

রাজধানীর কদমতলী এলাকার বাসিন্দা মোসাম্মৎ রাবেয়া আক্তার। স্বামী ও তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার তার। স্থানীয় ভূঁইয়া মেটাল কারখানায় টিনের কৌটা তৈরির কাজ করে মাস শেষে তিনি সাকল্যে ১২ হাজার টাকা বেতন পান। এই আয় দিয়েই তাকে ঘরভাড়া, বাজার খরচ, স্বামীর ওষুধ এবং ছোট ছেলের পড়ার খরচ চালাতে হয়। আগে থেকেই আর্থিক চাপে থাকা রাবেয়া আরও সংকটে পড়েছেন, যখন যুদ্ধ ও ভূরাজনীতির কারণে সংসারের সব খরচ দ্রুত বেড়েছে।
রাবেয়া বলেন, ‘মাস শেষে যা পাই, তার থেকে ঘরভাড়ার পাঁচ হাজার টাকা দেওয়ার পর যা থাকে, তা দিয়েই মাসের বাকি দিন চলতে হয়। সংসারের অন্যান্য খরচ চালাতে প্রতি মাসেই কিছু না কিছু ধার করতে হয়। দুই বছর ধরে বেতন একই আছে। এই দুই বছরে কি সংসারের খরচ একই আছে? বাসাভাড়া থেকে শুরু করে বাজারের সবকিছুর দাম বেড়েছে। মালিক বলেছিলেন এবার বেতন বাড়াবেন। কিন্তু এখন শুনি আমেরিকার যুদ্ধের জন্য ব্যবসার অবস্থা ভালো নয়। তাই বেতনও বাড়বেন না।’
শুধু রাবেয়া নন, দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের লাখো শ্রমিক এখন জীবনযুদ্ধে লড়ছেন। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সমন্বয় করতে না পেরে অনেকেই মাস শেষে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। কয়েক বছর ধরে স্থানীয় রাজনীতি, ভূরাজনীতি, বৈশ্বিক মন্দা ও আধিপত্যের সংঘাতে শ্রমজীবী মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ জরুরি সেবার দাম বেড়েছে। একই কারণে ভোজ্যতেল, চাল, ডাল, আটা-ময়দা ও সবজিসহ নিত্যপণ্যের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে দৈনন্দিন ব্যয় বেড়েছে এবং অনেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন।
দেশে চব্বিশের জুলাই আন্দোলন ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন, আমেরিকার পাল্টা শুল্ক, জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে শিল্প খাতে সংকট বেড়েছে। শিল্পের প্রসার না হয়ে উল্টো অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং রপ্তানি কমেছে ব্যাপক হারে। এর নেতিবাচক প্রভাব শ্রমিকদের ওপর পড়েছে। যেভাবে ব্যয় বেড়েছে, সেভাবে আয় বাড়েনি। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধির হার মিলছে না এবং অনেক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, টানা ৫০ মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি। মার্চ মাসে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ, যেখানে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে এটি ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, সিপিডিসহ বিভিন্ন সংস্থা বলছে, ইরান যুদ্ধের কারণে চলতি বছরের জুন মাস নাগাদ মূল্যস্ফীতি ১৩ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে। এরই মধ্যে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আলোচনাও রয়েছে। ভোজ্যতেলের দাম লিটারপ্রতি ৪ টাকা বেড়েছে এবং গমের দামও বেড়েছে। হাওরের আগাম বন্যা চালের বাজার নিয়ে নতুন দুশ্চিন্তা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি আতিকুর রহমান সোহেল বলেন, ‘প্রতিনিয়ত পণ্যের দাম বাড়ছে, কিন্তু শ্রমিকের মজুরি বাড়ার ঘোষণা নেই। তাহলে শ্রমিক চলবে কীভাবে?’ তিনি ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো, রেশনিং ব্যবস্থা চালু, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার এবং মাতৃত্বকালীন ছুটি বাড়ানোর দাবি জানান।
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দারিদ্র্য বৃদ্ধির কারণ হিসেবে কর্মসংস্থানের অভাব, চাকরি হারানো, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মজুরি না বাড়ার বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ জানায়, গত তিন বছরে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে কয়েক লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন।
গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার বলেন, ‘যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব সবার আগে শ্রমিকদের ওপর পড়ে।’ তিনি বলেন, শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজ করেও সংসার চালাতে পারেন না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনা মহামারির ধাক্কা, এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পরে ভূরাজনীতির চক্করে মার্কিন পাল্টা শুল্ক শিল্পখাতকে দুর্বল করেছে। এতে উৎপাদন কমেছে, রপ্তানি সীমিত হয়েছে এবং শ্রমিকদের আয় কমে গেছে। বিজিএমইএ জানিয়েছে, গত সাত মাসে বস্ত্র ও পোশাক খাতে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি যথাক্রমে ৩৭ দশমিক ৮৭ ও ১২ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের গত নয় মাসে রপ্তানি কমেছে এবং গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সাড়ে ৪ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে।