

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে আলোচিত প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন নিয়ে আবারও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। নিজেদের নিয়োগ দেওয়া চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দিলেও প্রায় এক মাসে হতে চললেও নতুন পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠনের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই দীর্ঘসূত্রতায় দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
এদিকে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন, প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া এবং ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠাসহ সাত দফা দাবিতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’। দাবি পূরণ না হলে আগামী ১৮ জুলাই রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় মহাসমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।
বোর্ড গঠনের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছে।
তিনি বলেন, এত বড় একটি ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য বোর্ড অপরিহার্য। তবে এমন কোনো ব্যক্তি বা পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হোক, যাদের নিয়ে নতুন করে বিতর্ক বা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়—সেটি বাংলাদেশ ব্যাংক চায় না। তাই একটি যোগ্য, দক্ষ এবং তুলনামূলকভাবে বিতর্কমুক্ত বোর্ড গঠনের লক্ষ্যে কিছুটা সময় নেওয়া হচ্ছে।
আরিফ হোসেন খান আরও বলেন, দেশের অন্যান্য ব্যাংকেও সময়ে সময়ে পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আসে। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার বিষয়টি যুক্ত থাকায় বিষয়টি ভিন্নভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
গ্রাহক ও বিভিন্ন সংগঠনকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এমন কোনো কর্মসূচি দেওয়া উচিত নয়, যাতে সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। কারণ এতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে আমানত উত্তোলন বেড়ে গেলে ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনও বোর্ড গঠনের বিষয়ে নিজের অজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। কালবেলাকে তিনি বলেন, আমাকে আপাতত একটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমি শুধু সে দায়িত্বই পালন করছি। বোর্ড গঠন বা এ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। এসব বিষয়ে আমাদের মুখপাত্র কথা বলেছেন।
দায়িত্ব থেকে কবে অব্যাহতি পেতে পারেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি নিজেও জানি না এই দায়িত্ব থেকে কবে মুক্তি পাব। আপাতত আমাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটিই পালন করছি।
আন্দোলন জোরদারের সিদ্ধান্ত: সোমবার ইসলামী ব্যাংকের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গ্রাহক ফোরামের আহ্বায়ক অধ্যাপক নুরনবী মানিক বলেন, পূর্বে ঘোষিত সাত দফা দাবির বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। তাই আন্দোলন আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তার ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ৯ জুলাই ইসলামী ব্যাংক টাওয়ার থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাব পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল হবে। ১৪ জুলাই দেশের প্রতিটি জেলা শহরে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান শাখার সামনে দুই ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচি পালিত হবে। এর পরও যদি পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন না হয়, তাহলে ১৮ জুলাই শাহবাগে সারা দেশের গ্রাহকদের অংশগ্রহণে জাতীয় মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। ওই সমাবেশ থেকেই পরবর্তী কর্মসূচিও ঘোষণা করা হবে।
কালবেলাকে অধ্যাপক নুরনবী মানিক বলেন, তাদের আন্দোলনের লক্ষ্য কোনো ব্যক্তি নয়; বরং একটি স্বচ্ছ, দক্ষ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিচালনা পর্ষদ নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, নতুন পরিচালনা পর্ষদে সৎ, যোগ্য, নিরপেক্ষ এবং ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিগত সরকারের সুবিধাভোগী কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে—এমন কাউকে বোর্ডে রাখা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি আমাদের নেই।
বর্তমানে দায়িত্বপ্রাপ্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন সম্পর্কে তাদের কোনো আপত্তি নেই বলেও জানান তিনি। তার ভাষায়, তিনি অস্থায়ী দায়িত্ব পালন করছেন। তার মাধ্যমেই দ্রুত একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য পরিচালনা পর্ষদ গঠন হবে বলে আমরা আশাবাদী।
‘ইসলামী ব্যাংকের সংকট গোটা অর্থনীতিতে পড়তে পারে’: এক মাসেও ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড গঠন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি ব্যাংকের সংকট নয়; এর প্রভাব গোটা অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ বেসরকারি ব্যাংক। এক সময় বিশ্বের আর্থিকভাবে শক্তিশালী এক হাজার ব্যাংকের তালিকায় বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধিত্বকারী ব্যাংক ছিল এটি। দেশে আসা মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৩০ শতাংশও এই ব্যাংকের মাধ্যমে আসে।’
অধ্যাপক শহিদুল ইসলামের মতে, বিগত সরকারের সময় ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের পর অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করেছিল। এরপর ব্যাংকটি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। তারল্য, আমানত, রেমিট্যান্সসহ বিভিন্ন সূচকে উন্নতি আসে এবং গ্রাহকদের আস্থাও ফিরতে শুরু করে। কিন্তু নতুন করে পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় সেই অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আমানতকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। তারা আমানত তুলে নিতে শুরু করলে তারল্য সংকট দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবাহও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, পুরো দেশের অর্থনীতির ওপর পড়তে পারে।
একই সঙ্গে আন্দোলনরত গ্রাহকদের সংযত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংককে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, একটি পেশাদার আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করাই দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে ভালো হবে।