

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা শুরুর ১০০ দিন পর এই যুদ্ধ এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। শুরুতে ট্রাম্প এই অভিযানকে শক্তি প্রদর্শনের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধটি দেশের ভেতরে রাজনৈতিক সমস্যা তৈরি করছে। এতে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বেড়েছে, ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান দলের ভেতরে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
গতকাল রোববার বেইজিংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিজিটিএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ চতুর্থ মাসে গড়ানোর পর অনেক আমেরিকান জাতীয় নিরাপত্তার চেয়ে এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া মানুষের অসন্তোষ বাড়িয়েছে।
মে মাসে পরিচালিত রয়টার্স/ইপসোস জরিপে দেখা যায়, প্রতি তিনজনের মধ্যে দুজন আমেরিকান মনে করেন, ট্রাম্প যুদ্ধের উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেননি। একই সময়ে, সিএনবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয় যে ইরান যুদ্ধের কারণে একটি আমেরিকান পরিবারকে গড় অতিরিক্ত প্রায় ৪৫০ ডলার খরচ করতে হয়েছে।
যুদ্ধের আর্থিক ব্যয়ও ওয়াশিংটনে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। পেন্টাগনের কর্মকর্তারা কংগ্রেসকে জানিয়েছেন, মে মাস পর্যন্ত যুদ্ধ পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। তবে কিছু স্বাধীন বিশ্লেষকের মতে, অস্ত্র প্রতিস্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য পরোক্ষ খরচ যোগ করলে প্রকৃত ব্যয় আরও অনেক বেশি হতে পারে। এই ব্যয়ের পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি ফেডারেল সংস্থার বার্ষিক বাজেটের চেয়েও বেশি। এমনকি এটি নিম্ন আয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য দেওয়া পেলের শিক্ষা অনুদানের বার্ষিক ব্যয়ের কাছাকাছি।
এদিকে ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও কমেছে। দ্য ইকোনমিস্ট ও ইউগভ জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ এবং অব্যাহত মূল্যস্ফীতির কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। জরিপে তার নেট অনুমোদনের হার মাইনাস ২৫ শতাংশ পয়েন্টে নেমে এসেছে, যা ২০০৯ সাল থেকে এ ধরনের জরিপে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য সবচেয়ে খারাপ ফলাফল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিপাবলিকান বিদ্রোহ: যুদ্ধবিরোধী প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে। তবে ট্রাম্পের নিজস্ব রিপাবলিকান দলেও মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। দলের কিছু সদস্য সতর্ক করে বলেছেন যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ট্রাম্পের জনপ্রিয় ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে পূর্ণ সমর্থন নেই। ফলে দলের ভেতরে উদ্বেগ বাড়ছে। কংগ্রেসেও এর রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ডেমোক্র্যাটরা অভিযোগ করেছেন যে, যুদ্ধের কারণে সরকার দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিচ্ছে। তারা প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করার জন্য বিভিন্ন প্রস্তাবও উত্থাপন করেছেন।
এসব উদ্যোগে কয়েকজন রিপাবলিকানও সমর্থন দিয়েছেন। সম্প্রতি চারজন রিপাবলিকান প্রতিনিধি ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে মিলে একটি প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, যার উদ্দেশ্য ছিল ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করা। এটি হোয়াইট হাউসের জন্য বিরল একটি দ্বিদলীয় সমালোচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কেন্টাকির রিপাবলিকান প্রতিনিধি টমাস ম্যাসি বলেছেন, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া সামরিক অভিযান চালানো ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একইভাবে সিনেটর র্যান্ড পলও বারবার প্রশ্ন তুলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আরও গভীরভাবে এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়া কতটা যুক্তিসংগত। তিনি এটিকে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ: এ পরিস্থিতি রিপাবলিকানদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন রয়েছে। ইতিহাস বলছে, যখন অর্থনৈতিক উদ্বেগ বাড়ে, তখন ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রিয়তা কমে যায়।
ডেমোক্র্যাটরা যুক্তি দিচ্ছেন যে, প্রশাসন বিদেশি সংঘাতে অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়ায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো উপেক্ষিত হচ্ছে। অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের রিপাবলিকান প্রার্থীরাও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন, কারণ তেলের দাম বাড়ার ফলে জ্বালানির মূল্য এবং মুদ্রাস্ফীতি আরও বেড়েছে। ভোটারদের কাছে এসব বিষয় পররাষ্ট্রনীতির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আইওয়া অঙ্গরাজ্যের সম্ভাব্য রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী অ্যাশলি হিনসন স্বীকার করেছেন যে, যুদ্ধ যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে এটি রাজনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। এই উদ্বেগ ট্রাম্পের বক্তব্যেও প্রতিফলিত হয়েছে। উইসকনসিনে এক সমাবেশে তিনি বলেছেন যে, তিনি চান যুদ্ধ দ্রুত শেষ হোক। এতে বোঝা যায়, তিনি নিজেও এর রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে সচেতন।
ইসরায়েল ইস্যু আর রাজনৈতিক ট্যাবু নয়: যুদ্ধের কারণে ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের ভূমিকা নিয়েও নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। যদিও রিপাবলিকান দলের বড় অংশ এখনো ইসরায়েলের সমর্থক, তবুও কিছু প্রভাবশালী রক্ষণশীল নেতা প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। ট্রাম্পের সাবেক মিত্র ও টেলিভিশন উপস্থাপক টাকার কার্লসন এবং সাবেক কংগ্রেস সদস্য মার্জোরি টেইলর গ্রিনসহ অনেকেই জানতে চেয়েছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কি যুক্তরাষ্ট্রকে এমন একটি ব্যয়বহুল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে টেনে এনেছেন, যা ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির বিরুদ্ধে যায়?
এই প্রশ্নগুলো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবেশে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। আগে ইসরায়েলের সমালোচনা রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হতো, কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি বদলাচ্ছে।
গাজা যুদ্ধের পর থেকেই ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েলকে সমর্থন করার বিষয়টি নিয়ে মতভেদ বেড়েছে। তরুণ ভোটারদের মধ্যেও ইসরায়েল সম্পর্কে সন্দেহ ও সমালোচনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরান যুদ্ধ সেই প্রবণতাকে আরও জোরদার করেছে।
ফলে আজকের ওয়াশিংটনে ইসরায়েলকে ঘিরে আগের মতো ঐক্য দেখা যাচ্ছে না। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ এবং ইসরায়েলের লক্ষ্য কি এখনো আগের মতো একসঙ্গে মিলছে?
ট্রাম্পের জন্য এটি একটি কঠিন ভারসাম্যের বিষয়। যদি তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যান, তাহলে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ সমর্থকদের একটি অংশকে হারানোর ঝুঁকি থাকবে। আবার যদি তিনি ইসরায়েল থেকে দূরত্ব তৈরি করেন, তাহলে রিপাবলিকান দলের কড়া অবস্থানের নেতারা এবং ইসরায়েলপন্থি মিত্ররা অসন্তুষ্ট হতে পারেন। তাই ইরান যুদ্ধ এখন শুধু সামরিক সংঘাত নয়, বরং ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্যও একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।