

সরকারকে মূল্যস্ফীতি কমাতে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, বাজার তদারকি, আমদানি ব্যবস্থাপনা, জ্বালানিমূল্য এবং বিনিময় হারের স্থিতিশীলতাও একসঙ্গে সামলাতে হবে। আবার প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি, ঋণপ্রবাহ ও অবকাঠামো বাস্তবায়ন দ্রুত গতিশীল করতে হবে
ড. সেলিম রায়হান
নির্বাহী পরিচালক, সানেম
মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতির কারণে স্বস্তিতে নেই নিম্ন-মধ্যম আয়ের মানুষ। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোও জিডিপি প্রবৃদ্ধির কোনো সুখবর দিতে পারছে না। রাজস্ব আয়ের গতি আগের মতোই মন্থর; লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে ২০ শতাংশের বেশি। সরকার চলছে ব্যাংক থেকে ধার করে। খেলাপি ঋণে জর্জরিত ব্যাংকগুলো, বিনিয়োগ নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটেনি। অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর মধ্যে প্রায় সবকটিরই একই অবস্থা। খোদ অর্থমন্ত্রী অর্থনীতির এই দুরবস্থার কথা স্বীকার করে নিয়ে বলেছেন, আগামী এক বছরের বাজেট দিয়ে অর্থনীতিকে টেনে তোলা সম্ভব নয়। এ জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
অর্থনীতিকে টেনে তুলতে বা গতি সঞ্চার করতে সরকার তিন স্তরের পরিকল্পনা করেছে। স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি—এই পরিকল্পনার মাধ্যমে সরকার থ্রিআর বস্তবায়ন করার পরিকল্পনা করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম ধাপে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, দ্বিতীয় ধাপে পুনর্গঠন এবং তৃতীয় ধাপে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করা হবে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এই পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, এই বাজেট প্রণয়নে আমরা সব অংশীজনের পরামর্শ নিয়েছি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, ট্যারিফ কমিশন, বিডা, বেজা, এফবিসিসিআইসহ ব্যবসায়ী সংগঠন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্প-সেবা খাতের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে প্রাপ্ত ৬৩১টি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের ৪ হাজার ৮৯১টি প্রস্তাব গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। এই বাজেট সেই দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের ভিত্তি স্থাপন করবে, যা আমাদের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিযোগিতাসক্ষম করে তুলবে।
তবে একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে ওঠে দেশের মানুষের সৃজনশীলতা, শ্রম, দক্ষতা ও উৎপাদনশীল সক্ষমতার ওপর। এ কারণে বর্তমান সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক রূপান্তরের পথে যাত্রা শুরু করেছে, যাতে উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। এ লক্ষ্য সামনে রেখে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা অর্জন, পুনর্গঠন এবং বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির জন্য একটি মধ্যমেয়াদি কৌশলগত কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিকল্পনাটি ভালো হলেও থ্রিআর বাস্তবায়নের জন্য মৌলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তেমন কোনো উদ্যোগের কথা বাজেট আলোচনায় দেখা যায়নি। ফলে এটি কতটা বাস্তবে রূপ নেবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
গতকাল জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত দেশের ৫৫তম এই বাজেট বর্তমান সরকারের মেয়াদে অর্থমন্ত্রীর প্রথম বাজেট। প্রস্তাবিত বাজেটের মোট আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান বা বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় উৎস থেকেই অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে।
বাজেট অনুযায়ী, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
থ্রিআর ও পরিকল্পনা: প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চারের জন্য যে থ্রিআরের কথা বলা হয়েছে তার প্রথমটি হলো, রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন অর্থাৎ পুনরুদ্ধার ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতা অর্জন; দ্বিতীয়টি হলো রেস্টোরেশন বা অর্থনীতির পুনর্গঠন এবং তৃতীয়টি হলো রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসেলারেশন বা ত্বরান্বিত প্রবৃদ্ধির জন্য পুনর্গঠন।
প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার একটি নাগরিক বাজেট নামে আলাদা প্রকাশনা তৈরি করেছে। এতে বলা হয়, প্রথম ধাপে স্বল্পমেয়াদি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। আগামী এক বছরের মধ্যে অর্থনীতির অবনতির ধারা রোধ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে।
অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের অংশ হিসেবে অর্থমন্ত্রী তার বাজেটে কৃষি খাত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কুটির শিল্প, রুগ্ণ ও বন্ধ কারখানাগুলোকে সহজ শর্তে এবং পুনর্ভরণ পদ্ধতিতে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এ জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি ফান্ড তৈরি করেছে। স্টিমুলাস প্যাকেজ ২০২৬ নামের ওই প্যাকেজ থেকে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারবেন বন্ধ কারখানার মালিকরা।
এ ছাড়া আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ব্যাংক একীভূতের পাশাপাশি পুনর্গঠন কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে সরকার। এ জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন করে ৩৬ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। শেয়ার ও ইকুইটি বাবদ এ বরাদ্দ রাখা হয়।
দ্বিতীয় ধাপে সরকার মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা করেছে। সরকার বলছে, আগামী তিন বছরের মধ্যে রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, বিনিয়োগ ও বেসরকারি খাত উন্নয়ন, আর্থিক খাত পুনর্গঠন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে।
অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তব্যে বলেন, এই বাজেট প্রণয়নে আমরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, ট্যারিফ কমিশন, বিডা, বেজা, এফবিসিসিআইসহ ব্যবসায়ী সংগঠন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পসেবা খাতসহ মোট ৬৩১টি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তাদের কাছ থেকে ৪,৮৯১টি প্রস্তাব গভীরভাবে পর্যালোচনা করেছি। অংশীজন থেকে পাওয়া প্রস্তাবগুলো এবং তাদের পরামর্শের আলোকে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের বাজেট বাস্তবায়নে ৮৬ শতাংশ রাজস্ব আসে এনবিআরের মাধ্যমে। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থার মূল চ্যালেঞ্জগুলো হলো—নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত, কর অব্যাহতির বিস্তৃত সংস্কৃতি, ক্ষুদ্র করভিত্তি, কর ফাঁকি ও ডিজিটালাইজেশনের ঘাটতি। এই চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটে করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, কর অব্যাহতি ধীরে ধীরে হ্রাস করা এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় অটোমেশনের মাধ্যমে কর প্রদান পদ্ধতি সহজীকরণসহ ব্যবসাবান্ধব নীতি সংস্কারের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। এই বাজেট সেই দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের ভিত্তি স্থাপন করবে, যা আমাদের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিযোগিতাসক্ষম করে তুলবে।
আর তৃতীয় ধাপে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর, উদ্ভাবননির্ভর প্রবৃদ্ধিতে উত্তরণ, বাণিজ্য বহুমুখীকরণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করা হবে। সরকার আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাবে। এজন্য আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৬ দশমকি ৫ শতাংশ। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির ২ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করা এবং মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
যা বলছেন অর্থনীতিবিদরা: বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করছেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করতে হবে। এটার বিকল্প কিছু নেই। তবে থ্রিআর বাস্তবায়নে মৌলিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার মতো তেমন কিছু বাজেটে নেই।
তিনি বলেন, সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ওপরে ভিত্তি করে একটা প্রাক্কলন করেছে। সেটা সম্পদ আহরণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে ঋণ, রপ্তানি, আমদানি, জিডিপির প্রবৃদ্ধি—সবকিছুর জন্য গত অর্থবছরের আলোকে যে ভিত্তিটা করা হয়েছে, আমাদের বিবেচনায় সে ভিত্তিটিই কিন্তু ঠিক না। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতাকে আড়াল করে বা অতিমূল্যায়ন করে এই ভিত্তি বছরটি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে সম্পদ আহরণ, বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ, আমদানি-রপ্তানি কিংবা সার্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা শুরুতেই একধরনের কাঠামোগত দুর্বলতার মুখে পড়েছে। তাতে বাজেটের শৃঙ্খলা নষ্ট হতে পারে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হানের মতে, অর্থনীতির দুরবস্থার কথা বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেছেন। সরকারকে মূল্যস্ফীতি কমাতে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, বাজার তদারকি, আমদানি ব্যবস্থাপনা, জ্বালানিমূল্য এবং বিনিময় হারের স্থিতিশীলতাও একসঙ্গে সামলাতে হবে। আবার প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি, ঋণপ্রবাহ ও অবকাঠামো বাস্তবায়ন দ্রুত গতিশীল করতে হবে।
তিনি মনে করেন, মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করলে প্রবৃদ্ধি চাপের মুখে পড়তে পারে; আর প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে ব্যয় ও ঋণপ্রবাহ বাড়ালে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি ফিরে আসতে পারে।
সেলিম রায়হান বলেন, এমন বাস্তবতায় অর্থনীতি কতটা পুনরুদ্ধার হবে তা বলা মুশকিল। বিশেষ করে যখন মধ্যপ্রাচ্য সংকট, জ্বালানি আমদানি, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে। নীতি সমন্বয় ব্যর্থ হলে লক্ষ্যমাত্রা থেকে বিচ্যুতি ঘটার আশঙ্কা থাকবে।