

বিশ্বকাপ মানেই বড় দলের আধিপত্য, তারকাদের ঝলক আর শিরোপার লড়াই। কিন্তু চলতি বিশ্বকাপ সেই চেনা গল্পকে বদলে দিয়েছে। উত্তর আমেরিকার মাটিতে অনুষ্ঠিত এই আসর থেকে কয়েকটি পরাশক্তি বিদায় নিয়েছে প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই। তথাকথিত ছোট দলগুলো সাহস ও লড়াকু মানসিকতা দিয়ে ছড়িয়েছে বিস্ময়। আসরের শুরু থেকে নকআউট পর্ব পর্যন্ত কিছু অঘটন বিশ্বকাপ উত্তেজনাকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছিল। সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে দ্বিতীয় রাউন্ডে। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি ছিল অন্যতম ফেভারিট। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে মাঠের লড়াইয়ে সেই হিসাব মেলাতে পারেনি জুলিয়ান নাগেলসম্যানের দল। ১২০ মিনিটের যুদ্ধ শেষে ১-১ সমতার ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে স্নায়ুচাপের পরীক্ষায় সফল হয় প্যারাগুয়ে। ৪-৩ ব্যবধানে জিতে তারা বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করে দেয় ইউরোপের অন্যতম সফল দলকে। ওটা ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসে জার্মানির প্রথম টাইব্রেকার হার। একই দিনে আরেক ইউরোপীয় শক্তি নেদারল্যান্ডসের স্বপ্ন ভেঙে দেয় মরক্কো। পিছিয়ে থাকা অবস্থা থেকে নির্ধারিত সময়ের শেষ মুহূর্তে গোল করে ম্যাচে ফিরে আসে আফ্রিকার দলটি। পরে টাইব্রেকারে গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনুর অসাধারণ নৈপুণ্যে ৩-২ ব্যবধানে জিতে শেষ ষোলোয় পৌঁছে যায় মরক্কো। ২০২২ বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল খেলা দলটি যে আর ‘ডার্ক হর্স’ ছিল না—সেই বার্তাই আবারও দিয়েছে দলটি।
নকআউট পর্বের সবচেয়ে আলোচিত গল্পের নাম নরওয়ে। আর্লিং হলান্ডের নেতৃত্বে দলটি প্রথমে আইভরি কোস্টকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় ওঠে। পরে মুখোমুখি হয় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের। অধিকাংশ বিশ্লেষক ব্রাজিলকেই সম্ভাব্য জয়ী হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু নরওয়ে দুর্দান্ত ফুটবল খেলে ২-১ গোলের অবিশ্বাস্য জয় তুলে নেয়। শিরোপার অন্যতম দাবিদার সেলেসাওদের বিদায়ে বিশ্বকাপের শক্তির ভারসাম্যই বদলে যায়।
অঘটনের তালিকায় ছিল মিশরও। দ্বিতীয় রাউন্ডে অস্ট্রেলিয়াকে টাইব্রেকারে হারিয়ে তারা শেষ ষোলোয় পৌঁছেছিল। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে একসময় ২-০ গোলে লিড নেয় আফ্রিকার দলটি। যদিও শেষ পর্যন্ত লিওনেল মেসিদের কাছে ৩-২ ব্যবধানে হার মানতে হয়, তবুও বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে তাদের লড়াই আলোচনার জন্ম দেয়। আরেকটি অনুপ্রেরণার গল্প লিখেছে কেপ ভার্দে। জনসংখ্যা ও ফুটবল ঐতিহ্যের দিক থেকে বিশ্বকাপের সবচেয়ে ছোট দেশগুলোর একটি হয়েও গ্ৰুপ পর্বে স্পেন, উরুগুয়ের মতো জায়ান্টদের সাথে ড্র করে তারা মুখোমুখি হয় বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার। দ্বিতীয় রাউন্ডের এই লড়াইকে অসম ভাবা হচ্ছিল। কিক-অফের পর সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দ্বীপ দেশটি। ম্যাচে তারা এমন লড়াই করে, যা বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়ায়। শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে হারলেও কেপ ভার্দে দেখিয়ে দেয় যে ফুটবলে সাহস ও পরিকল্পনা থাকলে যে কোনো প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলা সম্ভব। হতাশার তালিকাও ছিল বড়। জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও ব্রাজিলের মতো পরাশক্তিরা কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই বিদায় নেয়। পর্তুগালও শেষ ষোলোতে স্পেনের কাছে হেরে ফিরতি বিমান ধরেছিল। বিশ্বকাপ শুরুর আগে যাদের অনেকেই সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন ভাবছিলেন, সেই দলগুলোর দ্রুত বিদায় ফুটবল বিশ্বকে বিস্মিত করেছে। আয়োজক দেশগুলোর অবস্থাও খুব সুখকর ছিল না। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো নকআউট পর্বে উঠলেও শেষ পর্যন্ত কেউই কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছাতে পারেনি। ঘরের মাঠের সমর্থনও তাদের বড় সাফল্য এনে দিতে ব্যর্থ হয়। সব মিলিয়ে ফুটবলে এখন আর বড়-ছোট বলে পার্থক্য আগের মতো নেই। উন্নত কোচিং, কৌশলগত পরিকল্পনা ও আত্মবিশ্বাসের কারণে অপেক্ষাকৃত ছোট দলগুলোও এখন বিশ্বসেরাদের ঘাম ঝরানোর ক্ষমতা রাখে। প্যারাগুয়ে, মরক্কো, নরওয়ে, মিশর ও কেপ ভার্দের গল্পগুলো সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। তাই ইতিহাসে এবারের বিশ্বকাপ শুধু চ্যাম্পিয়নের জন্য নয়, একের পর এক অবিশ্বাস্য অঘটনের জন্যও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।