

ব্যবসা প্রায় স্থবির, আর্থিক ভিত্তিও দুর্বল। মূল্য সংবেদনশীল কোনো তথ্যও নেই। তারপরও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কোম্পানি ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স পিএলসির শেয়ারের দাম ছয় মাসে ৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকায় পৌঁছেছে। এই অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির পেছনে অন্তত তিনটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের পরিকল্পিত কারসাজির প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) গঠিত তদন্ত কমিটি।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, শেয়ার কারসাজিতে জড়িতরা তদন্তকালেই ১ কোটি টাকার বেশি নগদ (রিয়েলাইজড) মুনাফা তুলে নেয়। একই সময়ে তাদের হাতে আট কোটি টাকার বেশি আনরিয়েলাইজড মুনাফা ছিল। এ প্রেক্ষাপটে গত ২১ মে থেকে তদন্ত শুরু করে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জও (ডিএসই)। ডিএসইর একটি সূত্র জানিয়েছে, ওই তদন্ত এখনো চলমান। বিএসইসির তদন্তে ২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত সময় পর্যালোচনা করা হয়। ওই সময়ে ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের শেয়ারের দাম ৩৫ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে ৮৫ টাকা ১০ পয়সায় ওঠে, অর্থাৎ প্রায় ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। তদন্তে কোম্পানির ব্যবসায়িক অগ্রগতি, আর্থিক উন্নতি কিংবা কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য পাওয়া যায়নি, যা এই দর বৃদ্ধির যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারে। বরং একাধিক বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব ব্যবহার করে সমন্বিত লেনদেনের মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি করে দর বাড়ানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তদন্তে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে ছিল ওমেগা ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেড এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মো. মাশরুর আলম। নিজেদের ও প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক বিও হিসাব ব্যবহার করে তারা কোম্পানির মোট ১১ দশমিক ৭৪ শতাংশ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি করে এই চক্র প্রায় ১৮ লাখ টাকা রিয়েলাইজড এবং ৮১ লাখ টাকার বেশি আনরিয়েলাইজড মুনাফা অর্জন করে। দ্বিতীয় সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে ছিলেন মাকসুদ রেজা, মাকসুদা আহমেদ এবং তাদের দুই ছেলে শাহ মো. জামিউর রহমান ও শাহ মো. সামিউর রহমান। তদন্তে দেখা গেছে, তারা সাতটি ব্রোকারেজ হাউসের একাধিক হিসাব ব্যবহার করে ধারাবাহিক (সিরিজ) লেনদেনের মাধ্যমে শেয়ারের দাম বাড়ান। নিজেদের নিয়ন্ত্রিত হিসাবের মধ্যে ৩৩টি লেনদেনের মাধ্যমে ১ লাখ ১১ হাজার ৮৪১টি শেয়ার হাতবদল করা হয়, যা পুঁজিবাজারে ‘সার্কুলার ট্রেডিং’ নামে পরিচিত। এভাবে তারা প্রায় ৪২ লাখ টাকা মুনাফা করেন।
তৃতীয় সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে ছিলেন মরিয়ম আক্তার মিতু। তার সঙ্গে ছিলেন মো. খোরশেদ আলম (মিঠু), মোহাম্মদ আবুল হোসেন হাসান, আফরোজা আক্তার ও মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম। তদন্তে বলা হয়েছে, তারাও নিজেদের নিয়ন্ত্রিত হিসাবের মধ্যে ২৮টি লেনদেনের মাধ্যমে শেয়ার হাতবদল করে কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি করেন, যা শেয়ারটির দাম বাড়াতে ভূমিকা রাখে এবং তারা বড় অঙ্কের মুনাফা করেন। তদন্তে কোম্পানির উদ্যোক্তা বা পরিচালকদের বিরুদ্ধে ‘ইনসাইডার ট্রেডিং’ কিংবা এই কারসাজিতে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তদন্ত কমিটির মতে, কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউসের কিছু গ্রাহক ও ট্রেডারের সমন্বিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই পুরো কারসাজি সংঘটিত হয়েছে। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর একাধিক ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে ওমেগা ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেড, মাকসুদা রেজা ও মরিয়ম আক্তার মিতুর নেতৃত্বাধীন মোট ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের শেয়ারে কারসাজির ঘটনায় বিএসইসির তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানতে কমিশনের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ আবুল কালামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। গত সোমবার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তার জবাবে তিনি পরদিন বিষয়টি জানাবেন বলে জানান। এরপর একাধিকবার ফোন ও বার্তা পাঠানো হলেও গতকাল শনিবার পর্যন্ত তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএসইসির এক কর্তকর্তা কালবেলাকে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশের আলোকে বিএসইসি শিগগির শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে। ডিএসইতে ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স পিএলসির শেয়ার লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রথম তদন্তের পরও শেয়ারটির দাম বাড়তে থাকে। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ জুন শেয়ারটির দাম ছিল ১৪৬ টাকা ৩০ পয়সা। ৯ জুলাই তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭০ টাকা ৬০ পয়সায়। অর্থাৎ কয়েকটি কার্যদিবসেই দাম বেড়ে যায় ১৬ দশমিক ৬১ শতাংশ। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার শেয়ারটি লেনদেন হয় ১৬৫ টাকা ৬০ পয়সায়। ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের কোম্পানি সেক্রেটারি মো. মনির হোসেন কালবেলাকে বলেন, শেয়ারের দর বৃদ্ধির পেছনে কোম্পানির এমন কোনো অপ্রকাশিত বা মূল্যসংবেদনশীল তথ্য নেই, যা বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত বা বাজার দরকে প্রভাবিত করতে পারে। তিনি জানান, গত ২১ জুন শেয়ারের দর বৃদ্ধির কারণ জানতে চেয়ে ডিএসই চিঠি দেয়। এর জবাবে কোম্পানি জানায়, ব্যবসায়িক কার্যক্রম বা আর্থিক অবস্থানে এমন কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেনি, যা শেয়ারের দরে এই উল্লম্ফনের কারণ হতে পারে। ১৩ জুলাই একই বিষয়ে আবারও ব্যাখ্যা চেয়েছে ডিএসই। এবারও কোম্পানি একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স। আলোচ্য বছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) হয়েছে ১৬ পয়সা, যা আগের বছরে ছিল ২১ পয়সা। ৩০ জুন ২০২৫ শেষে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ১২ টাকা ৯০ পয়সা। আগের অর্থবছরে কোম্পানিটি ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল। বর্তমানে এটি 'বি' ক্যাটাগরিভুক্ত কোম্পানি।
২০০৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের অনুমোদিত মূলধন ২০০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৪৯ কোটি ৯১ লাখ ২০ হাজার টাকা। মোট শেয়ারের ৪১ দশমিক ৪০ শতাংশ উদ্যোক্তা-পরিচালকদের, ৩৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের, শূন্য দশমিক ০৭ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এবং অবশিষ্ট ২২ দশমিক ০৪ শতাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে।