

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের গুলিতে নিহত আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তার বাবা মকবুল হোসেন। রায়-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘যারা পুলিশের বড় কর্মকর্তা তাদের সাজা দেওয়া হয় নাই। খালি কনস্টেবলের ওপর দিয়া গেল। যাদের আদেশে আমার ছেলেকে হত্যা করা হছে তারা বাঁচি গেল।’
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর এলাকার জাফরপাড়ায় নিজ বাড়িতে রায় নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে এসব কথা বলেন শহীদ আবু সাঈদের বাবা। এ সময় মা মনোয়ারা বেগমও প্রতিক্রিয়া জানান। মকবুল হোসেন বলেন, ‘রায়ে দুজনকে ফাঁসি দিয়েছে এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। এতে আমি সন্তুষ্ট নই। আরও লোকের ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল। বড় অফিসারেরা আদেশ দিছে, তারাই বাঁচি গেল।’
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়া ও শিক্ষক আসাদ মণ্ডলের ১০ বছরের কারাদণ্ডের শাস্তির রায়ে হতাশা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পোমেল বড়ুয়া অত্যন্ত অপরাধী মানুষ। ও আমার ছেলেকে অপদস্ত, মারধর, লাঠিচার্জ করছে; গলা টিপে ধরেছিল, গালে-বুকে থাপড়াইছে। ওকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো উচিত ছিল। তাদের মাত্র ১০ বছরের কারাদণ্ড। তাদের এখনমাত্র জেলে ঢুকা আর বের হওয়া। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আসাদ মণ্ডল আমার ছেলেকে মারার জন্য জড়িত ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক দোষী এবং অপরাধী এড়িয়ে গেছে। কেউ কেউ ভারতে পালিয়ে গেছে। অনেকের সাজা কম দেওয়া হয়েছে। আমার ছেলে, রাষ্ট্রের প্রধান ও আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে কী করা যাবে, সে সিদ্ধান্ত নেব।’
এ সময় শহীদ আবু সাঈদের মা মনোয়ার বেগম বলেন, ‘এই রায়ে আমরা খুশি নই। আরও বেশি আসামিকে ফাঁসি দিলে আমরা খুশি হতাম। এখন তো সরকারের হাতে সুযোগ, দেখি কী করে। সঠিক বিচার না করলে ছাত্ররা জীবন দিয়ে কী হলো? জীবন দিয়ে তো কিছুই হলো না। এইটা বিচার হলেও শান্তি হয়নি। মোরও শান্তি হইল না, ছইলের আত্মাও শান্তি পাবার নয়। দুনিয়াত সঠিক বিচার নাই।’
আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণার পর সাক্ষী, সহপাঠী ও জুলাই আন্দোলনের সহযোদ্ধাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা গেছে। তারা রায়কে আংশিক ইতিবাচক বললেও শাস্তির মাত্রা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন।
এ মামলার সাক্ষী ইমরান হোসেন কালবেলাকে বলেন, ‘এই হত্যা মামলার রায় ঘোষণার বিষয়টি ইতিবাচক; তবে যেমন ধরনের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে, তা হতাশাজনক। যাদের নির্দেশেই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হয়নি। একই সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অনেককেই মামলার বাইরে রাখা হয়েছে।’
আরেক সাক্ষী রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী আরমান হোসেন বলেন, ‘সেদিন যেসব পুলিশ ও ছাত্রলীগের ক্যাডাররা মারণাস্ত্র হাতে নিয়ে আমাদের ওপর আক্রমণ করেছিল, তাদের সে অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হয়নি। প্রত্যাশা অনুযায়ী রায় হয়নি। আমরা হতাশ।’
আবু সাঈদকে গুলি করার সময় ঘটনাস্থলে তার সঙ্গে ছিলেন ছিলেন গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য হানিফুর রহমান সজীব। রায় নিয়ে তিনিও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘যেসব উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নির্দেশে গুলি চালানো হলো, তাদের কারাদণ্ড দেওয়া হলো। অথচ তাদের প্রত্যক্ষ মদদেই এ হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে।’
বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ও জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়ক শামসুর রহমান সুমন বলেন, ‘সেদিন যারা এই হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে এবং হত্যায় সরাসরি জড়িতে ছিল তাদের লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সরকারের কাছে দাবি জানাব, এ বিষয়গুলো আমলে নিয়ে তাদের শাস্তি যেন পুনর্বিবেচনা করা হয়।’