

‘মহাভাগ্যবান’ই বলতে হবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ সারোয়ার জাহানকে। ১০ লাখ টাকার ঠিকাদারি জামানতের পে-অর্ডার অবৈধভাবে নগদায়নের প্রমাণিত অভিযোগ ধামাচাপা দিয়ে শাস্তির মুখে পড়েছিলেন তিনি। এই গুরুতর অনিয়মে তার বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল। অথচ উল্টো পেয়েছেন পদোন্নতি। একই সঙ্গে দায়িত্ব পেয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের সবচেয়ে প্রভাবশালী সংস্থাপন শাখায়।
সারোয়ার জাহানের কীর্তির এখানেই শেষ নয়, দায়িত্ব পেয়েই অনিয়মের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, নীতিবহির্ভূতভাবে এক দিনেই তিনি অর্ধশতাধিক প্রকৌশলীর বিতর্কিত বদলি করেছেন। যদিও তদবিরের মাধ্যমে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে সেই আদেশ স্থগিত করা হয়েছে! তারপরও থেমে থাকেননি ‘মহাভাগ্যবান’ এই কর্মকর্তা। ৬৬৯ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অপেক্ষমাণদের (ওয়েটিং) মধ্য থেকে মেধা তালিকার নোটিশ হঠাৎ ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলেন। মেধাবীদের স্থলে তদবিরপ্রাপ্তদের নিয়োগের চেষ্টা করেন। এই নজিরবিহীন জালিয়াতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীরা।
গণপূর্তের এই ‘গুণধর’ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। একের পর এক কেলেঙ্কারির ঘটনায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সাম্প্রতিক একাধিক বদলি আদেশ স্থগিত করে তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা রক্ষায় এ প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টরা।
বিভাগীয় মামলা রহস্যজনকভাবে উধাও: নথিপত্র বলছে, গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালনকালে মুহাম্মদ সারোয়ার জাহান একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ১০ লাখ টাকার সিকিউরিটি মানির (জামানত) পে-অর্ডার অবৈধভাবে নগদায়ন করেন। ওই ঠিকাদারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট গণপূর্ত অধিদপ্তর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে অভিযোগের শতভাগ সত্যতা পাওয়া যায় এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু রহস্যজনকভাবে তাকে শাস্তির মুখোমুখি না করে দেওয়া হয় অব্যাহতি। দুর্নীতির ‘পুরস্কার’ হিসেবে পেয়ে যান পদোন্নতিও। বাগিয়ে নেন অধিদপ্তরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও ক্ষমতাধর ‘সংস্থাপন শাখা’র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পদ।
কালবেলার হাতে আসা একটা ভিডিওতেও দেখা গেছে, প্রকৌশলী সারোয়ার জাহানের অফিসের টেবিলে বিপুল পরিমাণ টাকা সাজানো রয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে সারোয়ার জাহানের তরফে জানানো হয়, ৬৬৯ জনকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য রিক্রুটমেন্টের খরচের ১০ লাখ টাকা টেবিলে রাখা ছিল।
এ বিষয়ে পণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, ‘জুন ক্লোজিংয়ে টাকা। জুন মাসের হিসাবনিকাশের টাকা। তবে এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী।’ যদিও সূত্র বলছে, ঠিকাদারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে রিক্রুটমেন্টের খরচের টাকা বলে চালিয়ে দেন সারোয়ার জাহান।
এক দিনে অর্ধশতাধিক বদলি: সংস্থাপন শাখার দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই গত ৩ মার্চ এক দিনে ৫০ জনের বেশি প্রকৌশলীকে বদলি করে অধিদপ্তরে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি করেন সারোয়ার জাহান। এই বদলি প্রক্রিয়ায় সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কাই করা হয়নি। একই কর্মস্থলে মাত্র কয়েক মাস অতিবাহিত করা কর্মকর্তাদেরও বদলি করা হয়। অন্যদিকে বছরের পর বছর একই লাভজনক পদে থাকা সিন্ডিকেট সদস্যদের বহাল রাখা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের বিনিময়ে কোটি কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন সারোয়ার জাহান। এর আগেও ২০২৩ সালের ৯ ডিসেম্বর নীতিবহির্ভূতভাবে জারি করা কয়েকজন উপসহকারী প্রকৌশলীর বদলি আদেশ মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে স্থগিত হয়েছিল। একের পর এক নিয়মবহির্ভূত বদলির হিড়িক রুখতে শেষ পর্যন্ত গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এই গণবদলি আদেশটি স্থগিত করে এবং মন্ত্রীর নির্দেশে মন্ত্রণালয়ের পূর্ব অনুমোদন ছাড়া বদলি বা পদোন্নতির যে কোনো ফাইল অগ্রসর করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। চাকরিপ্রার্থীদের স্বপ্ন নিয়ে ছিনিমিনি, নিয়োগে ‘গোঁজামিল’: অধিদপ্তরের ১৪ থেকে ২০ গ্রেডের ৬৬৯টি শূন্য পদে সরাসরি জনবল নিয়োগের জন্য সুপারিশের পর ৫৪১ জন প্রার্থী নির্ধারিত সময়ে যোগদান করেন। বাকি ১২৮টি খালি পদে মেধার ক্রমানুসারে অপেক্ষমাণ (ওয়েটিং) তালিকা থেকে নিয়োগের জন্য গত ২১ মে অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে হঠাৎ করে সেই তালিকা ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।
চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগ, অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা সাধারণ ও যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নতুন করে প্রার্থী ঢোকানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল। মন্ত্রণালয় থেকে অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে নিয়োগ কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হলেও সারোয়ার জাহান তা অমান্য করে গোপনে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চালু রাখার চেষ্টা করেন। এ ধোঁয়াশার মধ্যে গত ৯ জুন ফের নতুন করে ১৭৮টি শূন্য পদে নিয়োগের জন্য ছাড়পত্র দেওয়া হয়, যা অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা ১২৮ জন প্রার্থীর ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত করে তুলেছে। এ প্রতারণার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ চাকরিপ্রার্থীরা এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে অপেক্ষমাণ একাধিক প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলেছে কালবেলা। তারা জানিয়েছেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন পদে নিয়োগের জন্য গত ২১ মে অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে মেধার ভিত্তিতে নির্বাচিত ১২৮ জন প্রার্থীর চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়েছিল। এ তালিকা প্রকাশের পর নিয়োগ পাওয়ার আশায় অনেকে তাদের বর্তমান সরকারি-বেসরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে যোগদানের প্রস্তুতি নেন। কিন্তু আকস্মিকভাবে অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট থেকে সেই ফল সরিয়ে ফেলা হয়। দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও ওয়েবসাইটে এ বিষয়ে কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা বা নোটিশ না দেওয়া দূরভিসন্ধিমূলক। এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে তারা এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন।
তথ্য বলছে, গত ১৮ জুন গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সরাসরি জনবল নিয়োগের জন্য গঠিত বিভাগীয় নিয়োগ, বাছাই ও পদোন্নতি কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ১৪ থেকে ২০তম গ্রেডভুক্ত ৬৬৯টি শূন্য পদে নির্বাচিতদের প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৫৪১ জন প্রার্থী যোগদান করলেও বাকি ১২৮ জন যোগদান করেননি। এই খালি পদগুলো পূরণের জন্য অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে ১২৮ জনকে নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করা হলেও মন্ত্রণালয়ের মৌখিক নির্দেশনায় পরবর্তী সময়ে এ প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়।
চিঠিতে আরও বলা হয়, একদিকে অপেক্ষমাণ তালিকার যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগ বন্ধ, অন্যদিকে নতুন করে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গত ৯ জুন আরও ১৭৮টি শূন্য পদে সরাসরি জনবল নিয়োগের জন্য ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। আগের নিয়োগ থেকে খালি থাকা ১২৮টি পদ যদি অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে পূরণ করা না হলে এ পদগুলো শূন্যই থেকে যাবে। এমন অবস্থায় অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে ১২৮ জন প্রার্থীকে নিয়োগের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য চিঠিতে অনুরোধ জানানো হয়।
অভিযোগের বিষয়ে যা বললেন সারোয়ার জাহান: নিজের বিরুদ্ধে আসা চারটি অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার জন্য যোগাযোগ করা গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন শাখা) মুহাম্মদ সারোয়ার জাহানের সঙ্গে। তবে একটি বাদে সব অভিযোগই তিনি অস্বীকার করেন। প্রথম অভিযোগটি ছিল টেবিলে টাকা ছড়িয়ে থাকার বিষয়ে। এ নিয়ে কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘আমার টেবিলে যে টাকার ছবি বা ভিডিও দেখা যাচ্ছে, এটা অফিসের টাকা। ৬৬৯ জন নিয়োগে রিক্রুটমেন্ট খরচের টাকা।’
দ্বিতীয় অভিযোগ বদিল বাণিজ্য। এ নিয়ে তার বক্তব্য, ‘বদলি করা হয়েছে অফিসের নির্দেশনায়। পরে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বাতিল করা হয়েছে। অন্য কোনো কারণ নেই। এখন বদলি বন্ধ আছে। মন্ত্রণালয় বদলির সব কিছু দেখভাল করছে।’
ওয়েবসাইট থেকে অপেক্ষমাণ তালিকা সরিয়ে ফেলার বিষয়ে সারোয়ার জাহান বলেন, ‘মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছিল অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে নিয়োগ না দেওয়ার জন্য। এজন্য ওয়েবসাইট তালিকা দিয়ে আবার সরিয়ে ফেলা হয়েছে।’
শেষ অভিযোগটি ছিল একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ১০ লাখ টাকার জামানত পে-অর্ডার অবৈধভাবে নগদায়ন করা। এটি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘এজন্য আমি ক্ষমা চাইছি।’