

বার্সেলোনার এক ড্রেসিংরুমে প্লাস্টিকের গামলায় জলভরা এক শিশুকে কোলে নিয়েছিলেন আনকোরা এক তরুণ ফুটবলার। লাজুক ভঙ্গিতে আনাড়ি হাতে গোসল করানো শিশু লামিনে ইয়ামাল মেসির উত্তরসূরি—বার্সেলোনার আইকনিক ১০ নাম্বার জার্সির ধারক। সেই ইয়ামালে উজ্জীবিত স্পেনই মেসিদের বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখার মিশনে সবচেয়ে বড় বাধা।ইউনিসেফের দাতব্য ক্যালেন্ডারের সেই ছবিতে বিশ বছরের লিওনেল মেসির কোলের সেই পাঁচ মাসের শিশু লামিনে ইয়ামাল এখন কিশোর পেরিয়ে যৌবনে পা দিয়েছেন। মাতারোর রোকা ফন্দা পাড়ার এক র্যাফেল ড্র জিতে বার্সার সেই ড্রেসিংরুমে পৌঁছেছিল ইয়ামালের পরিবার। আলোকচিত্রী হুয়ান মনফোর্তের ভাষায়, ‘মেসি সেদিন এতটাই সংকোচবোধ করছিলেন যে, শিশুটিকে কীভাবে ধরবেন, তা-ই বুঝে উঠতে পারছিলেন না।’ সময় হয়তো নীরবে হাসছিল—কারণ সে জানত, নিয়তির খাতায় লেখা হয়ে গেছে অন্য কিছু। সেই দুই চরিত্রই মুখোমুখি, তবে গামলা নয়—তাদের সামনে বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে জ্বলজ্বলে মুকুট। নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন স্পেন। অথচ এই লড়াই দেখার কথা ছিল আরও আগেই। ইউরোপ-লাতিন আমেরিকা চ্যাম্পিয়নদের নিয়ে আয়োজিত ফিনালেসিমা এবারের মার্চে কাতারে হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির পরিস্থিতিতে ভেস্তে যায় সে আয়োজন। ভেন্যু আর তারিখ নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয় উয়েফা-কনমেবল, যে লড়াই দেখার জন্য ফুটবলপ্রেমীরা হাহাকার করেছিলেন, ভাগ্য যেন সেটাকেই আরও বড় মঞ্চে, আরও ভারী মুকুটের লোভ দেখিয়ে সাজিয়ে রাখল।
পরিসংখ্যানের পাতা উল্টালে বোঝা যায়, দুই দলই এসেছে ভিন্ন দুই পথ ধরে। স্পেন যেন এক নিরাবেগ যন্ত্র—ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালের আগ পর্যন্ত সাত ম্যাচের কোনোটিতেই পিছিয়ে পড়েনি তারা। মিকেল ওয়ারজাবাল পেনাল্টি থেকে আর পেদ্রো পারো দুর্দান্ত এক গোলে ফ্রান্সকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে ২০১০ সালের পর প্রথমবার ফাইনালে তোলে লা রোজাদের। ওয়ারজাবালের সেই গোল ছিল তার এই আসরে পঞ্চম, স্পেনের হয়ে ৬০ ম্যাচে ৩০তম আন্তর্জাতিক গোল। ১৯ বছর বয়সী ইয়ামাল যেন এই আসরের বিস্ময়—ফ্রান্স ম্যাচে পেনাল্টি আদায় করে নিজের বয়সেই ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন তিনি। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার পথ যেন রোমাঞ্চের এক ধারাবাহিক উপন্যাস। চার নকআউট ম্যাচেই পিছিয়ে পড়েছে তারা, প্রতিবারই ফিরেছে জয় নিয়ে—কেপ ভার্দে, মিশর, সুইজারল্যান্ড, ইংল্যান্ড—প্রতিটি প্রতিপক্ষকে ধৈর্যের পরীক্ষায় হারিয়েছে মেসির দল। এই বিশ্বকাপে ৭৫ মিনিটের পর পিছিয়ে থেকে দশ গোল করা দলটার নাম একমাত্র আর্জেন্টিনা। মেসি নিজে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে লড়ছেন এমবাপ্পের সঙ্গে, আর গড়ে তুলেছেন বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার নতুন রেকর্ড। সংখ্যার আড়ালে যে গল্পটা সবচেয়ে বেশি মন কাড়ছে, সেটা প্রজন্মান্তরের। যে হাত একদিন কাঁপা কাঁপা ভঙ্গিতে শিশু ইয়ামালকে জল থেকে তুলে এনেছিল, সেই হাতই রোববার প্রতিরোধ গড়বে তার বিরুদ্ধে। মেসি নিজেই একসময় বলেছিলেন, নতুন প্রজন্মের মধ্যে ইয়ামালকেই তিনি সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মনে করেন। বৃত্তটা যেন এভাবেই সম্পূর্ণ হয়—লা মাসিয়ার সেই একই আঙিনা থেকে উঠে আসা দুই কিংবদন্তি, দুই প্রজন্মের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে একে অপরের মুখোমুখি।
ফুটবল ইতিহাস খুব কম সময়ই এমন কাব্যিক কাকতাল উপহার দেয়। রোববার মেটলাইফের সবুজ গালিচায় যখন বাঁশি বাজবে, তখন শুধু দুটি দেশের লড়াই হবে না, হবে অতীত আর বর্তমানের এক নিঃশব্দ কোলাকুলি, যেখানে একজনের সূর্যাস্তের আলোয় জ্বলে উঠছে আরেকজনের সূর্যোদয়।