বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৪ মে ২০২৬, ১১:৩৭ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

হামের টিকা নিয়ে সরকারের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য

হামের টিকা নিয়ে সরকারের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর রোগটি প্রতিরোধে গত ৫ এপ্রিল টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু এ পর্যন্ত কত শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে এ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেওয়া হয়েছে। এক প্রতিষ্ঠান থেকে বলা হচ্ছে ৯৫ শতাংশ, আরেক প্রতিষ্ঠান থেকে বলা হচ্ছে ৮৯ শতাংশ, অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে শতভাগ। এ ধরনের তথ্য জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছে। এদিকে, বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হাম ও হামের উপসর্গে আরও আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনতে চিকিৎসা ও টিকাদান সম্পর্কিত তথ্য সঠিক ও নির্ভুল হতে হবে। তথ্যের গরমিল রোগ নিয়ন্ত্রণে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে।

গতকাল স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ৯৮ শতাংশ শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে, বাকি ২ শতাংশ শিশুকেও টিকার আওতায় আনার চেষ্টা করছে সরকার। হাম প্রসঙ্গে গণমাধ্যমে অনেক ভুল তথ্য আসছে, সরকারের কাছে পর্যাপ্ত হামের টিকা আছে। গতকাল বুধবার (১৩ মে) সকালে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

আবার গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেছেন, ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকাদানের আওতায় আনা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে টিকাদানের ফলে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। প্রতিটি শিশুর জীবন অমূল্য এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।

একই অনুষ্ঠানে অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান জানান, এ পর্যন্ত দেশে হামের টিকাদানের হার ১০৪ শতাংশ, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি। তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা। কিন্তু এর চেয়ে বেশি শিশু এরই মধ্যে টিকা নিয়েছে।

এ ছাড়া একই দিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকে পাঠানো হামের তথ্যে বলা হয়েছে, এ পর্যন্ত হামের টিকাদানের হার শতাভাগ।

গতকাল দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ‘দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৬’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বাংলাদেশেও এর প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকার দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও অত্যন্ত স্বল্প সময়ে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন বাস্তবায়ন সরকারের শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দৃঢ় অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ক্যাম্পেইনের প্রথম পর্যায়ে গত ৫ এপ্রিল থেকে দেশের ১৮টি জেলার উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ ৩০টি উপজেলা ও ১৩টি পৌরসভায় শুরু হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশনে কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরে ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী প্রতিটি এলাকায় এই কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, হাম-রুবেলা টিকা গ্রহণের পর শরীরে রোগ প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হতে সাধারণত প্রায় তিন সপ্তাহ সময় লাগে। সে কারণে আমরা আশাবাদী যে, শিগগিরই দেশে গ্রামের সংক্রমণ কমে আসবে। আমি সব অভিভাবকের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, যেসব শিশু এখনও টিকা পায়নি, এমনকি যারা নিয়মিত ইপিআইয়ের আওতায় দুই ডোজ হাম রুবেলা টিকা পেয়েছে, তারাও যেন এই ক্যাম্পেইনের আওতায় হাম রুবেলা টিকা গ্রহণ করে।

নির্ধারিত বয়সসীমার অনেক শিশু এখনও টিকাদানের আওতার বাইরে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, হাম নির্মূল ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরই লক্ষ্যে আমরা র্যাপিড কনভেনিয়েন্স মনিটরিং (আরসিএম) অ্যাপের মাধ্যমে টিকাবঞ্চিত শিশুদের শনাক্ত করে তাদের টিকার আওতায় আনার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। দেশব্যাপী পোস্টার, লিফলেট, ইনফোগ্রাফিক, উদ্বুদ্ধমূলক ভিডিও বার্তা, টক শো এবং টেলিভিশন স্ক্রলিংয়ের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এ ছাড়াও বিশেষ সান্ধ্যকালীন টিকাদান সেশন, শুক্রবারভিত্তিক বিশেষ সেশন এবং সুবিধাবঞ্চিত ও দুর্গম এলাকার শিশুদের জন্য মোবাইল টিকাদান টিম গঠনের মাধ্যমে কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রম আরও শক্তিশালী ও টেকসই করতে সরকার বৃহৎ পরিসরে টিকা সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইউনিসেফের সহায়তায় ১০টি ভিন্ন ধরনের প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ ডোজ জীবনরক্ষাকারী টিকা সংগ্রহের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ৩ মে থেকে এ পর্যন্ত দেশে বিসিজি টিকা ২ লাখ ৭৪ হাজার ভায়াল, ওরাল পোলিও টিকা (ওপিভি) ১ লাখ ৪০ হাজার ভায়াল, হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা ৬ লাখ ৪৫ হাজার ভায়াল, আইপিভি (আইপিভি) ১ লাখ ৩৬ হাজার ৮১৬ ভায়াল, পেনটা (পেনটা) ২ লাখ ৪৫ হাজার ৪৫০ ভায়াল, টিডি (টিডি) টিকা ৩ লাখ ৫ হাজার ভায়াল। বর্তমানে টাইফয়েড ও জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধী এইচপিভি ভ্যাকসিনের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, নতুন এই সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ায় আগামীতে দেশে কোনো ধরনের টিকা সংকট থাকবে না।

অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, সরকার নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ও হাম নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। সব সরকারি হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিতে কাজ চলছে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা অবশ্যই হাম নিয়ন্ত্রণে সফল হবো এবং আমাদের শিশুদের নিরাপদ রাখতে পারব।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস. এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান, পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমী, পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান, পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশিদসহ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ইউনিসেফ ও ডব্লিউএইচওর প্রতিনিধিরা।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে হাম ও হামের উপসর্গে আরও আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে এক শিশু ও হামের উপসর্গ নিয়ে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বুধবার (১৩ মে) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকে পাঠানো হাম-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়। এই হিসাব গত মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত। এতে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১২৬ জনের। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৭ হাজার ১৫০ জন। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৯ জনে। অন্যদিকে সন্দেহজনক হাম রোগে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৬৩ জনে। এ নিয়ে হাম ও উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৪৩২ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাকেন্দ্রে গেছে ১ হাজার ৪৮৯ জন। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ১৭৩ জন। এই সময়ে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯৫৫ জন।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

এএইউবির ২০তম সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত

রাজধানীর খালগুলোর সীমানা নির্ধারণে ২ সিটির কমিটি গঠন

লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর ঘাঁটিতে হিজবুল্লাহর রকেট হামলা

মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. তোজাম্মেল হোসেনকে সংবর্ধনা

ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে হামলাকারীদের গ্রেপ্তারসহ ছয় দাবি আইএসপিএবির

প্রথম ম্যাচে ড্র করেও যারা বিশ্বজয় করেছিল: ইতিহাস যা বলে

শপিংমল-মার্কেট খোলা রাখার সময় নিয়ে গণবিজ্ঞপ্তি, অমান্য করলেই ব্যবস্থা

২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে প্রাণ গেল ৪ শিশুর, মৃত্যু বেড়ে ৬৫২

জাবি শিক্ষার্থীকে নির্যাতন : প্রধান আসামি ছাত্রলীগ নেতা গ্রেপ্তার

গ্রেপ্তারের পর নতুন করে আলোচনায় বেনজীরের সব অপকর্ম

১০

বিশ্ব রক্তদাতা দিবস আজ

১১

সৌদিতে অভিযানে এক সপ্তাহে ৮ হাজার প্রবাসী বহিষ্কার

১২

‘শিবিরের অপপ্রচার ও গুম-নাটকের’ বিরুদ্ধে জবি ছাত্রদলের বিক্ষোভ

১৩

‘নেইমারদের অপহরণ করবে এলিয়েনরা’ -ব্রাজিল ম্যাচ নিয়ে নারী গণকের অদ্ভুত ভবিষ্যদ্বাণী

১৪

সংসদে জানালেন শিক্ষামন্ত্রী / প্রাথমিকে সংগীত শিক্ষক নিয়োগে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অসম্মতি

১৫

শিল্পী সমিতির নির্বাচনে লড়ছেন চিত্রনায়িকা জলি

১৬

‘ফার্মগেট’ কেলেঙ্কারি থেকে বাঁচতে আদালতের দ্বারস্থ দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট

১৭

নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা বিজয়‌ কারাগারে

১৮

সমন্বিত উদ্যোগেই চট্টগ্রামের সংকট সমাধানের ঘোষণা নতুন সিডিএ চেয়ারম্যানের

১৯

বেনজীরকে দ্রুত দেশে আনা হবে : দুদক 

২০
X