

রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশ মিশন শুরু করেন কথিত সিআইএ এজেন্ট এনায়েত করিম চৌধুরী। এ লক্ষ্যে দেশের নতুন দুটি রাজনৈতিক দলে অর্থ দেওয়া ও পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করেন তিনি। অর্থদাতা হিসেবে এরই মধ্যে ‘জনতা পার্টি বাংলাদেশ’ ও ‘জাতীয় ইনসাফ কায়েম কমিটি’র নাম সামনে এসেছে। গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এমনটাই দাবি করেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এনায়েত।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এনায়েত মূলত ঠান্ডা মাথার একজন প্রতারক। তার টার্গেট ছিল দুর্নীতিবাজ ও বিপদগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক ব্যক্তি। সিআইএর এজেন্ট পরিচয়ে তাদের লোভনীয় প্রস্তাব দিতেন। প্রতিশ্রুতি দিতেন খুব সহজেই তাদের সমস্যার সমাধান দেবেন অথবা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করবেন। এজন্য তিনি মোটা অঙ্কের টাকা নিতেন। এরপর কখনো মধ্যস্থতার মাধ্যমে তাদের কাজ করে দিতেন আবার কারও সঙ্গে প্রতারণায় জড়াতেন।
জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিপদ ও দুর্নীতিগ্রস্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের টার্গেট করে এনায়েত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। মামলা থেকে বাঁচিয়ে দেওয়া, পদবঞ্চিত কর্মকর্তাদের ভালো পদ পাইয়ে দেওয়া ও দুর্নীতিগ্রস্তদের মামলা থেকে বাঁচিয়ে দেওয়ার প্রলোভনে টাকা তো নিতেনই; বিগত সরকারের আমলে যারা আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছিল, তাদের ওপর থেকে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েও টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ফন্দি ছিল তার। নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও তার পররাষ্ট্র সচিব হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছিলেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) গুলশান জোনাল টিমের পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আক্তার মোর্শেদ বলেন, ‘এ ধরনের অনেক তথ্যই তাকে জিজ্ঞাবাদের সময় পাওয়া যাচ্ছে। আমরা সেগুলো যাচাই করে দেখে বিস্তারিত বলতে পারব।’
ফন্দি করে নেওয়া টাকায় আমেরিকায় গড়েছেন গরুর খামার, দুবাইয়ে আবাসন ব্যবসা: তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে এনায়েত জানিয়েছেন, নানা জনকে আশ্বাস দিয়ে হাতিয়ে নেওয়া টাকায় যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া সংলগ্ন একটি এলাকায় তিনি গরুর খামার করেছেন। সেই সঙ্গে গড়ে তুলেছেন বড় মুদি দোকান। এ ছাড়া ‘জার্ভিয়া ট্রেডিং’ নামে দুবাইয়ে তার একটি আবাসন কোম্পানি আছে। সব মিলিয়ে আমেরিকা ও দুবাইয়ে তার প্রতিষ্ঠানগুলোতে অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশি লোক কাজ করেন।
এনায়েতের দেশীয় সঙ্গীর একজন পলাতক: এনায়েত করিম এ দেশে নিজের এজেন্ট হিসেবে মোস্তফা আজাদ নামে এক ব্যক্তি ও তার স্ত্রীকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তাদের মাধ্যমেই গুলশানের বাসাটি ভাড়া নিয়েছিলেন। সেই বাসায় সব সময় থাকতেন ওই দম্পতি। এনায়েত যখন দেশে আসতেন, তখন প্রথম এক-দুই দিন থাকতেন সোনারগাঁও হোটেলে। এরপর চলে যেতেন গুলশানের ওই বাসায়। এনায়েতের গ্রেপ্তার হওয়ার খবর পেয়ে ওই দম্পতি বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পালানোর সময় মোস্তফা আজাদকে বিমানবন্দর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। তবে তার স্ত্রী আগেই দেশ ছাড়েন। এই মামলায় এনায়েতের সঙ্গে মোস্তফা আজাদকেও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
আজাদকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলেন, এনায়েতের সম্পর্কে এই দম্পতিও খুব বেশি বা গভীর কিছু জানত না বলে দাবি করেছেন। তারা টাকার বিনিময়ে কাজ করে দিতেন। তবে গত তিন মাস ধরে মাসিক দুই লাখ যে বেতন পেতেন, সেটাও তারা পাচ্ছিলেন না। এনায়েত এই দম্পতির কাছে নিজেকে এনজিওর অর্থদাতা হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। তাদের সঙ্গে সেসব বিষয় নিয়েই আলোচনা হতো বেশি। তবে নানা লোকজনের সঙ্গে মিটিং ও জায়গা নির্ধারণ করার কাজ করতেন আজাদ ও তার স্ত্রী।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপাড়া হিসেবে খ্যাত রাজধানীর মিন্টো রোড এলাকায় সন্দেহজনক ঘোরাঘুরির সময় এনায়েতকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বিশেষ ক্ষমতা আইনে তাকে গ্রেপ্তার করলে পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে তার বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়। সেই মামলায় তাকে প্রথম দফায় ৪৮ ঘণ্টার রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে ডিবি পুলিশ। তার কাছে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয় মোস্তফা আজাদকে। প্রথম দফার রিমান্ড শেষে একই মামলায় গত বুধবার তাকে আবার আদালতে তুলে ১০ দিনের রিমান্ড চান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। শুনানি নিয়ে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। দ্বিতীয় দফায় তার সঙ্গে রিমান্ডে নেওয়া হয় মোস্তফা আজাদকেও।