শফিকুল ইসলাম চিন থেকে
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৫ জুন ২০২৬, ০২:১৩ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ

বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচা সংবর্ধনা

বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচা সংবর্ধনা

সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজের প্রথম বিদেশ সফরের অংশ হিসেবে বর্তমানে চীন সফরে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি গত সোমবার মালয়েশিয়া থেকে চীনের লিয়াওনিং প্রদেশের দালিয়ানে আসার পর থেকেই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। আগামীকাল শুক্রবার পর্যন্ত নির্ধারিত এ চার দিনের সরকারি সফরটি বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ সফরে প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক, কৌশলগত এবং উন্নয়ন অংশীদারত্বকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন।

প্রধানমন্ত্রীর চলমান সফরে মূলত যেসব বিষয় ও এজেন্ডা গুরুত্ব পাচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক, ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তর ইত্যাদি।

বেইজিংয়ে লালগালিচা সংবর্ধনা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল বুধবার চীনের স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় লিয়াওনিং প্রদেশের দালিয়ান থেকে হাই-স্পিড (বুলেট) ট্রেনে করে বিকেল ৫টা ৩৫ মিনিটে বেইজিং পৌঁছান। ট্রেনে বেইজিং চাউমিং রেলওয়ে স্টেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান চীনের কাস্টমস মন্ত্রী (জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমস) সান মেইজুন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান লালগালিচা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় চীনের একটি সুসজ্জিত দল গার্ড অব অনার প্রদান করে।

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, প্রধানমন্ত্রী এ সফরের সময় বেইজিংয়ে ‘দিয়াওইতই’ রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে থাকবেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন তার সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান ছাড়াও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা একেএম শামসুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান।

প্রসঙ্গত, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চার দিনের সফরে প্রথমে গত সোমবার রাতে দালিয়ান আসেন। সোমবার তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমি ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাষ্ট্রীয় সফরের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হবে আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে। বেইজিংয়ের গ্রেট হলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভ্যর্থনা জানাবেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় দালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) আয়োজিত ‘গ্রীষ্মকালীন দাভোস’-এর বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেন। চীনের দালিয়ান আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এটি অনুষ্ঠিত হয়। ১৭তম এ সম্মেলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, গিনির প্রধানমন্ত্রী আমাদু উরি বাহ, কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলঝাস বেকতেনভ, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী কিম মিন সেওক, মঙ্গোলিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিয়াম ওসর উচরাল এবং মন্টিনিগ্রোর প্রধানমন্ত্রী মিলোইকো স্পাইজিচ অংশ নেন। সম্মেলনটিতে ৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চল থেকে রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক, শিক্ষাবিদ এবং গণমাধ্যম অঙ্গনের ১ হাজার ৭০০ জনেরও অধিক প্রতিনিধি অংশ নেন। সামার দাভোসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য একদিকে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ, অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের সেরা অনুশীলন ও অভিজ্ঞতা গ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় সক্ষমতাকে আরও সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করবে।

শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক: আজ চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তারেক রহমান। চীনের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে আয়োজিত এ সফরে দুই দেশের সরকারপ্রধান পর্যায়ের বৈঠকে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে আলোচনা হবে। এরপর ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের (এনসিসি) চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। চীনের শীর্ষ আইনপ্রণেতার সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাতের কথা রয়েছে।

আগামীকাল শুক্রবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করবেন তারেক রহমান। ওই বৈঠকে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও গভীর করার বিষয়ে আলোচনা হবে।

বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি: সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ আমদানিকারক দেশ। তবে দুই দেশের মধ্যে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ সফরে বাণিজ্য ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা আরও বাড়ানোর বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একটি সম্ভাবনাময় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা অনেক দূর এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তর: বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মহল এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, এবারের সফরের অন্যতম মূল এজেন্ডা হলো চীনের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ বাংলাদেশে নিয়ে আসা। ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তি তথা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চীনের উন্নত প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিশেষ চুক্তি হতে পারে।

বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও টেক্সটাইল ইনপুটের একটি বড় অংশ চীন থেকে আসে। এ খাতে সরাসরি চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

জ্বালানি ও অবকাঠামো উন্নয়ন: ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর অধীনে বাংলাদেশে চলমান ও নতুন অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে চীনের বিনিয়োগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে একাধিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের কথা রয়েছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়া সফর শেষ করে প্রধানমন্ত্রীর এ চীন সফর দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিনিয়োগ বাস্তবায়ন, রপ্তানি বৈচিত্র্য তৈরি এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের মতো বিষয়গুলো সফলভাবে সম্পন্ন হলে এ সফর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে একটি নতুন ঐতিহাসিক উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকতেনভ। গতকাল চীনের স্থানীয় সময় সকাল সোয়া ১০টায় দাভোস সম্মেলনের সাইডলাইনে এ সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানায়, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কাজাখস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ঢাকা ও আস্তানায় স্থায়ী কূটনৈতিক মিশন স্থাপনের বিষয়ে একমত হন।

এ ছাড়া রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত বলে মত দেন তারা।

কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকতেনভ উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বৃহত্তর সম্পৃক্ততার সম্ভাবনাকে ইতিবাচকভাবে দেখেন।

বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে কাজাখস্তানে দক্ষ শ্রমিক পাঠানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো, প্রযুক্তি, কৃষি ব্যবসা এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে দুই দেশের বাণিজ্য সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।

এ ছাড়া পানি কূটনীতি নিয়ে জাতিসংঘের অধীনে একটি বিশেষায়িত সংস্থা প্রতিষ্ঠায় কাজাখস্তানের প্রস্তাবে বাংলাদেশের সমর্থন প্রত্যাশা করেন প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকতেনভ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এতে বাংলাদেশের সমর্থন রয়েছে বলে জানান। বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন উপস্থিত ছিলেন।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নাইন এম এম পিস্তল পাচ্ছেন ডিএনসি কর্মকর্তারা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সিলেটের প্রবীণ সংবাদপত্র এজেন্ট ইসমাইল হোসেন আর নেই

সীমান্তে বিএসএফের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ / কুলাউড়ায় পৌঁছেছেন এনসিপির সমন্বয়ক সারজিস ও নাসিরুদ্দিন পাটওয়ারী

‘হায় হোসেন’ মাতমে মুখর পুরান ঢাকা

বিকেএসপিতে পাঁচ ক্রীড়া বিভাগের কোচেস সার্টিফিকেট কোর্সের সফল সমাপ্তি

সিলেট মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের দ্বি-বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধন

ন্যায্য অধিকার না দিলে লড়াই করার হুঁশিয়ারি জামায়াত আমিরের

শিক্ষার্থীকে শাসন করায় শিক্ষিকাকে মারধর: থানায় মামলা

জিনপিং-তারেক বৈঠক / চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ১৭ সমঝোতায় স্বাক্ষর

২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশে যেসব দলের লাইন-আপ চূড়ান্ত

১০

কাঁচাবাজারে অস্থিরতা, মাছ-মুরগির চড়া দাম

১১

নতুন অস্ত্রের পরীক্ষা চালাল উত্তর কোরিয়া

১২

লক্ষ্মীপুরে মা-তিন মেয়েকে হত্যা: ‘বাঁচাও বাঁচাও’ চিৎকার শুনে ছুটে যান প্রতিবেশী

১৩

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে বহু হতাহতে প্রধানমন্ত্রীর শোক

১৪

দেশের ৬ জেলায় সন্ধ্যার মধ্যে ঝড়সহ বজ্রবৃষ্টির আশঙ্কা

১৫

বিশ্বকাপে নকআউটের টিকিট কাটল যারা, বাদ পড়ল কারা

১৬

সামান্য ভুলেই বাতিল হতে পারে ভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসার আবেদন

১৭

ধর্ম নিয়ে ব্যবসা নয়, সম্প্রীতির বাংলাদেশ চাই: সংসদে ফজলুর রহমান

১৮

পূর্ব শত্রুতার জেরে গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যা

১৯

‘হৃদপিণ্ড ধুকধুক করে কাঁপছিল’

২০
X