

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন উপলক্ষে আইন (সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ) সংশোধনে সরকারের কাছে পাঠাতে সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এতে ঋণখেলাপি ও তার গ্যারান্টারদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সার্বক্ষণিক দায়িত্বে থাকা শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য করার বিধান যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) অভিযোগপত্রভুক্ত ব্যক্তি এবং দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার বিধান সংযোজনের সুপারিশ করবে ইসি।
গতকাল মঙ্গলবার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে কমিশনের ১২তম সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে বেলা ১১টায় সভা শুরু হয়ে দুপুর ২টায় এক ঘণ্টার মুলতবি করে বিকেল সাড়ে ৫টার পরে শেষ হয়। সভায় ২০০৯ সালে করা স্থানীয় সরকারের পাঁচটি আইন তথা সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ আইনের পর্যালোচনা করা হয়।
এ বিষয়ে আখতার আহমেদ বলেন, আইনগুলোতে কমিশনের বিবেচনায় যে সব জায়গায় সংশোধন করা দরকার, আমরা সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। সবগুলো আইনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনী যুক্ত করার সুপারিশ করেছি। তিনি বলেন, আমরা মনে করি যে, সবগুলো আইনে এটা (সশস্ত্র বাহিনী) যুক্ত করা উচিত।
বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সার্বক্ষণিক কর্মরত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা জাতীয় নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিষয়টি নিয়ে আলোচনাও হয়েছিল। এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এ সুযোগ বাতিলের সুপারিশ সরকারের কাছে করতে যাচ্ছে ইসি। আখতার আহমেদ বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা যে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন কি পারবেন না—এ বিষেয়ে কমিশন মনে করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা যেন নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য হয়। ঋণখেলাপির বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে দুটি ক্ষেত্র একটি হচ্ছে বন্ধকদাতা এবং জামিনদার। ব্যক্তিগতভাবে বন্ধকদাতা তিনি তো আছেনই, কিন্তু জামিনদারদেরও ঋণখেলাপি হিসেবে অযোগ্য করার একটা প্রস্তাবনায় আমরা নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছি। এর পাশাপাশি বিলখেলাপি— বিদ্যুৎ বিল, ভূমি কর, ওয়াসা—এ ধরনের সেবা প্রদানকারী সংস্থায় যদি কোনো বিল খেলাপি থাকে, সেটা ব্যক্তিগত হতে পারে বা প্রাতিষ্ঠানিক হতে পারে। এটা অযোগ্যতা হিসেবে আসবে। লাভজনক পদে থেকে নির্বাচন করা যাবে না।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) চার্জশিটভুক্ত ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসকদের পদে থেকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাব করবে ইসি। দ্বৈত নাগরিকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাব করবে ইসি।
বিষয়টি নিয়ে সচিব বলেন, কমিশন মনে করে, তাদেরও নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই, এ বিষয়ে সংবিধানে বাধা আছে (জাতীয় নির্বাচনের কথা বলা আছে সংবিধানে)। পাশাপাশি আচরণ বিধিমালাগুলো সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, আইন সংশোধনের বিষয়গুলো আমরা এখন স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রস্তাব পাঠাব, তারা উপযুক্ত মনে করলে ব্যবস্থা নেবেন। এ প্রস্তাব স্থানীয় সরকার বিভাগে দ্রুতই পাঠানো হবে বলে জানান ইসি সচিব।
এক প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, আমরা চূড়ান্ত (আইন) করার এখতিয়ার রাখি না, আমরা আইনের কিছু প্রস্তাবনা বা সুপারিশ করছি। চূড়ান্ত করার দায়িত্ব তো স্থানীয় সরকার বিভাগ বা সংসদের। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তপশিল কবে হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শিডিউল চূড়ান্ত হলে জানাব।
আইন সংশোধনীর কারণে ভোট পেছাবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা তো আমি বলতে পারব না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংসদ অধিবেশন তো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে না। এ ক্ষেত্রে আমরা যত দ্রুত দিতে পারব (সুপারিশ), তত দ্রুত আরেকটা কাজ আগাতে পারব।
আইন সংশোধনের কাজ তো স্থানীয় সরকার বিভাগের। সে দায়িত্ব ইসি কেন নিচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে আখতার আহমেদ বলেন, ইসির সুপারিশ করা বা প্রস্তাবনা দেওয়ার এখতিয়ার আছে কি নেই? যদি বলে প্রস্তাবনা দেওয়ার এখতিয়ার নেই, তাহলে একভাবে। আবার মনে করে পর্যালোচনা করার জন্য সুপারিশ। সুপারিশ যে রাখতেই হবে—এমন বাধ্যবাধকতা নেই। আমরা মনে করেছি সুপারিশ করা যায়। সে জন্য সুপারিশ পাঠাব। রাখা বা না রাখা যার এখতিয়ার, তিনি করবেন। এতে সরকার চাপে পড়বে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, সরকার চাপে পড়বে কি না সেই সিদ্ধান্ত সরকার নেবে।