বিশ্ববেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:০২ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ট্রাম্পের ‘সর্বগ্রাসী চাওয়া’ ভেস্তে দিতে পারে ইরান আলোচনা

মাসকাটে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা শুরু
দুই দেশের পতাকা। ছবি: সংগৃহীত
দুই দেশের পতাকা। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন নতুন আলোচনায় বসতে যাচ্ছে কঠোর ও সর্বোচ্চ দাবির এক তালিকা নিয়ে। তবে এই আলোচনার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক কৌশল কী, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে এসব কথা বলেছেন বিশ্ব রাজনীতি বিশ্লেষকরা।

গতকাল শুক্রবার ওমানের রাজধানী মাসকাটে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, সেটি গত বছরের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর প্রথম বৈঠক। এই বৈঠকে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অংশ নিচ্ছেন।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের এটি আরেকটি অধ্যায়। শুরুতে ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন চুক্তি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধ এবং এরপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কারণে সেই আলোচনা ভেঙে পড়ে।

গত বছরের ডিসেম্বরে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় ট্রাম্প বারবার আরও সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দেন এবং ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জোরদার করেন। এরপর ইরানের উপকূলে বিপুল সামরিক শক্তি মোতায়েন করেন ট্রাম্প।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি আগেও অনুসরণ করা এক ধরনের কৌশল। এর আগেই ইরানে হামলা এবং ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নেওয়ার আগে একই ধরনের সামরিক প্রস্তুতি দেখা গিয়েছিল।

জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য অধ্যয়ন বিভাগের পরিচালক সিনা আজোদি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, ইরান এখন দুর্বল অবস্থায় আছে। তাই তারা মনে করছে, এখনই সর্বোচ্চ দাবি তোলার সেরা সময়। এতে তারা যত বেশি সম্ভব ছাড় আদায় করতে চায়।

এই দাবিগুলোর মধ্যে শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা নয়, পাশাপাশি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং আঞ্চলিক যেসব গোষ্ঠীকে যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রক্সি’ বলে তাদের প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধ করার বিষয়ও রয়েছে। মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের এই বিস্তৃত এজেন্ডার কারণে আলোচনা বারবার ভেস্তে যাওয়ার মুখে পড়েছে।

গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার জন্য প্রস্তুত। যদি এই আলোচনা সত্যিই অর্থবহ কোনো অবস্থানে পৌঁছাতে চায়, তাহলে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠনগুলোকে সহায়তা এবং নিজেদের জনগণের সঙ্গে আচরণের বিষয়গুলো আলোচনায় থাকতে হবে।

একই দিনে এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আবারও ইরানকে হুমকি দেন। তিনি বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ‘খুব চিন্তিত থাকা উচিত’। তবে একই সঙ্গে ট্রাম্প সম্প্রতি আলোচনার লক্ষ্য কিছুটা সীমিত বলেও ইঙ্গিত দেন। গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানের কাছ থেকে ‘দুটি জিনিস’ চান। প্রথমত, কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নয়। দ্বিতীয়ত, বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ করতে হবে।

বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট বলেন, আলোচনা চললেও ইরানি শাসকগোষ্ঠীকে মনে রাখা উচিত, কূটনীতির বাইরে প্রেসিডেন্টের হাতে আরও অনেক বিকল্প আছে।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তার প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি ‘অনিশ্চিত ও খামখেয়ালি’। কেউ কেউ এটিকে ‘ম্যাডম্যান থিয়োরি’ বলছেন, কেউ এলোমেলো সিদ্ধান্তের নীতি হিসেবে দেখছেন। এই অনিশ্চয়তা শুক্রবারের আলোচনাতেও ছায়া ফেলেছে। কারণ, গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালায়। তার আগে ওমানে পাঁচ দফা আলোচনা হয়। তখন ট্রাম্প ইরানকে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ বন্ধের জন্য দুই মাস সময় দিয়েছিলেন। সময়সীমা শেষ হওয়ার পর আরও আলোচনা নির্ধারিত ছিল। তবু যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায়।

তেহরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক। ২০১৫ সালে জেসিপিওএ চুক্তির আওতায় ইরান সমৃদ্ধকরণ সীমিত করতে রাজি হয়েছিল। এর বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের কথা ছিল। কিন্তু ট্রাম্প ২০১৮ সালে সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নেন।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলি ভায়েজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য শুধু পারমাণবিক ইস্যুতে সীমিত থাকবে কি না, তা পরিষ্কার নয়। ট্রাম্প যা বলছেন, তা এক রকম। আবার রুবিও যেভাবে পুরো আত্মসমর্পণের মতো দাবি তুলছেন, সেটি আরেক রকম। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, যুক্তরাষ্ট্র কোনো সুস্পষ্ট আলোচনা কৌশল ছাড়াই আলোচনায় যাবে। ইরান কী দিতে রাজি হয়, তার ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য বদলাতে থাকবে।

ভায়েজের মতে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্প এই আলোচনাকে সামরিক চাপ ও বিক্ষোভে সমর্থনের হুমকি থেকে বের হওয়ার একটি পথ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। তিনি বলেন, ইরানে বিক্ষোভ এখন অনেকটা দমন করা হয়েছে। নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট নয়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটও তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রেও পড়বে।

তবে ট্রাম্পের আশপাশে এমন অনেক কর্মকর্তা আছেন, যেমন রুবিও, যারা যে কোনো ছাড়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন। কারণ, প্রশাসনের একটি অংশ মনে করে, ইরান এখন দুর্বল। ভায়েজ বলেন, ওয়াশিংটনে অনেকের চোখে এমন কোনো চুক্তি, যা ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে সুবিধা দেবে, সেটিকে পতনের মুখে থাকা একটি সরকারকে বাঁচিয়ে দেওয়ার মতো মনে হতে পারে। আর সেটি আকর্ষণীয় নয়।

সিনা আজোদি বলেন, যদি প্রশাসন কঠোর অবস্থান ধরে রাখে, বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে, তাহলে খুব বেশি সহযোগিতা পাওয়া যাবে না। তেহরান হয়তো ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা নিয়ে কিছু সীমা নির্ধারণে রাজি হতে পারে। কিন্তু মজুত কমানোর মতো কঠোর শর্ত তারা মানবে না। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি দুর্বল করা হলে ভবিষ্যতে ইসরায়েলের হামলার মুখে ইরান খুবই অরক্ষিত হয়ে পড়বে। এতে দেশটি কার্যত তার সার্বভৌমত্ব হারাবে। তিনি বলেন, এটিই তাদের সবচেয়ে বড় বিপৎসীমা।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাংলাদেশের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিল ভারত

যুবলীগ-ছাত্রলীগের ১৩ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার

নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পুকুরে যাত্রীবোঝাই বাস

বারে ৩ বার বল লাগলে গোল, চোটের ভান করলেই শাস্তি?

‘এনসিপিকে জামায়াতের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করানো হচ্ছে’

ঐতি‌হ্যে সমৃদ্ধ দামুড়হুদার প্রাণ‌কে‌ন্দ্র, তবুও উন্নীত হয়‌নি পৌরসভায় 

শরীয়তপুরে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের আনন্দ শোভাযাত্রায় দুর্ঘটনা, আহত ৪

দুধ দিয়ে গোসল করে আর্জেন্টিনায় যোগ দিলেন ব্রাজিল সমর্থক

দালালকে ধরে হাসপাতালের ড্রেন পরিষ্কার করাল ছাত্রদল

ইরানের হাতে এখনও ২২ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে : ট্রাম্প

১০

হঠাৎ জ্বালানি তেলের দাম কমলো বিশ্ববাজারে 

১১

দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য বড় সুখবর

১২

পদ্মায় ডুবে যাওয়া সেই বাসের চালকসহ গ্রেপ্তার ৩

১৩

ঢাবি ট্রেজারারকে ‘পাড়ার গুন্ডা-মাস্তানের’ মতো কথা না বলার অনুরোধ সর্ব মিত্র চাকমার

১৪

তিন সপ্তাহ যেতেই নতুন উপাচার্য পেল জাবিপ্রবি

১৫

সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় আদ্-দ্বীনের দুই কর্মীকে অব্যাহতি

১৬

ঋতুপর্ণার গোলে সমতা, স্বপ্ন বাড়ল বাংলাদেশের

১৭

কখন, কীভাবে দেখবেন আর্জেন্টিনা-হন্ডুরাসের ম্যাচ

১৮

রামিসা হত্যা মামলার রায় রোববার

১৯

সাইবার ঝুঁকি ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বড় বিপদ : তথ্যমন্ত্রী

২০
X