

গত বছরের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন আলোচিত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক এনায়েত করিম চৌধুরী। সেই ভাবনা থেকেই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে তার লোক ঢোকাতে হবে—এমন কথা বলে গণঅধিকার পরিষদের সাবেক আহ্বায়ক রেজা কিবরিয়াকে উপদেষ্টা পদ পাইয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। এতে রেজা কিবরিয়া রাজিও হন। আর এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য চলচ্চিত্র নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল ‘জনতা পার্টি বাংলাদেশ’ গঠন ও অর্থায়ন করেন এনায়েত। দুই দফায় সাত দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য দিয়েছেন নিজেকে প্রভাবশালী একটি পশ্চিমা দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট দাবি করা এনায়েত করিম চৌধুরী ওরফে মাসুদ করিম। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে সম্পৃক্ত ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) একাধিক কর্মকর্তা এসব তথ্য জানিয়েছেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এনায়েত ঠান্ডা মাথার ধূর্ত প্রকৃতির মানুষ। তার নানা পরিকল্পনার ফাঁদে দেশের অনেক ‘হাইপ্রোফাইল’ ব্যক্তিও পড়েছেন। যাদের মধ্যে একজন রেজা কিবরিয়া। ৫ আগস্টের পরে নতুন সরকার গঠন হলে তাকে (রেজা কিবরিয়া) উপদেষ্টা বানানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন এনায়েত। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে একটি সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। সেই ভাবনা থেকে গত এপ্রিলে আত্মপ্রকাশ করা চলচ্চিত্র নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের রাজনৈতিক দল ‘জনতা পার্টি বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন এবং অর্থায়ন করেন। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা রেখেছেন এমন একজন বিএনপির সাবেক নেতা ও জনতা পার্টি বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক শওকত মাহমুদ। কালবেলার কাছে এনায়েতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয়ের বিষয়টি স্বীকার করলেও রিমান্ডে দেওয়া তার তথ্যগুলো সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন রেজা কিবরিয়া। উপদেষ্টা হওয়ার প্রস্তাব পাওয়া এবং তার রাজি হওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘আমি যেহেতু মানুষের জন্য কাজ করতে দেশে এসেছি, সেহেতু উপদেষ্টা হওয়ার প্রস্তাবে আমি রাজি আছি। তবে এ ধরনের প্রস্তাব এনায়েত করিম আমাকে দেয়নি। এ তথ্য সঠিক নয়।’ তিনি পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, ‘উনি যদি আমাকে প্রস্তাব দেবেন এবং সেই ক্ষমতা (উপদেষ্টা বানানোর) যদি তার থাকতই, তাহলে আমি উপদেষ্টা পদ পেলাম না কেন?’
জনতা পার্টি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এনায়েত করিমের মাধ্যমে হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘এই দলের সঙ্গে আমার সরাসরি কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বিভিন্ন সভা, অনুষ্ঠানে তারা আমাকে দাওয়াত দিত, এজন্য আমি যেতাম।’
জনতা পার্টি বাংলাদেশের সঙ্গে এনায়েতের সংশ্লিষ্টতা এবং রিমান্ডে দেওয়া তার তথ্যের ব্যাপারে জানতে গতকাল সন্ধ্যায় দলটির সাধারণ সম্পাদক শওকত মাহমুদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া মেলেনি। দলের সভাপতি ইলিয়াস কাঞ্চনকেও হোয়াটসঅ্যাপে কল ও বার্তা দিয়ে সাড়া পাওয়া যায়নি।
দুই দফায় সাত দিনের রিমান্ড শেষে রমনা মডেল থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় গ্রেপ্তার এনায়েত করিম চৌধুরী ও তার সহযোগী এস এম গোলাম মোস্তফা আজাদকে রিমান্ড শেষে গতকাল সোমবার কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিন্টো রোডের মন্ত্রিপাড়ায় গাড়িতে করে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরির সময় এনায়েতকে আটক করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে গোলাম মোস্তফাকে বিমানবন্দর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। মামলার অভিযোগে বলা হয়, আসামি এনায়েত করিম চৌধুরী বর্তমানে বাংলাদেশের বৈধ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে উৎখাত করার জন্য অন্য দেশের গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট হিসেবে বাংলাদেশে এসে জননিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্ব বিনষ্ট করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত আছেন, যা গুরুতর অপরাধ।
এনায়েত করিমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোয় প্রভাব খাটানো এবং পতিত সরকারের আমলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে ফাটল ধরানোর অভিযোগ পুরোনো। রিমান্ডে এমন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন এই ব্যক্তি। রেজা কিবরিয়াকে ব্যবহার করে সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের আগে গণঅধিকার পরিষদে ভাঙনের নেপথ্যের কারিগর হিসেবে নাম এসেছে এই এনায়েত করিমের। দলটির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা হলে তারাও এ বিষয়টিতে একমত প্রকাশ করেন। গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য আবু হানিফ কালবেলাকে বলেন, ‘এনায়েত করিম ওরফে মাসুদ করিম মূলত গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট। আওয়ামী লীগের আমলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের নানাভাবে বিভ্রান্ত করতেন। এই ফাঁদে পা দিয়েছিলেন অনেক রাজনৈতিক দলের নেতা। গণঅধিকার পরিষদ থেকে ড. রেজা কিবরিয়াকে ইম্পিচম্যান্ট করার মূল কারণ ছিল এই এনায়েতের ফাঁদে পড়া। বারবার সতর্ক করার পরও রেজা ভাই এই ফাঁদ থেকে বের হতে চাননি। একবার এই ফাঁদে পা দিয়ে ব্যাংককে মিটিং করতেও গিয়েছিলেন। এই এনায়েত করিমের ফাঁদে পড়ে একবার একটা কর্মসূচি দিয়েছিলেন, সেদিনই নাকি সরকার পতন হয়ে যাবে, এটা আবার সাংবাদিকদের জানানো হয়েছিল।’
তবে এসব বিষয় অস্বীকার করেন রেজা কিবরিয়া। তিনি বলেন, ‘গণঅধিকারে যোগ দেওয়ারও পাঁচ থেকে ছয় বছর আগে আমেরিকায় তার (এনায়েত) সঙ্গে আমার পরিচয়। গণঅধিকার পরিষদ ভাঙনের পেছনে মাসুদ করিমের সঙ্গে আমার যোগাযোগের বিষয়টি বিভিন্ন সময় নুর বলেছেন, কিন্তু এটা কোনো কারণ নয়। বরং নুরের সঙ্গে ইসরায়েলি গোয়েন্দার (মেন্দি সাফাতি) যোগাযোগ ও ফান্ডিংয়ের কারণে দল ভেঙে গিয়েছিল।’
এনায়েত করিমের সঙ্গে দেশের বাইরে বৈঠকের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘দেশের বাইরে তার সঙ্গে আমার কোনো বৈঠক হয়নি।’ এনায়েত করিম শুধু রাজনৈতিক দলের নেতাদেরই নয়, নানা কৌশলে নিজের ফাঁদে আটকেছিলেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদকেও। দেশে ও দেশের বাইরে তার সঙ্গে এনায়েতের একাধিক বৈঠক হয়েছে। বেনজীরের বিরুদ্ধে দুদকের করা মামলা নিষ্পত্তি করে দেওয়ার আশ্বাসে দুবাইতে দুজনের মধ্যে একাধিক বৈঠক হয়েছে বলে রিমান্ডে স্বীকার করেছেন এনায়েত। এ ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদের প্রথম দিকে দুবাইতে নিজের যে আবাসন ব্যবসার কথা জানিয়েছে এনায়েত, সেটিও মূলত বেনজীরের এমনটা দাবি করেছেন।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবিরের কাছে। তিনি বলেন, ‘সাত দিনের রিমান্ডে আমরা যেসব তথ্য পেয়েছি, সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে। যেহেতু মামলাটি তদন্তাধীন, তাই আমরা বেশি কিছু বলতে পারছি না।’