রাজকুমার নন্দী
প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:০৫ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন

যেসব আসনে ঝড় তুলেছেন স্বতন্ত্ররা

যেসব আসনে ঝড় তুলেছেন স্বতন্ত্ররা

দলীয় নানান উদ্যোগের পরও সারা দেশের অর্ধশতাধিক আসনে বিএনপির ‘অভিমানী’ নেতারা স্বতন্ত্র তথা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে রয়ে গেছেন। এর মধ্যে আবার ২০ থেকে ২৫টির মতো আসনে ভোটের লড়াইয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন তারা। আর বিদ্রোহীরা ভোটের মাঠে থাকায় সংশ্লিষ্ট আসনগুলোতে দলের তৃণমূল কার্যত বিভক্ত হয়ে পড়েছে। তপশিল অনুযায়ী, পুরো সময় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রচার চালিয়েছেন। তারা ভোটের মাঠে ঝড় তুলেছেন, যা বিএনপি বা বিএনপি সমর্থিত জোট প্রার্থীদের চাপের মুখে ফেলেছে। ফলে আগামীকাল বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে এসব আসনে তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।

জানা যায়, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অধিকাংশই বিএনপির জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতা। অনেকে আবার দলের সাবেক এমপিও। ফলে স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ও বোঝাপড়া ভালো। আন্দোলন-সংগ্রামজুড়ে তৃণমূলের কর্মীদের পাশেও ছিলেন। এ কারণে বহিষ্কারের মতো সর্বোচ্চ সাংগঠনিক ব্যবস্থার পরও তৃণমূল বিএনপির একটি অংশ, কোথাও কোথাও বড় অংশ স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভোটের মাঠে রয়েছে। অনেকে মনে করছেন, এ অবস্থায় অনেক আসনে বিদ্রোহীদের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি অনেক আসনে বিএনপির ভোট কাটাকাটির কারণে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সমর্থিত প্রার্থীদের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাও থাকছে।

অবশ্য বিএনপির দাবি, নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও তাতে দলীয় বা জোট প্রার্থীদের তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। কারণ, বিএনপির তৃণমূল শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের পক্ষেই থাকবে। তা ছাড়া দল বা জোট প্রার্থীর পক্ষে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সক্রিয় সমর্থন, স্বতন্ত্রের পক্ষ নেওয়ায় বহিষ্কার এবং নির্বাচনী প্রচারে বিএনপি চেয়ারম্যানের তৃণমূল সফরের মধ্য দিয়ে ধানের শীষ ও জোট প্রার্থীদের পক্ষে জোয়ার তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, এর মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট আসনে দলের বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ‘প্রান্তিক’ তথা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন। প্রায় একই ধরনের অভিমত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কারও কারও। তাদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘মার্কা’ একটা বিশাল ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। প্রার্থী মনঃপূত না হলেও শেষ পর্যন্ত ‘মার্কাকেই’ ভোট দেন নেতাকর্মীরা। সে বিবেচনায় দু-একটি জায়গায় স্বতন্ত্ররা ভালো করলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের আশা ভঙ্গ হতে পারে। একই সঙ্গে বিদ্রোহী এসব প্রার্থীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত বলে মনে করছেন তারা।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ২৯২ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী দেয় বিএনপি। তবে এর মধ্যে ঋণখেলাপির অভিযোগে কুমিল্লা-৪ আসনে প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় সেখানে বিএনপির দলীয় প্রার্থী নেই। অবশ্য সেখানে জোট শরিক গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকের প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়েছে বিএনপি। আর সমঝোতার ভিত্তিতে আটটি আসন শরিকদের জন্য ছেড়ে দেয় দলটি। অবশ্য কৌশলগত কারণে নির্বাচনে বিজয় ত্বরান্বিত করতে মিত্রদের মধ্যে সাতজনকে বিএনপিতে যোগদান করিয়ে ধানের শীষ প্রতীক দেওয়া হয়। এ ছাড়া জোটের ‘অনিবন্ধিত’ একটি দলকেও ধানের শীষ দেয় বিএনপি। সব মিলিয়ে শরিকদের জন্য ১৭টি আসন ছেড়েছে দলটি। তবে এর মধ্যে ১২টিতেই বিএনপির নেতারা ধানের শীষ না পেয়ে স্বতন্ত্র তথা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে রয়েছেন।

বিএনপির দপ্তর বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যেসব নেতা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, এমন অন্তত ৭১ জনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আর দলীয় বা দল সমর্থিত জোট প্রার্থীর বিপক্ষে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় এ পর্যন্ত সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকশ নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। অনেক জায়গায় বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় বিএনপির স্থানীয় কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়েছে।

পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতা হাসান মামুন ঘোড়া প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি। এ আসনে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে সমর্থন দেয় বিএনপি। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় হাসান মামুনকে বহিষ্কার করা হলেও তৃণমূলের বড় একটি অংশ তার সঙ্গে রয়েছেন। ফলে হাসান মামুন শক্ত প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন ভোটের মাঠে। অনেকের অভিমত, এ আসনে হাসান মামুনই শেষ হাসি হাসতে পারেন।

গণঅধিকার পরিষদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেওয়া রাশেদ খান ঝিনাইদহ-৪ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে রয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ।

এজন্য তাকে এরই মধ্যে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ আসনে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা কার্যত বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। তবে নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও পাশে থাকায় তাদের বড় অংশ ফিরোজের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এতে করে বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন ধানের শীষের প্রার্থী রাশেদ। অনেকে মনে করছেন, এ আসনে ‘বিদ্রোহী’ ফিরোজই বাজিমাত করতে পারেন।

বিএনপিতে যোগ দিয়ে হবিগঞ্জ-১ আসন থেকে ধানের শীষ পান আমজনতার দলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক রেজা কিবরিয়া। আর ধানের শীষ না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য ও সাবেক এমপি শেখ সুজাত মিয়া দল থেকে বহিষ্কৃত হন। জানা গেছে, তৃণমূল বিএনপির পদধারী সাবেক নেতা এবং সাধারণ কর্মীরা সুজাত মিয়ার সঙ্গে রয়েছেন। এ ছাড়া পদধারী অনেক নেতাও গোপনে তার পক্ষে কাজ করছেন। অন্যদিকে, পদধারী অবশিষ্ট নেতারা রেজা কিবরিয়ার সঙ্গে থাকায় আসন্ন নির্বাচনে এ দুজনের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। এখানে যে কেউ শেষ হাসি হাসতে পারেন।

নাটোর-১ আসনে দলের মিডিয়া সেলের সদস্য ফারজানা শারমিন পুতুলকে প্রার্থী করে বিএনপি। তবে ধানের শীষ না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বহিষ্কার হন দলের সাবেক সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু। বহিষ্কৃত হলেও জনসভাসহ প্রচারের মধ্য দিয়ে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে আবির্ভূত হয়েছেন তিনি। নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবার বিএনপিতে ফেরার আশাবাদও ব্যক্ত করেছেন টিপু। এখানেও এ দুজনের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে।

বাগেরহাট-১, ২ ও ৩—এই তিন আসনে প্রার্থী হয়েছেন বাগেরহাট-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সিলভার লাইন গ্রুপের কর্ণধার এম এ এইচ সেলিম। অবশ্য বর্তমানে বিএনপিতে তার কোনো পদ নেই। তবে তিনি নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থীর জন্য ‘বড় চ্যালেঞ্জ’ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

টাঙ্গাইল-৫ আসনে বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে প্রার্থী করেছে দল। তবে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। দল তাকে বহিষ্কার করলেও স্থানীয় বিএনপির একটি অংশ ফরহাদের পক্ষে রয়েছে। এখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে।

ময়মনসিংহ-১ আসনে ধানের শীষ পান বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। তবে এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সালমান ওমর রুবেল। আসনটিতে প্রার্থী সাতজন হলেও ভোটের আলোচনায় শীর্ষে রয়েছেন তারা দুজন। স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংগঠনিকভাবেও তারা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। এ কারণে ভোটের ব্যালটেও শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবেন প্রিন্স-রুবেল।

ফুলবাড়িয়া উপজেলা নিয়ে গড়া ময়মনসিংহ-৬ আসনটিতে বিএনপি এবং জামায়াত দুদলেরই ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী রয়েছে। ধানের শীষের প্রার্থী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আখতারুল আলম ফারুক। এ আসনে ফুটবল প্রতীক নিয়ে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য প্রকৌশলী শামছ উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী আখতার সুলতানা মাঠে আলোচনায় রয়েছেন। অন্যদিকে, জামায়াত মনোনীত প্রার্থী কামরুল হাসানের পাশাপাশি ঘোড়া প্রতীক নিয়ে প্রচারে ঝড় তুলেছেন জামায়াতের বহিষ্কৃত নেতা জসিম উদ্দিন। স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, এই আসনে মূল লড়াই হবে এই চার প্রার্থীর মধ্যে।

ঢাকা-১২ আসনটি গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে ছেড়ে দেয় বিএনপি। এ আসনে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন পান ঢাকা মহানগর উত্তর কমিটির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব। পরে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে থাকায় বিএনপির সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীদের নিয়ে নিয়মিত প্রচার, গণসংযোগও করেছেন। এ আসনে সাইফুল হকের জয়ের পথে ‘বড়’ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন নীরব।

জমিয়তের সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনটি ছেড়ে দেয় বিএনপি। তবে বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের মহাসচিব তরুণ দে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন। দুজনকেই এরই মধ্যে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। তবে বিএনপির পদধারী সাবেক নেতা ও সাধারণ কর্মী এবং সাধারণ মানুষের সমর্থনে রুমিন ফারহানার পক্ষে এরই মধ্যে গণজোয়ার তৈরি হয়েছে। শেষ হাসিও তিনিই হাসতে পারেন বলে অনেকে মনে করছেন।

নীলফামারী-৪ আসনে আব্দুল গফুর সরকারকে প্রার্থী করে বিএনপি। এ ছাড়া দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে হাফেজ আব্দুল মুনতাকিম এবং লাঙ্গল প্রতীকে সিদ্দিকুল আলম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ২০০১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জাতীয় পার্টি বিভিন্ন সময়ে আসন দখলে রাখলেও এবার বিএনপি ও জামায়াত জয়লাভের জন্য মরিয়া। তবে বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলেছে নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থী রিয়াদ আরফান সরকার। ফলে জামায়াত কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে স্থানীয় ভোটররা বলছেন, এখানে শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টি, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হতে পারে।

সাতক্ষীরা-৩ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন সাবেক এমপি কাজী আলাউদ্দীন। এ আসনে ধানের শীষ না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে রয়েছেন ‘গরিবের ডাক্তার’খ্যাত ‘বহিষ্কৃত’ ডা. মো. শহীদুল আলম। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় স্থানীয় বিএনপি এখানে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আর বিভক্তির এ সুবিধা কাজে লাগিয়ে বিজয়ের স্বপ্ন দেখছেন জামায়াতের প্রার্থী। ফলে এখানে ত্রিমুখী লড়াই হতে যাচ্ছে।

নোয়াখালী-২ আসনে দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সাবেক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুককে প্রার্থী করে বিএনপি। তবে ধানের শীষ না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে রয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য ‘বহিষ্কৃত’ কাজী মফিজুর রহমান। আগামীকালের নির্বাচনে তিনিও বিএনপির প্রার্থীর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছেন।

ঢাকা-৯ আসনে ধানের শীষে ভোট করছেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হাবিবুর রশিদ হাবিব। অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছেড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন চিকিৎসক তাসনিম জারা। তার প্রতীক ফুটবল। প্রচারের মধ্য দিয়ে এরই মধ্যে বেশ আলোচনায় এসেছেন জারা। হাবিব এখানে এগিয়ে থাকলেও জারাও প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেন বলে অনেকের অভিমত।

চাঁদপুর-৪ আসনে দলের রাজস্ব ও ব্যাংকিংবিষয়ক সম্পাদক সাবেক এমপি লায়ন হারুনুর রশীদকে প্রার্থী করেছে বিএনপি। জেলার সর্বাধিক প্রবাসী অধ্যুষিত এ আসনটি বিএনপির অপ্রতিদ্বন্দ্বী দুর্গ হিসেবে পরিচিত। তবে ফরিদগঞ্জ উপজেলা বিএনপির (সদ্য বহিষ্কৃত) সভাপতি এম এ হান্নান মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় বেকায়দায় পড়েছেন দলের নেতাকর্মীরা। এমএ হান্নানের অনুগতদের বিশ্বাস, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নিয়ে তারা ধানের শীষের মোকাবিলা করবেন। সেই ক্ষেত্রে এ আসনে লড়াইয়ের সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে। এ আসনে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট করছেন বিল্লাল হোসেন মিয়াজী। তবে সাধারণ ভোটারদের ধারণা, এ আসনে লড়াই হবে বিএনপি বনাম বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে। আর শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে ধানের শীষ।

শেরপুর-১ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা। এই চিকিৎসক ২০১৮ সালের নির্বাচনেও ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন। আর ধানের শীষ না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকায় বহিষ্কৃত হন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম মাসুদ। এ দুই প্রার্থীর কারণে এখানে তৃণমূল বিএনপির ভোট বিভক্ত। তবে অনেকে মনে করছেন, বিএনপির নেতাকর্মীদের বিভাজন দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী হাফেজ রাশেদুল ইসলামের জন্য তৈরি করেছে কৌশলগত সুযোগ, যা তিনি কাজে লাগাতে চান। তবে নিয়মিত গণসংযোগ, নারী ভোটারদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ এবং দলীয় সাংগঠনিক শক্তিকে ভর করে এগিয়ে রয়েছেন ডা. সানসিলা।

মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনটি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) দখলে। এ আসনে বিএনপি থেকে প্রার্থী হয়েছেন চৌধুরী নাদিরা আক্তার, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের রিকশা প্রতীকের সাঈদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা। আর ধানের শীষ না পেয়ে বিএনপির দুই নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে থাকায় এরই মধ্যে বহিষ্কৃত হয়েছেন। তারা হলেন শিবপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক জাহাজ প্রতীকের কামাল জামান মোল্লা এবং জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফুটবল প্রতীকের সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী লাভলু। স্থানীয়রা জানান, ‘নিষিদ্ধ’ আওয়ামী লীগের ভোট যিনি পাবেন, তিনি বিজয়ী হবেন।

মাদারীপুর-২ আসনে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব জাহান্দার আলী জাহানকে প্রার্থী করেছে বিএনপি। অন্যদিকে ধানের শীষ না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন মিল্টন বৈদ্য, তার মার্কা কলস। নির্বাচনে জাহান্দারের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী তিনি। দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে একটি বড় অংশ মিল্টন বৈদ্যের হয়ে প্রচার কাজে অংশ নিয়েছেন। ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পান মিল্টন বৈদ্য। তিনি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সাবেক সদস্য। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন তিনি। বিএনপি এরই মধ্যে তাকে বহিষ্কার করেছে। এ আসনেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের প্রভাব। যিনিই আওয়ামী লীগের ভোট পাবেন, তিনিই বিজয়ী হবেন বলে ভোটাররা জানিয়েছেন।

নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মো. আশরাফ উদ্দিন বকুল। ধানের শীষ না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে থেকে বহিষ্কার হন জেলা বিএনপির সহসভাপতি জামাল আহমেদ চৌধুরী। ফলে এখানে বিএনপির তৃণমূল বিভক্ত। জামাল আহমেদের পক্ষে বিএনপির একটি অংশ কাজ করছে। ফলে নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী জামাল আহমেদ চৌধুরী। জানা যায়, এ আসনটি মূলত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তাই যিনি আওয়ামী লীগের ভোট টানতে পারবেন, শেষ হাসি তিনিই হাসবেন।

সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী দলের জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির অন্যতম সদস্য নূরুল ইসলাম। এখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হলেন দলটির জেলা নায়েবে আমির আইনজীবী মোহাম্মদ শামস্ উদ্দীন। এই আসনে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন জেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ও আহ্বায়ক কমিটির সাবেক সদস্য দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন। তিনি মরমি কবি হাছন রাজার প্রপৌত্র। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মরমি কবি হাছন রাজার উত্তরসূরি জাকেরীনের নিজস্ব ভোট ব্যাংক রয়েছে এ আসনে। চারবার সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদ ও একবার সুনামগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। একবার তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সুনামগঞ্জ-৩ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। একাধিকবার নির্বাচন করার অভিজ্ঞতা ও পারিবারিক পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে তিনি ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন। নির্বাচনে জাকেরীন বিএনপির প্রার্থী নূরুল ইসলাম নুরুলকে চ্যালেঞ্জ জানাবেন।

এ ছাড়া কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলি-বাজিতপুর), নড়াইল-২ (লোহাগড়া-সদরের একাংশ), যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসনেও দল ও জোট প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিএনপির শক্তিশালী বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। যারা শেষ পর্যন্ত বিজয়ের হাসি হাসতে পারেন।

তবে ‘প্রতীকের গুরুত্ব বিবেচনায়’ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থীদের আশা ভঙ্গ হতে পারে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম কালবেলাকে বলেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অনেক যাচাই-বাছাই করে নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। যদিও বিএনপির মতো একটা বড় দলে প্রতিটি আসনেই মনোনয়নপ্রত্যাশী একাধিক নেতা ছিলেন। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে অনেকেই হয়তো মনঃক্ষুণ্ন হন এবং পরে বঞ্চিত মনে করে তাদের অনেকেই স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হন। তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘মার্কা’ একটা বিশাল ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। তাই কেউ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে জনগণও যেমন সেটা ভালো চোখে দেখে না, তেমনি নেতাকর্মীরাও তাদের সেভাবে সহযোগিতা করেন না। এ অবস্থায় দু-একটি জায়গায় হয়তো স্বতন্ত্ররা ভালো করতে পারে, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা ভালো করতে পারবে না।

অধ্যাপক ড. শামছুল আলমের মতে, যখন ঐক্যবদ্ধ থাকা সবচেয়ে বেশি জরুরি, তখন দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে তারা নিজেরাই তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চিত করে ফেললেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে তারা যে কাজটা করেছেন, সেটা তাদের জন্য আত্মঘাতী হবে। তারা সহজে আর দলের মূল স্রোতে প্রবেশ করতে পারবেন না। কারণ, দলের হাইকমান্ডও তাদের সহজে গ্রহণ করবে না।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিশ্বকাপের আগে ব্যালন ডি’অর জয়ের তালিকায় এগিয়ে যারা

‘জনগণ ভাবছে সরকার ভোট নয়, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে নির্বাচিত’

নজরদারিতে আইভী রহমান, বাড়ির সামনে বসানো হলো সিসিটিভি

প্রশ্ন গোলাম পরওয়ারের / এখনই ভুয়া ভুয়া স্লোগান দিচ্ছে, ৫ বছরে কী হবে

গুজব ছড়ানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার ২

সামরিক পরাজয়ের পর শত্রুরা গুপ্ত যুদ্ধে নেমেছে : মোজতবা খামেনি

২ দায়িত্ব একসঙ্গে পালনের নজির আছে, জানালেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

এক দলে দুই পতাকা! / ইরাকের জার্সিতে বিশ্বকাপ মাতাবেন ‘রাষ্ট্রহীন’ ৪ ফুটবলার!

চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রপাতে নারীসহ ৬ জনের মৃত্যু

স্ত্রীকে হত্যার পর রক্তাক্ত মরদেহ কাঁধে হাসপাতালে স্বামী

১০

তীব্র গরম কবে কমবে, জানাল আবহাওয়া অফিস

১১

আফগানিস্তান সিরিজ থেকে ছিটকে গেলেন কোহলি!

১২

লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ২ বাংলাদেশি আহত

১৩

‘এ রাষ্ট্র নারী-শিশুর নিরাপত্তা দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ’

১৪

বিশ্বকাপ ম্যাচের ফলাফল জানিয়ে চমকে দিল হাঙর

১৫

নিখোঁজের ৬ দিন পর এভারেস্টে জীবিত উদ্ধার নেপালি শেরপা

১৬

পাটওয়ারী-সারজিসের সফর ঘিরে মতলবে উত্তেজনা

১৭

‘বিদ্যুৎ খাতে নীতি দুর্বলতার বোঝা জনগণের ওপরে চাপানো যাবে না’

১৮

খড় শুকাতে গিয়ে হিটস্ট্রোকে প্রাণ গেল কৃষকের

১৯

তিন বছর ধরে অবরুদ্ধ, স্ত্রীর জানাজায়ও যেতে দিল না ছেলে

২০
X