

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী ও দলগুলোর আচরণবিধি প্রতিপালন তদারকির দায়িত্বে থাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সম্মানী এবং ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ অর্থ বণ্টনে নয়ছয়ের অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয় থেকে ১ হাজার ৪৪ জন ম্যাজিস্ট্রেটের প্রত্যেকের অনুকূলে ২ লাখ ৯২ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে অধিকাংশ কর্মকর্তাই সেই অর্থের পুরোটা পাননি। অনেক ক্ষেত্রে সামান্য কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে পুরো অঙ্কের প্রাপ্তি স্বীকারপত্রে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে বেশকিছু জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে। এমন অনিয়মে ক্ষুব্ধ মাঠ প্রশাসনে কর্মরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা, যা এখন তাদের ব্যাচভিত্তিক অভ্যন্তরীণ গ্রুপগুলোতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। যদিও জেলা প্রশাসকরা বলছেন, বরাদ্দ অনুযায়ী অর্থ সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের সময় আচরণবিধি লঙ্ঘন এবং নির্বাচন-পূর্ব অনিয়ম প্রতিরোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসকদের অনুকূলে ৩০ কোটি ৫৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা অগ্রিম বরাদ্দ দেয় নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়। ৬৪ জেলায় দায়িত্ব পালন করা ১ হাজার ৪৪ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যয় নির্বাহের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় এ অর্থ।
সে হিসাবে প্রত্যেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের জন্য বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৯২ হাজার ৫০ টাকা। তাদের জন্য নির্ধারিত ব্যয়ের মধ্যে ছিল আপ্যায়ন বাবদ ৯০ হাজার টাকা, জ্বালানি বাবদ ১ লাখ ৮০ হাজার এবং ম্যাজিস্ট্রেটদের সহায়তাকারীদের বাবদ সাড়ে ২২ হাজার টাকা। ভ্যাট ট্যাক্স বাদ দিয়ে প্রত্যেক ম্যাজিস্ট্রেটের জন্য বরাদ্দ দাঁড়ায় ২ লাখ ৫৬ হাজার।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, ম্যাজিস্ট্রেটদের বরাদ্দকৃত অর্থের পুরোটা তারা পাননি। বেশিরভাগ ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে বরাদ্দের সামান্য অংশ তুলে দেওয়া হয়েছে। অথচ পুরো টাকার প্রাপ্তি স্বীকারে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা চলেছে—কালবেলার সঙ্গে আলাপকালে এমনটি দাবি করেন সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা। এ নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের বিভিন্ন ব্যাচের গ্রুপে চলছে আলোচনা-সমালোচনাও।
জাতীয় নির্বাচনে বিভিন্ন জেলায় আচরণবিধি প্রতিপালন তদারকির দায়িত্বে থাকা বেশ কয়েকজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বরাদ্দের অর্থ বিতরণে জেলায় জেলায় বড় ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা দিয়েছে। অভিযোগ পাওয়া গেছে, ইসি সচিবালয় থেকে জেলা প্রশাসকদের কাছে পাঠানো নির্দেশনায় ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য ২ লাখ ৫৬ হাজার টাকার বেশি বরাদ্দের কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তারা এর সামান্য অংশ পেয়েছেন। তবে কিছু কিছু জেলায় বরাদ্দের কাছাকাছি অর্থ পেয়েছেন বলেও জানা গেছে।
এদিকে, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা না পেলেও জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা (বিচারিক হাকিম) ঠিকই তাদের বরাদ্দের পুরোটা পেয়েছেন বলে জানা গেছে। এ প্রসঙ্গে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে একাধিক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, তাদের জন্য বরাদ্দের অর্থ যদি তাদের আইবাসে আসত, তাহলে এমন সমস্যা হতো না, এটা জেলা প্রশাসনের আইবাসে আসার কারণে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অভিযোগ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিভিন্ন জেলায় সম্মানীর অঙ্কে বড় পার্থক্য রয়েছে। কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, কোনো কোনো জেলায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পেয়েছেন মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা, কোথাও ৩০ থেকে ৬০ হাজার, কোথাও আবার ১ লাখ থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। তবে বেশিরভাগ জেলায় ৬০ হাজার টাকার নিচে দেওয়া হয়েছে। আবার অনেক জেলায় এখনো সম্মানীর অর্থ বিতরণই করা হয়নি।
নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকারী একাধিক কর্মকর্তা জানান, তপশিল ঘোষণার পর দুই মাস ধরে প্রতিদিন মাঠে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে ম্যাজিস্ট্রেটদের। দিন-রাত টহল, পোস্টার অপসারণ, অভিযোগ তদন্তসহ নানা ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তারা; কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের পরও ঘোষিত সম্মানীর বড় অংশ হাতে পাননি। ঘোষিত সম্মানীর তুলনায় কম অর্থ পাওয়ায় তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অর্থ খরচ করেই নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে বলেও দাবি করেছেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করছেন জেলা প্রশাসকরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ ছিল, সেটা তাদের দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে একাধিক জেলা প্রশাসক বলেন, নির্বাচনকালীন ম্যাজিস্ট্রেটদের বরাদ্দ ও ব্যয় সরকারি নিয়ম মেনে দেওয়া হয়েছে। দায়িত্বের ধরন ও মেয়াদ অনুযায়ী তেল, সম্মানী, আপ্যায়ন ও সহায়তাকারীদের খোরাকি যথাযথভাবে বিতরণ করা হয়েছে। এখানে কোনো কাটছাঁট করা হয়নি। সব হিসাব ও নথি সংরক্ষিত আছে।
নড়াইলের জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ আবদুল ছালাম কালবেলাকে বলেন, ‘বরাদ্দ অনুযায়ী সবাইকে টাকা প্রদান করা হয়েছে।’
অনিয়মের অভিযোগের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে বরিশাল জেলার কথা উঠে এসেছে। দায়িত্ব পালনকারী কয়েকজন ম্যাজিস্ট্রেটের দাবি, তাদের সামনে জনপ্রতি মাত্র ৩০ হাজার টাকার খাম রেখে পুরো বরাদ্দ পাওয়ার স্বীকারোক্তিতে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে তারা প্রাপ্তি স্বীকারপত্রে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচনের সময় ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা পেশকার, ড্রাইভার ও অফিস সহায়ক কর্মীদেরও কোনো সম্মানী দেওয়া হয়নি।
পরে ম্যাজিস্ট্রেটদের ৫০ হাজার টাকা এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডদের ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়; কিন্তু তাতেও অনেকে রাজি না হলে তাদের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, জুনিয়র ম্যাজিস্ট্রেটদের আলাদাভাবে অফিস কক্ষে বা ফোনে ডেকে নিয়ে প্রাপ্তি স্বীকারপত্রে স্বাক্ষর দিতে চাপ দেওয়া হয়। স্বাক্ষর দিতে রাজি না হলে এমনকি এসিআরে নেতিবাচক মন্তব্য এবং বদলির হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বরিশালের জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমন বলেন, ‘নির্বাচনকালীন ম্যাজিস্ট্রেটদের বরাদ্দ নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। দায়িত্ব ছিল ৪৫ দিনের; কিন্তু অধিকাংশ ম্যাজিস্ট্রেট এক-দুদিনের বেশি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেননি। তারপরও তাদের নামে বরাদ্দকৃত অর্থ দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জ্বালানি, আপ্যায়ন ও সম্মানী এবং সহায়তাকারীদের খোরাকি বাবদ নির্ধারিত অর্থসহ মোট বরাদ্দের সম্পূর্ণই দেওয়া হচ্ছে।’
ম্যাজিস্ট্রেটদের সই নেওয়া নিয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে এ জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এগুলো মিথ্যাচার করছে তারা, কাউকে জোর করা হয়নি।’
অবশ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং জনপ্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এমন অভিযোগ নতুন নয়, এর আগের নির্বাচনগুলোতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে জনপ্রশাসনের এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ‘এমন অভিযোগ আগেও পেয়েছি। এটা খুবই খারাপ দৃষ্টান্ত, জুনিয়রদের টাকা সিনিয়র অফিসারদের আত্মসাতের এ প্রবণতা দীর্ঘদিনের। এটা বন্ধ হওয়া উচিত।’
বিষয়টি অবহিত করে মন্তব্য জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘কোনো অন্যায় মেনে নেওয়া হবে না। এ রকম কিছু হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’