

দেশে নবজাতকদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ফাঙ্গাল সুপারবাগ’। সম্প্রতি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ‘ক্যান্ডিডা অরিস’ নামে এক ধরনের ছত্রাকের (ফাঙ্গাস) সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ক্যান্ডিডা অরিসের তিনটি আইসোলেট একাধিক ওষুধ প্রতিরোধী, তবে ৮২ শতাংশ ছিল ‘ফ্লুকোনাজোল’ প্রতিরোধী, যা রক্তে ছত্রাকজনিত সংক্রমণে ব্যবহৃত প্রথম সারির ওষুধ। যেসব সংক্রমিতের মধ্যে ক্যান্ডিডার উপস্থিতি পাওয়া গেছে, তাদের ৮১ শতাংশেরই জন্ম সিজারিয়ান অপারেশনে। গবেষকদের ধারণা, সিজারিয়ান ডেলিভারির পর দীর্ঘ সময় হাসপাতালে অবস্থান করায় ক্যান্ডিডা অরিসের সংস্পর্শে আসার সুযোগ বাড়ে। সম্প্রতি মাইক্রোবায়োলজি স্পেকট্রাম জার্নালে প্রকাশিত (আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র) আইসিডিডিআর,বির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যান্ডিডা অরিস বাংলাদেশের এনআইসিইউতে ছড়িয়ে পড়ছে। এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছে আইসিডিডিআর,বি, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সহযোগিতায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) অর্থায়নে বাংলাদেশের দুটি টারশিয়ারি লেভেল হাসপাতালে।
ক্যান্ডিডা অরিস এমন এক ছত্রাক, যা মানুষের ত্বকে কোনো লক্ষণ প্রকাশ না করেই অবস্থান এবং দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। প্রায় ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে এই অবস্থান থেকে সংক্রমণে পরিণত হয়, সাধারণত রক্তের মতো জীবাণুমুক্ত অংশের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। অনুন্নত ও স্বল্পোন্নত দেশে ক্যান্ডিডা অরিস-জনিত রোগে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মৃত্যুর হার প্রায় ৭০ শতাংশ। দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন, গুরুতর অসুস্থ এবং অপরিণত নবজাতকদের মধ্যে এটি বিশেষভাবে বিপজ্জনক, ফলে এনআইসিইউতে থাকা অনেক নবজাতক উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে। এই ছত্রাকটি একাধিক অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ প্রতিরোধী। এ কারণে সিডিসি ২০১৯ সালে একে ‘অতি জরুরি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স হুমকি’ হিসেবে ঘোষণা করে। দীর্ঘ সময় হাসপাতালে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতিতে টিকে থাকা, দ্রত ছড়িয়ে পড়া এবং উচ্চমাত্রার অসুস্থতা ও মৃত্যুর ক্ষমতাসম্পন্ন হওয়ায় ক্যান্ডিডা অরিসকে ‘হাসপাতাল-সম্পর্কিত সুপারবাগ’ ঘোষণা করা হয়।
২০২১ সালের আগস্ট থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গবেষকরা ঢাকার একটি সরকারি ও একটি বেসরকারি হাসপাতালের এনআইসিইউতে ভর্তি নবজাতকদের মধ্যে গবেষণাটি পরিচালনা করেন। ভর্তি হওয়ার সময় এবং পরবর্তী সময়ে তারা রোগীদের ত্বকে বা রক্তে ক্যান্ডিডা অরিস সংক্রমণ বা অবস্থানের (কলোনাইজেশন) জন্য পরীক্ষা করেন, যাতে হাসপাতালের ভেতরে সংক্রমণ ছড়ানোর ধরণ বোঝা যায়। ৩৭৪ জন রোগীর মধ্যে ৩২ জন ত্বকে ক্যান্ডিডা অরিস বহন করছিল এবং একজন রোগীর রক্তে সংক্রমণ ধরা পড়ে। এই ৩২ জনের মধ্যে ১৪ জন ভর্তি হওয়ার সময়ই আক্রান্ত ছিল এবং ১৮ জন ভর্তি হওয়ার পর সংক্রমিত হয়। ভর্তি হওয়ার সময় আক্রান্ত ১৪ জনের মধ্যে ১৩ জন অন্য হাসপাতাল বা ওয়ার্ড (যেমন প্রসূতি ওয়ার্ড) থেকে স্থানান্তরিত হয়েছিল। শুধু একজন এসেছিল বাড়ি থেকে। সংক্রমিত ৩২ জনের মধ্যে সাতজনের মৃত্যু হয়। এতে প্রমাণিত হয়, ছত্রাকটি হাসপাতালের পরিবেশেই টিকে থাকে এবং সেখান থেকেই ছড়ায়।
আইসিডিডিআর,বির সংক্রামক রোগ বিভাগের এএমআর রিসার্চ ইউনিটের প্রধান ডা. ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, এই গবেষণা নবজাতকদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে গুরুতর অসুস্থ ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের মধ্যে এই ‘সুপারবাগ’-এর সংক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ দিয়েছে। এটি প্রশাসনিক ও নীতিগতভাবে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রথম ধাপ।
গবেষকরা এনআইসিইউ এবং অন্যান্য হাসপাতাল পরিবেশে এই ছত্রাকের টিকে থাকা ও ছড়ানো রোধে কার্যকরী ক্লোরিন-ভিত্তিক জীবাণুনাশক দিয়ে নিয়মিত হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ও ব্যবহার্য জিনিসপত্র পরিষ্কার করা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের হাত ধোয়ার অভ্যাস উন্নত করার সুপারিশ করেছেন। একই সঙ্গে এনআইসিইউতে ক্যান্ডিডা অরিস সংক্রমণের ধারাবাহিক নজরদারি চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন। কারণ, আক্রান্ত হওয়া নবজাতকদের শনাক্ত করে দ্রত পৃথক করা যায়, ছড়িয়ে পড়া রোধ করা এবং দ্রত অ্যান্টিফাঙ্গাল চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়।