সানাউল হক সানী ও ফারুক আলম
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৩ মে ২০২৬, ০৭:৩৯ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

লোকসানের সাগরে ভেসেও লাভের পাল ওড়ায় বিপিসি!

লোকসানের সাগরে ভেসেও লাভের পাল ওড়ায় বিপিসি!

‘কাজির গরু’ যেমন কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই; বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মুনাফাও খাতা-কলমে সীমাবদ্ধ, বাস্তবে নেই। উল্টো বিপিসি দৈনিক শত শত কোটি টাকা লোকসান দিয়ে এলেও তারা বছরের পর বছর এটিকে ‘লাভজনক’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, সূক্ষ্ম কারচুপির মাধ্যমে অডিট প্রতিবেদনে গৎবাঁধা লাভের হিসাব দেখিয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি।

গত এক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় অন্যান্য বছরের তুলনায় বিপিসির ব্যয় অনেক বেশি হয়েছে। এ লোকসান দৈনিক শত শত কোটি টাকা। এর আগেও বিপুল অঙ্কের টাকা লোকসানে ছিল বিপিসি। কিন্তু নানা গোঁজামিল দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে লাভজনক দেখিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ২০২৫ সালের সমাপ্ত বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনেও লোকসানের পরিবর্তে উল্টো লাভ দেখিয়েছে। এ ছাড়া নানা সময়ে নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি ভোগাচ্ছে বিপিসিকে। এই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ বেশ কয়েকটি ব্যাংকে থাকা তাদের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার ফিক্সড ডিপোজিট রিসিট (এফডিআর) বর্তমানে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে।

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান চালিকাশক্তি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিপিসি। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ টাকার লেনদেন করে তারা। বছরে বছরে আর্থিক প্রতিবেদন যখন প্রকাশ পায়, তখন মুনাফার বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে। বিগত বছরগুলোর মতো ২০২৫ সালের সমাপ্ত বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে বিপিসির রাজস্ব বা টার্নওভার ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমলেও বেড়েছে নিট মুনাফা। তবে অডিট প্রতিবেদনে নিরীক্ষকদের দেওয়া ‘এমফ্যাসিস অব ম্যাটারস’ বা গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাগুলো উন্মোচন করেছে বিপিসির আর্থিক ব্যবস্থাপনার সব অসংগতি, যা কেবল অনিয়মই নয়; দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক গাফিলতিও।

মুনাফার বিপরীতে রাজস্বের পতনের পরও আর্থিক প্রতিবেদনে বিপিসি চলতি অর্থবছরে ৪ হাজার ৩১৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকার নিট মুনাফা দেখিয়েছে, যা আগের বছরের ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি ২৯ লাখ টাকার তুলনায় প্রায় ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেশি। কিন্তু মুনাফার পেছনের গণিতটি বেশ রহস্যময়। প্রতিষ্ঠানের মোট টার্নওভার ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকায়। বিক্রীত পণ্যের ব্যয় কমেছে ঠিকই, কিন্তু ব্যবসার মূল ভলিউম কমে যাওয়ার পরও মুনাফা বৃদ্ধি একটি বড় প্রশ্নবোধক এঁকে দিয়েছে। নিরীক্ষকদের সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে—প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কাঠামোর ভিত্তিই নড়বড়ে। মোট সম্পদ ৯৩ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা থেকে কমে ৯২ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকায় নেমে এসেছে, যা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ সংকুচিত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। বিপিসির ২ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকার দায়ও রহস্যঘেরা। প্রতিষ্ঠানটির অডিট প্রতিবেদনে সবচেয়ে গুরুতর ও বিভ্রান্তিকর অংশ ২ হাজার ৩৮৪ কোটি ৩২ লাখ ৯ হাজার টাকার দায়। আর্থিক বিবরণীতে বিশাল এ অঙ্কটিকে ‘দায়’ বা লায়াবিলিটি হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু নিরীক্ষক সংস্থা ‘এম এ ফজল অ্যান্ড কোং’ ও ‘মাহমুদ সবুজ অ্যান্ড কোং’ স্পষ্টভাবে তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, হিসাববিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, এটি দায় হতে পারে না। এটি মূলত ‘শেয়ার মূলধন’ বা ইক্যুইটির অংশ হওয়ার কথা।

পেশাদার অডিটরদের মতে, এ ভুল শ্রেণীকরণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মূলধন কাঠামো আড়াল করা হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, কেন একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান ইক্যুইটিকে দায় হিসেবে দেখাবে? এর ফলে একদিকে যেমন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক শক্তির প্রকৃত চিত্র গোপন থাকছে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারী বা অংশীদারদের কাছে বিপিসির দায়বদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তাদের ভাষ্য, এটি কি কোনো পরিকল্পিত হিসাবের কারসাজি, নাকি অদক্ষতার চরম পর্যায়!

বারবার ‘রিস্টেটমেন্ট’: বিপিসি একটি স্বনামধন্য ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাব স্বচ্ছ হওয়ার কথা। কিন্তু বিপিসির ক্ষেত্রে বারবার ‘রিস্টেটমেন্ট’ বা গত বছরের হিসাব সংশোধন করা একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এ বছরও প্রতিষ্ঠানটি ৫৫৯ কোটি ৬ লাখ ৬৬ হাজার ১০০ টাকার হিসাব আগের বছরের তথ্যের সঙ্গে সমন্বয় (রিস্টেট) করেছে। প্রতি বছরই এত বড় অঙ্কের টাকা নতুন করে সমন্বয়ের বিষয়টি নির্দেশ করে যে, বিগত বছরগুলোর হিসাব সঠিক ছিল না। এমনও হতে পারে, কোনো অস্পষ্টতা ঢাকতে প্রতিষ্ঠানটি বারবার আগের তথ্যে কাটাছেঁড়া করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন অস্থির আর্থিক ব্যবস্থাপনা একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনোভাবেই শোভন নয়।

অস্তিত্বহীন সম্পদ ও ক্যাপিটাল রিজার্ভের জালিয়াতি আর্থিক প্রতিবেদনের অস্পষ্টতা কেবল রিস্টেটমেন্টেই সীমাবদ্ধ নয়। ক্যাপিটাল রিজার্ভের নামে ৫ কোটি ৫৬ লাখ ৭০ হাজার ৩৯১ টাকার একটি হিসাব বছরের পর বছর ঝুলে আছে। অডিটররা অনুসন্ধান করে দেখেছেন, এ রিজার্ভের বিপরীতে বাস্তবে কোনো সম্পদ বা সম্পত্তির অস্তিত্ব নেই। তাদের প্রশ্ন, এই ৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা কোথায় গেল? এটি কি ভূতুড়ে সম্পদ?

মালিকানা নিয়ে বিরোধ: ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডসহ (ইআরএল) বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিপিসির সম্পদের মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের রেষারেষি অডিট প্রতিবেদনে নতুন করে সামনে এসেছে। ইআরএলের ব্যবহারের জন্য ক্রয় করা স্থায়ী সম্পদগুলোকে বিপিসি তাদের বিনিয়োগ হিসেবে দেখাচ্ছে। অথচ নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, এ সম্পদের মালিকানা নিয়ে বিপিসি এবং ইআরএল কারও কাছেই কোনো স্বচ্ছ আইনি দলিল নেই। অর্থাৎ, যে সম্পদের মালিকানা বিতর্কিত, সেটিকেই বিপিসি তাদের সম্পদের তালিকায় বড় করে দেখাচ্ছে। এটিকে সম্পদের এক ধরনের কৃত্রিম স্ফীতি ঘটানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন অডিটররা।

সরকারি পাওনা নিয়েও চরম উদাসীন বিপিসি। সরকারের পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে তাদের যে দায়িত্বশীলতা থাকার কথা, তা অডিট প্রতিবেদনে অনুপস্থিত। সরকারের শেয়ার বিনিয়োগ বাবদ ৩০ কোটি ৭ লাখ ৯৭ হাজার ২৯২ টাকা দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া রয়েছে। অথচ, এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যেও বিপিসি এই ঋণের বিপরীতে কোনো সুদ দেয়নি; মূল টাকা পরিশোধের জন্যও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থের প্রতি এমন উদাসীনতা বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের দিকেই আঙুল নির্দেশ করে।

বিপিসির নগদ প্রবাহের (ক্যাশ ফ্লো) সংকট এবং বিনিয়োগ ব্যর্থতার চিত্রও বেশ উদ্বেগজনক। যদিও পরিচালন কার্যক্রম থেকে ৩ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা নিট ক্যাশ ফ্লো এসেছে, কিন্তু বিনিয়োগ কার্যক্রম থেকে প্রতিষ্ঠানটি ৭৩২ কোটি টাকার নিট নেতিবাচক ক্যাশ ফ্লো প্রত্যক্ষ করেছে। এখানে স্থায়ী সম্পদ অর্জন এবং ক্যাপিটাল ওয়ার্ক ইন প্রোগ্রেসে (মূলধনি সম্পদ) ভুল বিনিয়োগের কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে, অর্থায়ন কার্যক্রম থেকে ৪ হাজার ৪৬ কোটি টাকা বেরিয়ে গেছে, যা মূলত সরকারের ঋণ পরিশোধ এবং লভ্যাংশ দেওয়ার চাপে হয়েছে। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, বিপিসির হাতে নতুন কোনো বড় বিনিয়োগ বা উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট উদ্বৃত্ত নগদ টাকা নেই।

ঋণের গোলকধাঁধা: বিপিসির আর্থিক কাঠামোর সবচেয়ে দুর্বল দিক হলো এর বিশাল ঋণের বোঝা। অডিট রিপোর্টে দেখা যায়, সরকার থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ ২৯ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা (নন-কারেন্ট লায়াবিলিটি)। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হয়েও রাষ্ট্রের পাওনা পরিশোধে এমন দীর্ঘসূত্রতা এবং কোনো সুদ বা মুনাফার সংস্থান না রাখা আর্থিক শৃঙ্খলার অভাবকেই প্রকাশ করে। এ ছাড়া ব্যাংক থেকে নেওয়া স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ৮৪ হাজার ৩২০ কোটি টাকা। একদিকে এত বিশাল পরিমাণ ঋণ, অন্যদিকে অডিট রিপোর্টে ধরা পড়া সরকারি ৩০ কোটি ৭ লাখ টাকার বকেয়া পাওনা—সব মিলিয়ে বিপিসির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় এক নৈরাজ্য বিরাজ করছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে নগদ অর্থ বা বিনিয়োগের জন্য বিপুল অর্থ থাকা ভালো। কিন্তু বিপিসির ক্ষেত্রে তা যেন ‘অলস অর্থ’। অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, বিপিসির হাতে নগদ ও সমতুল্য নগদ আছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। এ ছাড়া স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ বা এফডিআর খাতে আছে ১৮ হাজার ২৭৯ কোটি টাকা। এ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকে অলস পড়ে আছে, যা পরিকল্পনার অভাবে বিনিয়োগ সম্ভব হচ্ছে না।

বিপিসির প্রকল্পের বেহাল দশা: নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ না করে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এমনকি গত বছরের ১৬ আগস্ট উদ্বোধনের পর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য ৩ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকার পাইপলাইন নির্মাণে ত্রুটি দেখা দিয়েছে। ফলে পাইপলাইনে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ রেখে রেল, সড়ক ও নৌপথে বেশি খরচে জ্বালানি সরবরাহ করছে। এ ছাড়া ‘ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপলাইন’ প্রকল্পে অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়ার কারণে থমকে আছে। বিপিসির পাশাপাশি সংস্থাটির নিয়ন্ত্রণাধীন পদ্মা ও মেঘনা অয়েলের উন্নয়ন প্রকল্পেরও বেহাল দশা। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ না করতে পারায় ফের তারা সময় বৃদ্ধির জন্য আবেদন করবে পরিকল্পনা কমিশনে।

বিপিসির প্রকল্পের ধীরগতি নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘তিন মাস ধরে বিপিসিতে চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দিয়েছি। ওই সময়ে কাজের অগ্রগতি যেমন ছিল, এখনো তেমনি রয়েছে। এখানে দক্ষ ও আন্তরিক জনবলের বড়ই অভাব।’

বিপিসির প্রকল্পে পদে পদে হোঁচট ও দীর্ঘসূত্রতার ব্যাপারে বাংলাদেশ প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন কালবেলাকে বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিপিসি যেসব প্রকল্প হাতে নিয়েছিল, তার অধিকাংশই রাজনৈতিক বিবেচনায়। ফলে প্রকল্পগুলোর গতি বাড়েনি, উল্টো কিছু কিছু ক্ষেত্রে অর্থের অপচয় হয়েছে। টেকনিক্যাল জনবলকে কাজ করার সুযোগ দেয়নি।’

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরে বড় জাহাজ থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল খালাসের জন্য ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং উইথ ডাবল পাইপলাইন (এসপিএম)’ নামে প্রকল্পটিও পড়ে আছে।

নতুন ফাঁদে বিপিসি: সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে এলপিজি আমদানিতে বিপিসির সক্ষমতা কম থাকায় বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। এসব কোম্পানি যখন-তখন দাম বাড়িয়ে গ্রাহকদের চাপে ফেলছে। কারণ এলপিজির মোট চাহিদার ৯৮ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে তারা। অথচ বিপিসি নিজেরা জ্বালানি আমদানি কমিয়ে দিয়ে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভরতা বাড়াতে যাচ্ছে। এভাবে বেসরকারি কোম্পানিগুলো এলপিজির বাজার নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে বিপিসি তার একক নিয়ন্ত্রণ হারাবে।

জানা গেছে, বেসরকারি কোম্পানিগুলো বিদেশ থেকে জ্বালানি সরবরাহ করে বিপিসির কাছে বিক্রি করবে। সেজন্য কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তির কাজ শুরু করেছে বিপিসি। জ্বালানি বিশেজ্ঞদের মতে, এলপিজি আমদানিতে কোম্পানিগুলো যেভাবে সিন্ডিকেট তৈরি করেছে; ঠিক একই কায়দায় ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোল আমদানির ক্ষেত্রে নতুন করে সিন্ডিকেট তৈরির পাঁয়তারা চলছে। শুরুতে কোম্পানিগুলো স্বল্প লাভে বিপিসিকে জ্বালানি দেবে। বিপিসিও ধীরে ধীরে কোম্পানিগুলোর ওপর ভরসা করতে থাকবে। এর মধ্য দিয়ে বিপিসি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়া কমিয়ে আনবে। অন্যদিকে, অধিক মুনাফা লাভের আশায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ছে অথবা জাহাজসহ বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কোম্পানিগুলো বিপিসিকে বেকায়দায় ফেলতে পারে। তখন বাধ্য হয়ে উচ্চমূল্যে কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে জ্বালানি কিনতে হবে বিপিসিকে।

বিপিসির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দেশে জ্বালানির চাহিদা বেড়েছে। এমন অবস্থায় বিপিসির পক্ষে এককভাবে জ্বালানি সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সেজন্য কোম্পানিগুলোকে আমদানি খাতে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান বলেন, ‘বিপিসির যখন জ্বালানি লাগবে, তখন কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে কিনবে।’

ঝুঁকিতে বিপিসির এফডিআর: ব্যাংকের মধ্যে রেড জোন ও ইয়েলো জোনের কাছাকাছি অবস্থায় থাকা ব্যাংকগুলোতে তিন মাস মেয়াদি এফডিআর করে বেকায়দায় পড়েছে বিপিসি। সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে রেড জোনে থাকা অগ্রণী ব্যাংকে ৮৫৬ কোটি ৭২ লাখ ৩৯ হাজার ৪৬৯ টাকা; জনতা ব্যাংকে ১ হাজার ৮২৩ কোটি ১৪ লাখ ৫৫ হাজার ৪২৬; রূপালী ব্যাংকে ১ হাজার ৭১৩ কোটি ৪৩ লাখ ৩৩ হাজার ২৬২ এবং ইয়োলো জোনে থাকা সোনালী ব্যাংকে ১ হাজার ২০২ কোটি ৬ লাখ ৩৭ হাজার ১৪৪ টাকা দীর্ঘমেয়াদি এফডিয়ার করেছে বিপিসি। সরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ বেসরকারি ব্যাংক এবি ব্যাংকে স্বল্পমেয়াদি ৪৭ কোটি ৭৮ লাখ ২৮ হাজার ৪৪৭ টাকা; বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে ২ কোটি ২৩ লাখ ৩০ হাজার ৫৩৫; ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ৫১ কোটি ১৭ লাখ ৬৪ হাজার ৯৫ এরং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ১ কোটি টাকা এফডিআর করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৬ হাজার ৯৭৩ কোটি ৫১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৩ টাকার এফডিআর ঝুঁকিতে পড়েছে।

এ বিষয়ে বিপিসির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর করা আছে বিপিসির। এরই মধ্যে কিছু ব্যাংক ঝুঁকিতে পড়েছে, ওইসব ব্যাংকে থাকা টাকা ফেরত চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে কয়েক দফা চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি।’

অডিটে বিপিসির রাজস্ব কমলেও নিট মুনাফা বাড়ার বিষয়ে রেজানুর রহমান বলেন, ‘অডিটের বিষয়টি এখনো আমার নজরে আসেনি। প্রতিবেদন এলে এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলতে পারব।’

বিপিসির এফডিআর ঝুঁকির বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন কালবেলাকে বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে এফডিআর করার দায় বিসিপিকে নিতে হবে। বিপিসির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় যারা দায়িত্বে আছেন, এর দায় তাদের নিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে এফডিআর করার পেছনে দুর্নীতি থাকতে পারে। কারণ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকের তালিকা প্রতিনিয়ত প্রকাশ পাচ্ছে। তাদের টাকা ফেরত দেওয়ার মতো সক্ষমতা নেই। তার পরেও কেন এসব ব্যাংকে বিপুল অর্থ এফডিআর করছে, তার তদন্ত হওয়া উচিত।’

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আইসিইউ নিয়ে সুখবর পাচ্ছে ১০ জেলার মানুষ, আজ থেকে চালু

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে চাকরির সুযোগ

দক্ষিণ লেবাননে ৭০টির বেশি স্থাপনায় হামলার দাবি ইসরায়েলের

গুম-নির্যাতন মামলায় শেখ হাসিনাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ আজ

আ.লীগের ৬ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার

রোববার চুক্তি সইয়ের দাবি ট্রাম্পের, ভিন্ন কথা বলছে ইরান

১৪ জুন / কী ঘটেছিল ইতিহাসের এই দিনে

যে কীর্তিতে পেলে-রোমারিওকেও ছাড়িয়ে গেলেন ভিনিসিয়াস

খেলাপ্রেমীদের জন্য চরম উত্তেজনায় কাটবে দিনটি

নিজেকে দক্ষ করে তুললে অর্থের অভাব হবে না : ভূমিমন্ত্রী

১০

২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরেই প্রথম গোলের দেখা পেল স্কটল্যান্ড

১১

রোববার রাজধানীর যেসব এলাকায় মার্কেট বন্ধ

১২

টিভি থেকে আজ মুখ ফেরাতে পারবেন না খেলাপ্রেমীরা

১৩

দুপুরের মধ্যে ব্যাপক ঝড়-বৃষ্টির শঙ্কা, নদীবন্দরেও সতর্কতা

১৪

শুরুতেই ধাক্কা, হেক্সা মিশন সফল করতে পারবে ব্রাজিল?

১৫

জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল

১৬

চাকরির ইন্টারভিউতে বেতনের প্রশ্নের উত্তর দেবেন যেভাবে

১৭

বিশ্বকাপে ৯২ বছরের রেকর্ড অক্ষুণ্ন রাখল ব্রাজিল

১৮

মাস শেষে টাকা থাকে না? মধ্যবিত্তের ৭ সাধারণ ভুল

১৯

হাইভোল্টেজ ম্যাচে ব্রাজিলকে জিততে দিল না মরক্কো

২০
X