

ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ চলাকালে ধারাবাহিক বিমান হামলায় দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক ব্যক্তি নিহত হন। তাদের মধ্যে সর্বপ্রথম নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্চ মাসে দাবি করেছিলেন, এই সামরিক অভিযান ইরানে ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’ ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। তবে দ্রুত নতুন নেতৃত্ব নিয়োগ এবং যুদ্ধ পরিচালনা অব্যাহত রেখে ইরান পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে। খবর জিও নিউজের।
সোমবার (১৫ জুন) ওয়াশিংটন ও ইরানের মধ্যে সংঘাত বন্ধে একটি চুক্তি ঘোষণার পর যুদ্ধে নিহত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন ইরানি নেতার সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো।
সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি
১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনে তেহরানে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে চালানো হামলায় নিহত হন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই হামলায় তার পুত্রবধূ, কন্যা এবং অন্তত এক নাতি-নাতনিও নিহত হন।
এ হামলা থেকে বেঁচে যান তার ছেলে মোজতবা খামেনি, যদিও তিনি আহত হয়েছিলেন বলে জানা যায়। পরে তিনিই নতুন সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে এখনো তিনি জনসমক্ষে উপস্থিত হননি।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, আলি খামেনির দাফন এখনো সম্পন্ন হয়নি। আগামী ৯ জুলাই তার জন্মস্থান উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে তাকে দাফন করা হবে। এর আগে তেহরানে তিন দিন এবং পবিত্র নগরী কুমে এক দিনব্যাপী জানাজার কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।
নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি
ধর্মীয় নেতা না হয়েও দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন আলি লারিজানি। খামেনির পর তার মৃত্যু ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গত ১৭ মার্চ তেহরান অঞ্চলে ইসরায়েলি হামলায় তিনি নিহত হন। ওই হামলায় তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যও প্রাণ হারান।
মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগে তিনি তেহরানে সরকারপন্থি এক সমাবেশে প্রকাশ্যে অংশ নিয়েছিলেন।
বিপ্লবী গার্ডের প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর
বিপ্লবী গার্ডের স্থলবাহিনীর সাবেক প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর ২০২৫ সালের জুনে প্রধান কমান্ডারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার পূর্বসূরি হোসেইন সালামি ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন।
বর্তমান যুদ্ধে প্রথম দিনই পাকপুর নিহত হন। পরে তার স্থলাভিষিক্ত হন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহমদ বাহিদি।
নৌবাহিনী প্রধান আলিরেজা তাংসিরি
১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞ এই কমান্ডার ২০১৮ সাল থেকে বিপ্লবী গার্ডের নৌবাহিনীর প্রধান ছিলেন। তিনি সংগঠনটির সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী ও পরিচিত মুখগুলোর একজন।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী তাকে ‘হরমুজ প্রণালিতে মাইন পেতে নৌপথ অবরোধের জন্য সরাসরি দায়ী ব্যক্তি’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
উপদেষ্টা আলি শামখানি
১৯৮০-এর দশক থেকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন আলি শামখানি। যুদ্ধের প্রথম দিন বিমান হামলায় তিনি নিহত হন।
তেহরানের তাজরিশ স্কয়ারে রাষ্ট্রীয়ভাবে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
এর আগে ইসরায়েলের জুন মাসের হামলায় তিনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন এবং প্রথমে তার মৃত্যুর খবর প্রচারিত হলেও পরে তিনি পুনরায় জনসমক্ষে আসেন।
গোয়েন্দামন্ত্রী এসমাইল খতিব
ধর্মীয় নেতা এসমাইল খতিব ১৮ মার্চ ভোরে তেহরানে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন।
২০২১ সাল থেকে গোয়েন্দামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা খতিবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিক্ষোভ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার অভিযোগ এনেছিল।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ
ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তা আজিজ নাসিরজাদেহ ২০২৪ সাল থেকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন।
যুদ্ধের প্রথম দিনই বিমান হামলায় তিনি নিহত হন।
বাসিজ বাহিনীর প্রধান গোলামরেজা সোলেইমানি
বিপ্লবী গার্ডের অধীন স্বেচ্ছাসেবী আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের প্রধান ছিলেন গোলামরেজা সোলেইমানি। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, বিক্ষোভ দমনে এই বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গত ১৭ মার্চের বিমান হামলায় তিনি নিহত হন।
বিপ্লবী গার্ডের মুখপাত্র আলি মোহাম্মদ নাইনি
মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় আলি মোহাম্মদ নাইনি নিহত হন। বিপ্লবী গার্ড এ হামলাকে ‘কাপুরুষোচিত’ বলে আখ্যা দিয়েছিল।
মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার কিছুক্ষণ আগে ফার্স সংবাদ সংস্থা তার একটি বক্তব্য প্রকাশ করে। সেখানে তিনি বলেন, যুদ্ধ চললেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে এবং এ খাতে দেশটির অর্জন ‘পূর্ণ নম্বর পাওয়ার যোগ্য’।
সামরিক দপ্তরের প্রধান মোহাম্মদ শিরাজি
যুদ্ধের প্রথম দিন নিহত হওয়া মোহাম্মদ শিরাজির দায়িত্ব ছিল সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ে বিভিন্ন নিরাপত্তা ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় করা।
সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আবদোলরহিম মুসাভি
আবদোলরহিম মুসাভি যুদ্ধের প্রথম দিন নিহত হন। ২০২৫ সালের জুনে তিনি এ পদে দায়িত্ব নেন। এর আগে তার পূর্বসূরি মোহাম্মদ বাঘেরি ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন।
সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হিসেবে মুসাভির দায়িত্ব ছিল বিপ্লবী গার্ড ও নিয়মিত সেনাবাহিনীর মধ্যে সমন্বয় সাধন করা।