

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে জ্বালানি তেলের জাহাজ যেন এক অদ্ভুত প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে; কেউ খালাসের অপেক্ষায়, কেউ বিল পরিশোধের। অথচ একই সময়ে বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ দেশের সবখানেই পেট্রোল পাম্পের সামনে বাইকারদের দীর্ঘ লাইন। সরকারের ভাষ্যে মজুত ‘পর্যাপ্ত’; কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন গল্প। সরবরাহ ব্যবস্থার ভেতরে কোথাও যেন আটকে আছে জ্বালানির স্রোত।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা কয়েকটি জাহাজে হাজার হাজার টন ডিজেল ও অকটেন এরই মধ্যে পৌঁছেছে। ২৭ হাজার ৩০০ টন ডিজেলবাহী ‘পিভিটি সোলানা’সহ একাধিক জাহাজ এখন খালাসের অপেক্ষায়। গত এক সপ্তাহে এক লাখ টনের বেশি জ্বালানি এলেও তা দ্রুত ডিপোতে পৌঁছাতে পারছে না। কারণ, পাইপলাইন সক্ষমতা ও লাইটার জাহাজ সংকট। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় খালাস ও পরিবহন প্রক্রিয়ায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি সময় লাগছে। ফলে বন্দরে জাহাজ থাকলেও বাজারে তার প্রতিফলন মিলছে না।
জ্বালানি আমদানির এ জটের পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ডলার সংকট। ব্যাংকগুলো সময়মতো এলসি পরিশোধ করতে না পারায় অনেক জাহাজ বহির্নোঙরে কয়েকদিন অপেক্ষা করছে। এতে যেমন ডেমারেজ খরচ বাড়ছে, তেমনি সরবরাহ চেইনেও তৈরি হচ্ছে অচলাবস্থা।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি খাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডলার বরাদ্দ দেওয়া হলেও বৈশ্বিক বাজারে মূল্য অস্থিরতা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার ধীরগতি সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।
অন্যদিকে, পাম্পগুলোতে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। নগরের গনি বেকারি মোড়, ওয়াসা, মুরাদপুর যেখানেই যাওয়া হোক, দেখা মিলছে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর মিলছে সীমিত তেল।
নগরীর বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা গেছে মালিকরা ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বেশি তেল দিতে অনীহা দেখাচ্ছেন। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন রাইড শেয়ারিং চালকরা। তাদের ভাষায়, ট্যাংক ফুল না করলে রাস্তায় নামাই দায়।
সময় নষ্ট, আয় কমে যাওয়া আর অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে এ সংকট এখন শুধু জ্বালানির নয়, জীবনযাত্রারও। লাইটার জাহাজ পরিচালনাকারী বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের (বিডব্লিউটিসিসি) পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে জানানো হয়েছে, তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো (পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা) চাহিদা অনুযায়ী মেরিন ডিলারদের তেল সরবরাহ করছে না। এর ফলে লাইটার জাহাজগুলো সময়মতো মাদার ভেসেলে গিয়ে পণ্য লোডিং করতে পারছে না এবং এরই মধ্যে লোড করা জাহাজগুলোও গন্তব্যে রওনা হতে পারছে না। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে লাইটার জাহাজের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে মাদার ভেসেলের অবস্থানকাল বেড়ে যাবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। এ ছাড়া বিদেশি জাহাজগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে আসার আগ্রহ হারাতে পারে, যার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি দেশের অর্থনীতির ওপর পড়বে। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধিরও আশঙ্কা রয়েছে। এ সংকট নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে বিডব্লিউটিসিসি।
মাদার ভেসেল থেকে তেল নামিয়ে দেশের বিভিন্ন ডিপোতে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় লাইটার জাহাজের একটি বড় অংশ এখন অচল। মালিকদের বকেয়া পাওনা, পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে অনেকেই নিয়মিত ট্রিপে আগ্রহ হারিয়েছেন।
বিডব্লিউটিসিসির মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ কালবেলাকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিদিন গড়ে ৮০টি জাহাজ বরাদ্দ থাকে। এতে ২ লাখ ৪০ হাজার লিটার তেলের প্রয়োজন। কিন্তু আমরা ৫০ থেকে ৬০ হাজার লিটারের বেশি তেল পাচ্ছি না। ফলে দুই থেকে তিন দিন, ক্ষেত্রবিশেষে ছয়-সাত দিনও দেরি (ডিলে) হচ্ছে জাহাজ। এতে ভবিষ্যতে মাদারভেসেলগুলো সাফার করতে পারে।’
তিনি বলেন, “এসব কারণে বন্দরে থাকা জ্বালানি দেশের ভেতরে ছড়িয়ে পড়তে পারছে না, তৈরি হচ্ছে এক ধরনের অদৃশ্য ‘বোটলনেক’ (জটলা)।”
এদিকে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি। কোথাও কোথাও তেল মজুত থাকা সত্ত্বেও ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রশাসনের অভিযানে কয়েকটি পাম্পে লুকানো মজুতের প্রমাণও মিলেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সরবরাহ শৃঙ্খলার প্রতিটি স্তরে সমন্বয়হীনতা ও ধীরগতি এ সংকটের মূল কারণ। শুধু আমদানি বাড়ালেই সমাধান আসবে না।
আসছে তেলের আরও দুই চালান, পথে ৬ জাহাজ: এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে জ্বালানি তেল নিয়ে দুটি জাহাজ আসছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এদিকে, পারস্য উপসাগরে থাকা আরও ছয় বাংলাদেশি জাহাজ দ্রুত সময়ে হরমুজ প্রণালি পার হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমি জাহানাবাদী।
গতকাল বুধবার বিপিসির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এরই মধ্যে মালয়েশিয়া থেকে ২৭ হাজার ৩০০ টন পরিশোধিত ডিজেল নিয়ে একটি জাহাজ এসেছে। মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বন্দরে আসা ‘পিভিটি সোলানা’ নামের পানামার পতাকাবাহী জাহাজটি ডলফিন জেটি-৫-এ নোঙর করেছে। মালয়েশিয়ার পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান কোম্পানি চালানটি সরবরাহ করেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে জ্বালানি তেলের আরও দুটি চালান চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। একটি জাহাজ সিঙ্গাপুর থেকে ৩০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে আসবে। ‘ইউয়ান জিং হে’ নামের ওই জাহাজের পাশাপাশি ২৫ হাজার টন অকটেন নিয়ে ‘সেন্ট্রাল স্টার’ নামের আরেকটি জাহাজও বন্দরে পৌঁছবে।
এদিকে, গতকাল বুধবার ঢাকার দূতাবাসে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমি জাহানাবাদী বলেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাহাজগুলোর হরমুজ প্রণালি পার করার বিষয়ে সহায়তা চাওয়া হলেও ‘স্পেসিফিকেশন’ না থাকায় সেগুলো চিহ্নিত করতে পারেনি তেহরান। এরপর গত সপ্তাহে পাওয়া তথ্য নিয়ে এখন জাহাজগুলো পার করার প্রক্রিয়া চলছে। আমি আশা করি, বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজগুলো দ্রুত হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করবে এবং বাংলাদেশের জ্বালানির কোনো সংকট থাকলে সেটার সমাধান হবে। এর পাশাপাশি সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার যে বিবৃতি দিয়েছে, তা নিয়ে ইরান সন্তুষ্ট নয়—এমনটা জানান রাষ্ট্রদূত। তেহরানের প্রত্যাশা, যুক্তরাষ্ট্রের এমন আগ্রাসী শক্তির ভূমিকার নিন্দা করবে বাংলাদেশ।
তিনি আরও বলেন, ইরান ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতিতে আমরা কষ্ট পেয়েছি। এই বিবৃতি আরও স্পষ্ট হওয়া উচিত ছিল। বাংলাদেশ মুসলিম রাষ্ট্র। আমাদের ভাই (বাংলাদেশ) হিসেবে ইরানে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে নিন্দা করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা ছিল, সেটা হয়নি। এটা আমাদের জন্য কষ্টের।
যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা কামনা: চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। এ নিয়ে ওয়াশিংটন ডিসিতে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি দপ্তরে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটের সঙ্গে আলোচনায় বসেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ বৈঠকের বিস্তারিত জানানো হয়।
বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটানো এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের কারিগরি ও কৌশলগত সহায়তা অত্যন্ত জরুরি। তিনি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মার্কিন জ্বালানি দপ্তরকে বিশেষ ভূমিকা রাখার অনুরোধ জানান।
মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উত্থাপিত বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।