

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর গল্পগুলোর একটি। পর্তুগিজ এই মহাতারকা অনেকদিক থেকেই শুধু একজন ফুটবলার বা একজন মানুষ হয়ে থাকার সীমা অতিক্রম করেছেন।
তিনি এখন একটি ব্র্যান্ড, আর তার চেয়েও বড় কথা—তিনি কোটি কোটি ভক্তের কাছে একটি প্রতীক। তিনি যা-ই করুন, পৃথিবীর যেখানেই যান না কেন, অসংখ্য সমর্থক তাকে অনুসরণ করে, তাকে সমর্থন জানায়। ফুটবলপ্রেমীদের যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তাদের মতে সর্বকালের সেরা (GOAT) কে, তাহলে দশজনের মধ্যে নয়জনই হয়তো লিওনেল মেসির নাম বলবেন। কিন্তু মজার বিষয় হলো, একটু গভীরে কথা বললে দেখা যায়—তাদের অনেকেই বিশ্বাস করেন, মেসি হয়তো আরও ভালো খেলোয়াড়; তবু ব্যক্তিগতভাবে তাদের প্রিয় রোনালদো। কেন এমন হয়? এই প্রশ্নের সদুত্তর দিতে গেলে হাজার বিশেষণের অবতারণা করতে হবে। আমরা সে পথে না হেঁটে তার এই বয়সের ফুটবল খেলা দেখতে বলি। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ জেতার পর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো জানিয়েছেন, জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে এই মুহূর্তে বিষয়টিকে তিনি মোটেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন না। ৪১ বছর বয়সী রোনালদো বৃহস্পতিবার টরন্টোতে অনুষ্ঠিত ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে সমতাসূচক গোল করে পর্তুগালকে ২-১ ব্যবধানে জয় এনে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এই জয়ের ফলে পর্তুগাল নিশ্চিত করেছে শেষ ষোলোর টিকিট। ম্যাচ শেষে পর্তুগালের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে তার অবসরের গুঞ্জন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে স্পোর্ট টিভিকে রোনালদো বলেন, ‘ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন ভাবার সময় নয়। আমরা জিতি বা হারি, এরপর এ বিষয়ে কথা বলব। পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করব, তারপর সিদ্ধান্ত নেব। এখন আর হঠাৎ করে কোনো সিদ্ধান্ত নেই না। সবকিছু শান্তভাবে এবং ভেবেচিন্তে করি। আপাতত আজকের মুহূর্তটা উপভোগ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ ২০০৩ সালে পর্তুগালের হয়ে অভিষেকের পর থেকে এখন পর্যন্ত ২৩২টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ১৪৬ গোল করেছেন রোনালদো, যা পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। এবার নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে খেলছেন রোনালদো। ক্যারিয়ারের একমাত্র অধরা বড় শিরোপা বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়েই মাঠে নেমেছেন তিনি। তার মতে, বড় সাফল্য অর্জন করতে হলে কঠিন সময় পার করার মানসিকতা থাকতে হবে।
ম্যাচের ৮১তম মিনিটে বদলি হওয়ার পর বেঞ্চে বসে উদ্বেগ নিয়ে শেষ সময়ের নাটকীয়তা দেখেন রোনালদো। যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় গনজালো রামোস জয়সূচক গোল করেন। এরপর ক্রোয়েশিয়া একটি গোল করলেও অফসাইডের কারণে সেটি বাতিল হয়ে যায়। ম্যাচ নিয়ে রোনালদো বলেন, ‘ফুটবল এমনই। এত বড় একটি প্রতিযোগিতা জিততে হলে কষ্ট সহ্য করতে শিখতে হবে। দর্শকদের জন্য এটি ছিল দারুণ রোমাঞ্চকর ম্যাচ। প্রথমার্ধে আমরা ভালোভাবেই খেলা নিয়ন্ত্রণ করেছি। দ্বিতীয়ার্ধ কিছুটা অগোছালো ছিল। কিছু সমস্যায় পড়েছি, তবে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে এমনটা হবেই। সামনে এগিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
অন্যদিকে, এসি মিলানের ফরোয়ার্ড গনসালো রামোস ৬৩তম মিনিটে মাঠে নেমে রোনালদো বদলি হওয়ার পর পর্তুগালের আক্রমণের নেতৃত্ব নেন। যোগ করা সময়ে দুই ক্রোয়েশিয়ান ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে দুর্দান্ত হেডে জয়সূচক গোল করেন তিনি। ম্যাচ শেষে রামোস বলেন, ‘রোনালদো আমাকে বলেছিলেন, আমি নেমে দলকে সাহায্য করব। বিরতির সময় আমি সতীর্থদেরও বলেছিলাম, চিন্তা করো না—আমি যদি মাঠে নামি, গোল করব। আমি জানি, এমন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আমি নিজেকে সেরাভাবে তুলে ধরতে পারি, ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারি এবং ফল নির্ধারণ করতে পারি। আমি সেই লক্ষ্যেই নিজের সব মনোযোগ ও শক্তি কাজে লাগাই। ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়াই আমার কাজ।’ শেষ ষোলোতে পর্তুগালের প্রতিপক্ষ প্রতিবেশী স্পেন। আগামী সোমবার টেক্সাসের ডালাসে মুখোমুখি হবে দুই দল। গত গ্রীষ্মে উয়েফা নেশনস লিগের ফাইনালে ২-২ ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে স্পেনকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল পর্তুগাল। স্পেনকে নিয়ে রোনালদো বলেন, ‘স্পেন বিশ্বকাপ জয়ের মতোই শক্তিশালী একটি দল। সামনে কঠিন একটি ম্যাচ অপেক্ষা করছে, যেমন এখন থেকে প্রতিটি ম্যাচই কঠিন হবে। আমরা তাদের খুব ভালো করেই চিনি এবং সে অনুযায়ী প্রস্তুত থাকব।’