

চলমান যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার প্রস্তাবকে ভয়াবহ ‘মরণফাঁদ’ হিসেবে দেখছে তেহরান। ইরানি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এই আলোচনার আড়ালে আসলে দেশটির টিকে থাকা শীর্ষ নেতাদের প্রলুব্ধ করে বের করে এনে হত্যার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলায় এখনো বেঁচে থাকা হাতেগোনা কয়েকজন নেতার অন্যতম মোহাম্মদ-বাঘের গালিবাফকে টার্গেট করার উদ্দেশ্যেই এই আলোচনার জাল বিছানো হয়েছে বলে মনে করছে ইরান।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, তেহরানের নীতিনির্ধারক এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা আরব দেশগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে যে কোনো মুখোমুখি আলোচনা ইরানের বর্তমান পার্লামেন্ট স্পিকার এবং সাবেক আধাসামরিক কমান্ডার মোহাম্মদ-বাঘের গালিবাফের জীবনের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমেরিকা চায় গালিবাফ এই আলোচনায় সরাসরি অংশ নিন। কিন্তু ইরান মনে করছে, এটি তাকে জনসমক্ষে বা নির্দিষ্ট কোনো স্থানে নিয়ে আসার একটি কৌশল মাত্র, যাতে তাকে গুপ্তহত্যার সহজ শিকারে পরিণত করা যায়। সাম্প্রতিক ইসরায়েলি বিমান হামলা থেকে গালিবাফ অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া শীর্ষ ইরানি নেতাদের একজন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইরানের পাল্টা হামলা থেকে সূচনা হওয়া যুদ্ধ এখন পর্যন্ত উভয় পক্ষে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলার হুমকি দিলেও ইরানের পাল্টা হুমকির পর তা স্থগিত করার ঘোষণা দেন এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য তেহরানকে পাঁচ দিনের সময় বেঁধে দেন। ট্রাম্প দাবি করেছেন, মার্কিন দূতরা একজন সম্মানিত ইরানি নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, যিনি একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী। তবে ইরানের পক্ষ থেকে এই দাবি পুরোপুরি নাকচ করা হয়েছে।
ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্পের এই হামলা স্থগিতের ঘোষণা কোনো শান্তির উদ্যোগ নয়, বরং এটি তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণের একটি সাময়িক কৌশল। তারা মনে করছেন, জ্বালানি অবকাঠামোতে পুনরায় বড় ধরনের হামলা চালানোর আগে বিশ্ববাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতেই এই বিরতি দেওয়া হয়েছে। গত সোমবার ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার গালিবাফ নিজে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে কোনো ধরনের আলোচনার কথা অস্বীকার করেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আর্থিক ও তেলের বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ‘ভুয়া খবর’ ছড়িয়ে বিশ্বকে বিভ্রান্ত করছে।
ট্রাম্পের ১৫ দফা হয়তো ইরানকে সন্তুষ্ট করতে পারবে না: ট্রাম্প প্রশাসন বেশ জোর দিয়েই ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য একটি চুক্তির কথা প্রচার করছে। ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তার মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার গত ২২ মার্চ গভীর রাত পর্যন্ত এ বিষয়ে আলোচনা চালিয়েছেন। যুদ্ধ অবসানে ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনায় ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিজেদের দখলে নেওয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘আমরা কোনো পারমাণবিক বোমা বা অস্ত্র দেখতে চাই না। একটি চুক্তি হলে আমরা নিজেরাই সেখানে যাব এবং ইউরেনিয়াম নিয়ে আসব।’ ট্রাম্পের এই ১৫ দফা পরিকল্পনায় ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধের শর্ত রয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ১৫ দফা প্রস্তাবটি পাকিস্তানের মাধ্যমে তেহরানের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে এই প্রস্তাবের কার্যকারিতা নিয়ে খোদ কূটনীতিকদের মধ্যেই সন্দেহ রয়েছে। কারণ এটি ২০২৫ সালের মে মাসে প্রস্তাবিত একটি কাঠামোরই পরিবর্তিত রূপ, যা ইসরায়েলি হামলার পর ভেস্তে গিয়েছিল। সেই প্রস্তাবে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে ইউরেনিয়াম রপ্তানি করা, সেন্ট্রিফিউজ অকেজো করা এবং সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা ভেঙে ফেলার মতো কঠোর শর্ত ছিল।
ইরান মনে করছে, আমেরিকা কৌশলগত কারণে তাদের অগ্রগতির কথা বাড়িয়ে বলছে। তেহরান শুধু আলোচনার বিষয়ে পরোক্ষ যোগাযোগের কথা স্বীকার করলেও কোনো ধরনের সরাসরি বা ব্যাক-চ্যানেল আলোচনার কথা অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, ওয়াশিংটন শুধু যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে এবং বাজার শান্ত রাখতে এই আলোচনার নাটক সাজাচ্ছে।