

চীনের সিচুয়ান প্রদেশের তিন স্থানীয় ২০২২ সালে কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন—কেন তাদের জমি অধিগ্রহণ করে নেওয়া হচ্ছে এবং বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। উত্তরে বলা হয়—এটি ‘রাষ্ট্রীয় গোপন বিষয়’। পরে একটি অনুসন্ধানে জানা যায়, সেই ‘গোপন বিষয়’ ছিল চীনের পারমাণবিক কর্মসূচি বড় আকারে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা।
তিন বছর পর স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, সেই গ্রাম পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে এখন নতুন ভবন তৈরি হয়েছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রের অংশ।
এই পরিবর্তনগুলো থেকে বোঝা যায়, চীন তার পারমাণবিক অস্ত্র আধুনিকীকরণে বড় উদ্যোগ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনও এমন দাবি করেছে।
শিগগির ট্রাম্প বেইজিং সফরে যাবেন, যেখানে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা করতে পারেন।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র কমানোর চুক্তি নিউ স্টার্টের মেয়াদ শেষ হয়েছে। ট্রাম্প চান নতুন চুক্তিতে চীনকেও অন্তর্ভুক্ত করতে।
তবে সিচুয়ানের বিভিন্ন স্থাপনায় যে দ্রুত উন্নয়ন দেখা যাচ্ছে, তা ইঙ্গিত দেয় চীনের সামরিক বাহিনী দ্য পিপল’স লিবারেশন আর্মি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি থামাচ্ছে না। একটি বড় স্থাপনায় বিশাল একটি গম্বুজ তৈরি হয়েছে, যা দেখতে টিক-ট্যাকের মতো। এটি খুব শক্ত কংক্রিট ও স্টিল দিয়ে তৈরি এবং এতে রেডিয়েশন নিয়ন্ত্রণের বিশেষ ব্যবস্থা আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে ইউরেনিয়াম ও প্লুটোনিয়ামের মতো তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিরাপদে সংরক্ষণ বা প্রক্রিয়াজাত করা হতে পারে।
এ কেন্দ্রটি একটি পুরোনো পারমাণবিক ঘাঁটির ভেতরে তৈরি হয়েছে, যেটি আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার নজরে ছিল। চারপাশে শক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে এবং কাছেই পাহাড়ের ভেতরে ঢুকে যাওয়া একটি টানেল আছে। এই এলাকা ‘সাইট ৯০৬’ নামে পরিচিত। এখানে বড় ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া কাছাকাছি আরও কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনার সঙ্গে নতুন রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। ‘সাইট ৯৩১’ নামের আরেকটি স্থাপনা বাড়ানোর জন্য পুরো একটি গ্রাম ভেঙে ফেলা হয়েছে।
১৯৭১ সালে প্রথম যখন এই এলাকা স্যাটেলাইটে ধরা পড়ে, তখনই যুক্তরাষ্ট্র ধারণা করেছিল এটি বড় পরিবর্তন আসছে। পরে সত্যিই চীন বিশ্বের অন্যতম বড় পারমাণবিক শক্তিতে পরিণত হয়। বর্তমানে চীনের কাছে ৬০০-এর বেশি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। যদিও এটি এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার তুলনায় কম, তবে চীন দ্রুতগতিতে এই অস্ত্র বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করেছে, চীন নতুন ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করছে। তবে চীন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং বলেছে তারা আত্মরক্ষামূলক নীতি অনুসরণ করে এবং আগে আঘাত করবে না। তবে কিছু স্থাপনার অস্বাভাবিক নকশা দেখে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন প্রযুক্তি বা পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হলো ‘সায়েন্স সিটি’, যা চীনের পারমাণবিক গবেষণার কেন্দ্র। এখানে ২০২২ সালে ৬০০-এর বেশি ভবন ভেঙে নতুন অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
চীনের এই আধুনিকীকরণ কর্মসূচি ২০২১ সালের দিকে শুরু হয়, যখন শি জিনপিং সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বলেন।
চীন এখন এমন প্রযুক্তি তৈরি করেছে, যা শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র আসার আগেই শনাক্ত করে পাল্টা আঘাত করতে পারে। তাইওয়ান ইস্যুতেও এই পারমাণবিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চীন মনে করে, এটি পশ্চিমা দেশগুলোকে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত রাখতে সাহায্য করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন তার শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলোকে মানসিকভাবে প্রভাবিত করতে চায়। এতে একটি নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ এখন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং চীন—তিনটি বড় পারমাণবিক শক্তি থাকবে। কিছু বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনের ক্ষমতা বেশি ধরে নেয়, তাহলে তারা নিজেরাও অস্ত্র বাড়াতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করবে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প বেইজিংয়ে গিয়ে চীনের সঙ্গে সমঝোতা করতে কঠিন অবস্থায় পড়তে পারেন। কারণ চীন হয়তো সহজে কোনো ছাড় দিতে চাইবে না।