

উত্তরের জনপদ নীলফামারীতে চীনের অনুদানে এক হাজার শয্যার আধুনিক একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। যার নাম বলা হচ্ছে ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল’। উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের লক্ষ্যে নেওয়া এ প্রকল্পকে দেশের স্বাস্থ্য খাত উন্নয়নে বড় ধরনের উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তবে এ হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পেলেও অর্থায়ন নিয়ে রয়ে গেছে বড় অনিশ্চয়তা। চীনের অনুদানে বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও এখনো দেশটির পক্ষ থেকে কোনো নিশ্চয়তা, বিনিময়পত্র বা নীতিগত সম্মতি পাওয়া যায়নি।
এক হাজার শয্যার প্রস্তাবিত এই বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় অনুমোদন পেলেও চীনা অনুদানের কোনো লিখিত নিশ্চয়তা বা নীতিগত অঙ্গীকার নেই। পরিকল্পনা কমিশন ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের নথি অনুযায়ী, প্রকল্প এলাকা অনুমোদন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং বিনিময়পত্র ছাড়াই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অর্থায়নের কোনো নিশ্চয়তা না থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়ায় সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন এবং ভবিষ্যতে প্রকল্প বাস্তবায়নে দেখা দিতে পারে সংকট, প্রশাসনিক বৈধতা ও অর্থনৈতিক দায়—উভয় দিক থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ।
পরিকল্পনা কমিশন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ জানুয়ারি চলতি অর্থবছরের অষ্টম একনেক সভায় ‘উন্নত চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা’ শীর্ষক প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উদ্যোগে নেওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে স্বাস্থ্য ও গণপূর্ত অধিদপ্তর। প্রকল্পের মেয়াদকাল ধরা হয়েছে চলতি বছর শুরু করে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে রংপুর বিভাগের নীলফামারী জেলার সদর উপজেলায়।
উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) ও সংশ্লিষ্ট সরকারি নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, আলোচ্য প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৪৫৯ কোটি ৩৪ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ধরা হয়েছে মাত্র ১৭৯ কোটি টাকা। বিপরীতে প্রকল্প ব্যয়ের সিংহভাগ, অর্থাৎ ২ হাজার ২৮০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ চীনা অনুদান হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফলে প্রকল্পটির আর্থিক কাঠামো প্রায় সম্পূর্ণভাবে চীনা অনুদানের ওপর নির্ভরশীল।
তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কোনো নথিতেই চীনা অনুদানপ্রাপ্তির বিষয়ে লিখিত নিশ্চয়তা, বিনিময়পত্র বা নীতিগত অঙ্গীকারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ অর্থায়নের প্রধান উৎস নিশ্চিত না হয়েই প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার এমন বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের অনুমোদন সরকারি প্রকল্প প্রণয়ন ও অনুমোদন-সংক্রান্ত বিদ্যমান নীতিমালার সঙ্গে স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে এটি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে গুরুতর আর্থিক অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চীনা অর্থায়নের অনিশ্চয়তার বিষয়টি প্রথমে সামনে আসে পরিকল্পনা কমিশনের পিইসি সভায়। পিইসি সভার সুপারিশে বলা হয়, ‘উন্নয়ন সহযোগী কর্তৃক অর্থায়ন প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, পরিবেশ ছাড়পত্র প্রাপ্তি এবং আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সঙ্গে পরামর্শক্রমে আবাসিক ইলেকট্রিফিকেশন এবং অন্যান্য ওয়ার্কস খাত, অফিস ইক্যুইপমেন্ট খাত, অনাবাসিক খাত, পরামর্শক খাত, অ্যান্ড এক্সেসরিজ খাত, মেশিনারিজ এবং ইক্যুইপমেন্ট (লন্ড্রি অ্যান্ড কিচেন) খাত এবং মূল্য সংযোজন কর খাতে ব্যয় যৌক্তিকভাবে পুনর্নির্মাণ করে প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ শুরু করা যেতে পারে।’
ডিপিপিতে অর্থায়নের বিষয়টি উল্লেখ না থাকায় ওই সভায় প্রস্তাবিত প্রকল্পে চীন সরকারের অনুদানের বিষয়টি উন্নয়ন সহযোগীসহ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের নিশ্চয়তা পত্র পুনর্গঠিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে যুক্ত করতে বলা হয়। পিইসি সভায় সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে প্রস্তাবকারী সংস্থা স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নে উন্নয়ন সহযোগীর অনুদানপ্রাপ্তির নিশ্চয়তার জন্য বিষয়টি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে পাঠানো হয়েছে।
কিন্তু একনেক সভার আগে গত ২১ জানুয়ারি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) থেকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে পাঠানো এক চিঠিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, এ প্রকল্পের ক্ষেত্রে চীনা কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো বিনিময়পত্রে সই করেনি। এ বিষয়ে কোনো নীতিগত অনুমোদন বা অর্থায়নের নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়নি। এমনকি প্রকল্প এলাকা অনুমোদন সাপেক্ষে কোনো সম্ভাব্যতা সমীক্ষা কার্যক্রমও চীনা পক্ষ শুরু করেনি। এ তথ্য শুধু ইআরডির চিঠিতেই নয়, একনেক সভায়ও উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু বিষয়টি আমলে না নিয়েই প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
ইআরডির চিঠিতে বলা হয়, চীনা অনুদান সহায়তা গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি নির্ধারিত ও ধাপভিত্তিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রথমে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ও চীন সরকারের মধ্যে একটি খাতভিত্তিক অনুদান চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তির আওতায় কোনো সুনির্দিষ্ট প্রকল্প চিহ্নিত করা হলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের অনুমোদিত প্রকল্প নকশা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং চীনা কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত অনুদান ছক পূরণ করে প্রকল্প প্রস্তাব চীনা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়।
চীনা কর্তৃপক্ষ প্রকল্প প্রস্তাব যাচাই-বাছাই শেষে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনায় আগ্রহ প্রকাশ করলে, ওই সমীক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও চীন সরকারের মধ্যে একটি বিনিময়পত্র স্বাক্ষরিত হয়। এ পর্যায়ে চীনা পক্ষের মনোনীত বিশেষজ্ঞ দল প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন, প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে প্রকল্পের বিস্তারিত নকশা, ব্যয় বিভাজন ও অন্যান্য কারিগরি বিষয় চূড়ান্ত করে।
পরবর্তী সময়ে চীন সরকার প্রকল্পটিকে বাস্তবায়নযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও চীনা বিশেষজ্ঞ দলের মধ্যে একটি কার্যবিবরণী স্বাক্ষরিত হয়। পরে অনুদান প্রদানের সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হলে বাংলাদেশ ও চীন সরকারের মধ্যে একটি বিনিময়পত্র স্বাক্ষরিত হয়, যা প্রকল্পের অনুকূলে অনুদান সহায়তার চূড়ান্ত নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য হয়। এরপর বাস্তবায়ন চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রকল্পের নির্মাণ ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হয়।
বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অনুরোধে পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প প্রস্তাব ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই চীনা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। চীনা অনুদান সহায়তা কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। তবে এ পর্যন্ত চীনা পক্ষ থেকে প্রকল্প এলাকা অনুমোদন সাপেক্ষে কোনো সম্ভাব্যতা সমীক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হয়নি। এ-সংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশ ও চীন সরকারের মধ্যে কোনো বিনিময়পত্র স্বাক্ষরিত হয়নি এবং চীনা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অনুদান সহায়তার বিষয়ে কোনো নীতিগত বা চূড়ান্ত অনুমোদন কিংবা নিশ্চয়তা পাওয়া এখনো যায়নি।
অর্থাৎ, চীনের অনুদানে হাসপাতাল নির্মাণ হবে বলে ঘোষণা দিয়ে প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হলেও অর্থায়নের কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। প্রকল্পটি এখনো প্রাথমিক প্রস্তাব ও প্রক্রিয়াগত পর্যায়েই রয়েছে। প্রকল্প পর্যালোচনা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি প্রকল্প প্রণয়ন ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী, যেসব প্রকল্প বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল, সেসব প্রকল্পের ক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগীর লিখিত সম্মতি বা অন্তত নীতিগত অঙ্গীকার ডিপিপির সঙ্গে সংযুক্ত থাকা বাধ্যতামূলক। এ নিয়মের উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতে প্রকল্প স্থগিত, ব্যয় বৃদ্ধি বা রাষ্ট্রীয় দায় সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি কমানো।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়ন-সংক্রান্ত নিশ্চয়তাপত্র ছাড়া বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতাল প্রকল্পের একনেক অনুমোদন ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রক্রিয়ার গুরুতর বিচ্যুতি হিসেবে দেখা যাচ্ছে। সাধারণত এ ধরনের দ্বিপক্ষীয় প্রকল্পে অর্থায়ন আগে নিশ্চিত করা হয়, এরপর একনেকে অনুমোদন দেওয়া হয়; তবে এখানে উল্টো প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় সমঝোতা স্মারক, নোট ভার্বাল বা যৌথ ঘোষণার মতো নথি না থাকায় প্রকল্পের কূটনৈতিক ও আইনি ভিত্তি দুর্বল, যা ভবিষ্যতে চীনা পক্ষ অর্থায়ন থেকে সরে গেলে সরকারের জন্য আইনি দাবি করা কঠিন করে তুলতে পারে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন আল রশিদ কালবেলাকে বলেন, ‘এভাবে অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ নেই। বৈদেশিক অর্থায়নের প্রকল্প অনুমোদনের আগে অবশ্যই অর্থায়নের নিশ্চয়তা থাকতে হবে। এ ধরনের অনুমোদন দেওয়া যায় না, কারণ একনেক বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের সর্বোচ্চ সংস্থা, তাই এখান থেকে কোনো প্রকল্প অনুমোদিত হওয়ার অর্থ হলো রাষ্ট্রীয়ভাবে সেটি বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ। কিন্তু সেখানে অনুমোদন দেওয়ার পর চীনের তো কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যেহেতু তারা অর্থায়ন নিশ্চিত করেনি। সুতরাং এ ধরনের উদ্যোগ কনফিউশন (সংশয়) তৈরি করে।’
সাধারণত যে কোনো বৈদেশিক অর্থায়নের প্রকল্প অনুমোদনের আগে অর্থায়নকারী দেশ বা সংস্থার পক্ষ থেকে ইআরডির মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা থাকতে হয় উল্লেখ করে সাবেক এ পরিকল্পনা সচিব বলেন, ‘এ নিশ্চয়তা ছাড়া প্রকল্প অনুমোদন করা নীতিমালার লঙ্ঘন। দাতা দেশ বা সংস্থা কোনো লিখিত নিশ্চয়তা না দিলে তাদের ওপর প্রকল্পের অর্থায়নের কোনো বাইন্ডিংস বা আইনি বাধ্যবাধকতা থাকে না। ফলে ভবিষ্যতে অর্থায়নের মারাত্মক সংকট তৈরি হতে পারে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ইআরডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, অর্থায়নের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এজন্য বিষয়টি একনেক সভার আগে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগকে জানানোর জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছিল। অর্থায়নের বিষয়টি চূড়ান্ত না হলেও কাজ চলছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং ইআরডির পক্ষ থেকে অর্থায়নের নিশ্চয়তার বিষয়ে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে।
তবে, অর্থায়নের অনিশ্চয়তার পাশাপাশি প্রকল্পটির ব্যয় কাঠামো নিয়েও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পিইসি সভায় উপস্থাপিত ডিপিপিতে আবাসিক ও অনাবাসিক ভবন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৮০২ কোটি টাকা। কিন্তু পুনর্গঠিত ডিপিপিতে এ ব্যয় বাড়িয়ে ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু এই দুটি খাতেই ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৭৭ কোটি টাকা। প্রতি বর্গফুট নির্মাণ ব্যয় ৪ হাজার টাকা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাজারদর বা অন্যান্য সরকারি হাসপাতাল প্রকল্পের তুলনামূলক বিশ্লেষণ ডিপিপিতে স্পষ্টভাবে নেই।
পুনর্গঠিত ডিপিপিতে এমন কয়েকটি খাত যুক্ত হয়েছে, যা পিইসি সভার সময় ছিল না। এর মধ্যে রয়েছে লন্ড্রি ও রান্নাঘরের যন্ত্রপাতি, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), অতিরিক্ত অফিস ইক্যুইপমেন্ট এবং কম্পিউটার ও এক্সেসরিজ খাত। এ ছাড়া পরামর্শক খাত, এক্সটারনাল ইলেকট্রিফিকেশন এবং অন্যান্য ওয়ার্কস খাতেও ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। সব মিলিয়ে পিইসি সভায় প্রস্তাবিত ব্যয়ের তুলনায় প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৬৬ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়েই এভাবে ব্যয় বাড়ানো ভবিষ্যতে আরও বড় ব্যয় বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিতে পারে।
পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই পরিকল্পনা: সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী প্রকল্পটি ‘লাল’ ক্যাটাগরিভুক্ত হওয়ায় প্রাথমিক পরিবেশগত পরীক্ষা, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং দুর্যোগগত প্রভাব মূল্যায়নের আবশ্যকতা থাকায় এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র পুনর্গঠিত ডিপিপিতে সংযোজন করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্প নথিতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র সংযুক্ত করা হয়নি। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র প্রাপ্তির পর প্রকল্পের আওতায় নির্মাণকাজ শুরু করা হবে। অথচ একটি এক হাজার শয্যার হাসপাতাল প্রকল্প পরিবেশগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া নকশা ও ব্যয় চূড়ান্ত করা হলে পরে পরিবেশগত শর্ত মানতে গিয়ে নকশা পরিবর্তন করতে হতে পারে, যা ব্যয় আরও বাড়াবে।
যানবাহন বরাদ্দের ক্ষেত্রেও অসংগতি পাওয়া গেছে। অর্থ বিভাগ যেখানে একটি জিপ, একটি ডাবল কেবিন পিকআপ ও একটি মাইক্রোবাস অনুমোদন দিয়েছিল, সেখানে পুনর্গঠিত ডিপিপিতে দুটি মাইক্রোবাস এবং একটি ডাবল কেবিন পিকআপ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা ডিপিপিতে ব্যাখ্যা করা হয়নি।
আলোচ্য প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা কমিশন বলছিল, নীলফামারী ও আশপাশের জেলার মানুষের জন্য একটি আধুনিক হাসপাতাল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এতে উত্তরাঞ্চলের মানুষ উন্নত চিকিৎসাসেবা পাবে এবং ঢাকাকেন্দ্রিক হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমবে। তবে কমিশনের সুপারিশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ, পরিবেশ ছাড়পত্র গ্রহণ এবং ব্যয় যৌক্তিকভাবে পুনর্নির্ধারণ না করে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করা উচিত নয়।
সব মিলিয়ে নীলফামারীর মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় একটি হাসপাতাল প্রকল্প এখন অর্থায়নের অনিশ্চয়তা, ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা এবং নীতিগত অসংগতির কারণে বড় প্রশ্নের মুখে। উন্নয়ন উদ্যোগ হিসেবে যে প্রকল্পটি আশা জাগানোর কথা ছিল, সেটিই এখন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আর্থিক শৃঙ্খলার পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।