয়ার মেশিন বা যুদ্ধযন্ত্র’ আখ্যায়িত করে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট অভিযোগ করেন, এগুলো ক্রেমলিনকে ইউক্রেনের ব্যয় বহনে অর্থায়ন করছে।
বেসেন্ট এক বিবৃতিতে বলেন, এই অর্থহীন যুদ্ধ বন্ধ করতে পুতিনের অস্বীকৃতির পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ এ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
রোসনেফট ও লুকোয়েলের ওপর ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞা আসার এক সপ্তাহ পর এই মার্কিন বিধিনিষেধ এলো। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নও রাশিয়ার বিরুদ্ধে ১৯তম নিষেধাজ্ঞার প্যাকেজ অনুমোদন করেছে, যার মধ্যে রয়েছে রাশিয়ার এলএনজি আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা। যুক্তরাষ্ট্র রুশ এলএনজির একটি প্রধান ক্রেতা জাপানকেও দেশটির জ্বালানি আমদানি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধে সম্মত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তারা মস্কোর বিরুদ্ধে আরও পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। যদিও প্রেসিডেন্ট এতদিন পর্যন্ত রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা থেকে বিরত থেকেছেন বরং বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেছেন।
রাশিয়ার তেল ক্রেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব
এই নতুন নিষেধাজ্ঞা রুশ অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। কারণ মস্কোর কেন্দ্রীয় বাজেটের এক-চতুর্থাংশ আসে দেশটির তেল ও গ্যাস শিল্পের ট্যাক্স থেকে। তাদের এই তরঙ্গের প্রভাব রুশ ভূখণ্ডের বাইরেও অনুভূত হতে পারে। কারণ ওয়াশিংটন রুশ সরবরাহ পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার জন্য এই অঞ্চলের ওপর চাপ বৃদ্ধি করবে।
রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বৃহত্তম আমদানিকারক হচ্ছে ভারত ও চীন। বেইজিং ও নয়াদিল্লি মিলে মস্কোর বেশিরভাগ জ্বালানি আমদানি করে।
গত বছর চীন রেকর্ড ১০ কোটি টনের বেশি রুশ অপরিশোধিত তেল কিনেছে, যা বেইজিংয়ের মোট জ্বালানি আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ।
একইভাবে ২০২২ সালে ইউক্রেনে মস্কোর হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে ভারত সমুদ্রপথে রুশ অপরিশোধিত তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হয়ে উঠেছে। এ বছরের প্রথম ৯ মাসে প্রতিদিন প্রায় ১ দশমিক ৭ মিলিয়ন ব্যারেল আমদানি করেছে তারা। এ ধরনের আমদানির প্রতিশোধ হিসেবে ট্রাম্প ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করেছেন।
যাই হোক ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিশ্চিত করেছেন যে, দিল্লি রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমাবে। কারণ তিনিও ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান চান। তবে নয়াদিল্লি নিশ্চিত করছে যে, তাদের অগ্রাধিকার হলো অস্থির জ্বালানি পরিস্থিতিতে ভারতীয় গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা করা।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক জ্যেষ্ঠ নিষেধাজ্ঞা কর্মকর্তা এডওয়ার্ড ফিশম্যান বলছেন, নতুন নিষেধাজ্ঞার তাৎপর্য পরবর্তী ঘটনাগুলোর ওপর নির্ভর করছে।
এক্সে তিনি বলেন, ‘পরবর্তী পদক্ষেপের পর নির্ভর করছে এর ব্যাপকতা কেমন হবে; যুক্তরাষ্ট্র কি চীনের ব্যাংক, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ব্যবসায়ী ও রোসনেফট ও লুকোয়েলের সঙ্গে লেনদেনকারী ভারতীয় শোধনাগারগুলোর ওপর দ্বিতীয় দফায় নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেবে?’
তিনি আরও বলেন, আমি আশা করি অন্তত স্বল্পমেয়াদে রুশ তেল আমদানি থেকে কিছুটা পিছিয়ে আসা সম্ভব হবে।
এরই মধ্যে রয়টার্স বলছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর রোসনেফট ও লুকোয়েল থেকে সরাসরি যাতে কোনো সরবরাহ না আসে, তা নিশ্চিত করতে ভারতীয় রাষ্ট্রীয় জ্বালানি পরিশোধকরা তাদের রুশ তেল বাণিজ্যের নথিগুলো পর্যালোচনা করছে।
যদিও এখন পর্যন্ত ভারতীয় কোম্পানিগুলো এ বিষয়ে কোনো বিবৃতি জারি করেনি। বাণিজ্য সূত্র জানিয়েছে, ভারতীয় রাষ্ট্রীয় পরিশোধকরা খুব কমই সরাসরি রোসনেফট ও লুকোয়েল থেকে সরাসরি রুশ তেল কেনে না। তারা বেশিরভাগ তেল কেনে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে।
রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া
রাশিয়া বলছে যে, তাদের তেল শিল্পের ওপর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে এবং এর বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করেছে।
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা এক ব্রিফিংয়ে বলেছেন, আমরা এই পদক্ষেপটিকে ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান অর্জনের প্রয়োজনীয়তাসহ বিভিন্ন বিষয়ের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছি।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশ পশ্চিমা বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করেছে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মস্কো তার জ্বালানিসহ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিকাশ অব্যাহত রাখবে।’