

ব্রাজিল-মরক্কো। বিশ্বকাপের প্রথম হাইভোল্টেজ ম্যাচ হিসেবে গণ্য হয়ে আসছিল গ্রুপ চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই। ম্যাচের আগে শুক্রবার দুই দলের কোচ আর অধিনায়কদের কথাতেও ছিল লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি। ফুটবলবিশ্ব শনিবারের ম্যাচটিতে দেখেছে লড়াই কাকে বলে। মেটলাইফ স্টেডিয়াম ৮০ হাজার ৬৬৩ দর্শকের উপস্থিতিতে ফুল হাউসে রূপ নিয়েছিল। দানবাকৃতির বিশাল স্টেডিয়ামটির গ্যালারির ৯০ শতাংশ জায়গাই ছিল হলুদ রঙে মোড়ানো। বাকিটা লাল জার্সির দখলে। তবে ম্যাচের শুরু থেকেই ওই ১০ শতাংশ লাল জার্সি গায়ে মানুষগুলো ১ সেকেন্ডের জন্য চুপ থাকেনি। শেষমেশ পুরো ৩ পয়েন্ট প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হলেও ড্র করে খোশমেজাজেই মাঠ ছেড়েছে মরক্কানরা। বিপরীতে হেক্সা মিশনে বড় ধাক্কা নিয়ে হতাশায় অনেকটা নিঃশব্দেরই স্টেডিয়াম ছেড়েছে ব্রাজিলিয়ানরা। তবে ম্যাচ শেষে তাদের কোচ কার্লো আনচেলত্তি আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘ম্যাচের ফল অবশ্যই হতাশাজনক। তবে আমি একে ‘ধাক্কা’ না বলে আমাদের জন্য একটি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবে দেখতে চাই। এই ড্র আমাদের মনে করিয়ে দিল যে, বিশ্বমঞ্চে ট্রফি জিততে হলে প্রতিটি ম্যাচেই নিজেদের সেরাটা দিতে হবে।’ একই জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে মরক্কো কোচ মোহাম্মদ ওয়াবিহ গ্যালারির সমর্থকদের অভূতপূর্ব সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘মরক্কো এখন আর কোনো আন্ডারডগ নয়। দলটি সেমিফাইনাল পার করার মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষা রাখে এবং তারা টুর্নামেন্টে বড় কিছু করতে প্রস্তুত।’
মেটলাইফ স্টেডিয়ামের পাঁচশ সাংবাদিকের উপস্থিতিতে সংবাদ সম্মেলনটি দুই কোচ কার্লো আনচেলত্তি আর মোহাম্মদ ওয়াবিহকে মোকাবিলা করতে হয়েছে প্রশ্নের ঝড়। স্বাভাবিকভাবে আনচেলত্তির জন্য সেসব প্রশ্নের উত্তর হতাশায় মেশানো। ঠিক তার বিপরীত ছিল মোহাম্মদ ওয়াবিহের উত্তরগুলোতে। তবে দুই কোচের কথাতেই ছিল ম্যাচ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ, ছিল দুই দলের তুলনাও।
ব্রাজিলের হাইলাইন ডিফেন্স এবং মরক্কোর কাউন্টার-অ্যাটাক: আনচেলত্তি স্বীকার করে নিলেন ম্যাচের শুরু থেকেই ব্রাজিল বল পজিশন বা বলের দখল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করছিল। তার কৌশল ছিল ডিফেন্ডারদের ওপরের দিকে খেলিয়ে মরক্কোকে চেপে ধরা। কিন্তু মরক্কো এই ফাঁদটিকেই তাদের শক্তির জায়গায় রূপান্তর করে, যার ফল ওয়াবিগ পেয়ে যান ম্যাচের ২১ মিনিটেই নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল কাউন্টার অ্যাটাকটি দিয়ে। লুকাস পাকেতার ভুলে বল পেয়ে যখন ব্রাহিম দিয়াজ ব্রাজিলিয়ান সেন্টার ব্যাক গ্যাব্রিয়েল এবং মার্কিনহোসের মাঝ দিয়ে ডিফেন্স-চেরা পাস বাড়ান, তাদের রক্ষণভাগের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়ে যায়। ব্রাজিলের হাইলাইনের সুযোগ নিয়ে ইসমায়েল সাইবারি বলের নিয়ন্ত্রণ নেন এবং গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকার সময়মতো লাইন ছেড়ে বেরিয়ে না আসায় দারুণ এক চিপ শটে মরক্কোকে এগিয়ে নেন।
ব্রাজিলের ‘লেফট ফ্ল্যাংক’ নির্ভরতা ও ভিনিসিয়ুসের একক নৈপুণ্য: নেইমারের অনুপস্থিতিতে ব্রাজিলের আক্রমণের মূল ভরসা ছিল লেফট উইং বা বাঁ প্রান্ত। ম্যাচের ৩২ মিনিটে সমতাসূচক গোলটিতে আনচেলত্তির এই ট্যাকটিক্স সফল হয়। বাঁ প্রান্তে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং ব্রুনো গিমারায়েসের মধ্যে চমৎকার পাসিংয়ের পর ভিনিসিয়ুস মরক্কোর রক্ষণভাগের সামান্যতম খালি জায়গা ব্যবহার করে ভেতরে ঢোকেন। ইয়াসিন বুনোকে পরাস্ত করা তার কোনাকুনি শটটি ছিল মূলত বিশ্বমানের একক দক্ষতার উদাহরণ, যা ব্রাজিলের খাপছাড়া আক্রমণভাগকে ম্যাচে ফেরানোর পাশাপাশি ডি-বক্সের ভিনি কতটা ভয়ংকর তার প্রমাণ।
মরক্কোর ‘লো-ব্লক’ (Low-Block) ডিফেন্স ও মাঝমাঠের জটলা: ম্যাচে সমতা আসার পরপর মরক্কো অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে ‘লো-ব্লক’ বা রক্ষণাত্মক কৌশল বেছে নেয়। তারা নিজেদের অর্ধে দলগতভাবে নিচে নেমে এসে ডিফেন্সিভ দেয়াল তৈরি করেন। ব্রাজিলের আক্রমণভাগের গতি কমাতে মরক্কোর মিডফিল্ডাররা মাঝমাঠে জটলা তৈরি করে রাখছিলেন। ফলে রদ্রিগো বা ভিনিসিয়ুসরা উইং দিয়ে বল নিয়ে ভেতরে ঢুকলেও ডি-বক্সের ভেতর ফিনিশিং টাচ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জায়গা বা ফরোয়ার্ডদের খুঁজে পাচ্ছিলেন না।
সব মিলিয়ে ট্যাকটিক্যাল দিক থেকে বলা যায়, মরক্কো তাদের চেনা লড়াকু ও সুশৃঙ্খল ফুটবল খেলে সফল হয়েছে। অন্যদিকে, ব্রাজিল ভিনিসিয়ুসের নৈপুণ্যে টানা ২১টি বিশ্বকাপ উদ্বোধনী ম্যাচে অপরাজিত থাকার রেকর্ড ধরে রাখলেও আনচেলত্তির জন্য এই ম্যাচটি অনেকগুলো প্রশ্ন রেখে গেল। হাইতির বিপক্ষে পরবর্তী ম্যাচের আগে ব্রাজিলের মাঝমাঠের সৃষ্টিশীলতা এবং রক্ষণভাগের গতি নিয়ে নিশ্চিত করেই আনচেলত্তিকে নতুন করে ছক কষতে হবে।