

দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার। বর্তমানে খোলা বাজার ও ব্যাংকিং লেনদেনে প্রতি ডলারের দাম ১২৬ টাকা ৫০ পয়সায় পৌঁছেছে। ফলে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে ডলারের দাম বেড়েছে ২ টাকা ৭৫ পয়সা।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি দায় পরিশোধের চাপ বৃদ্ধি, প্রবাসী আয় কমে যাওয়া, রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি শ্লথ হওয়া এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনার পর বিনিময় হার নিয়ে বাজারের প্রত্যাশা বদলে যাওয়ায় কয়েক সপ্তাহ ধরে ডলারের বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।
মানি এক্সচেঞ্জগুলো জানিয়েছে, গত সোমবার কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে রেমিট্যান্সের প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৭৫ পয়সা দরে কিনেছে। জুলাই মাসের শুরুতে এই দর ছিল প্রায় ১০ পয়সা কম। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের দরও এক সপ্তাহে ৭৫ পয়সা বেড়ে ১২৩ টাকা ৬০ পয়সায় উঠেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘদিন আন্তঃব্যাংক বাজারের জন্য ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা রেফারেন্স রেট ধরে রাখলেও ট্রেজারি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বাস্তবে ওই দরে খুব কম লেনদেন হয়েছে। বাজারে প্রকৃত চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতেই ব্যাংকগুলোকে বেশি দামে ডলার সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, জুন মাসেই ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি আমদানি বিল বা এলসি দায় পরিশোধ করা হয়েছে। বিশেষ করে সরকারি খাতের সার ও জ্বালানি তেল আমদানির বিল পরিশোধে ডলারের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। মার্চ ও এপ্রিল মাসে খোলা অনেক এলসির অর্থ জুন ও জুলাই মাসে পরিশোধ করায় ডলারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া রমজান উপলক্ষে খোলা ইউপিএএস (ইউজ্যান্স পে অ্যাট সাইট) এলসির একটি বড় অংশের দায়ও জুন ও চলতি জুলাই মাসে পরিশোধ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে জুনে প্রবাসী আয় নেমে এসেছে গত আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। ওই মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধিও প্রত্যাশার তুলনায় ধীর থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থনৈতিক সূচক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের ৭০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে সামান্য বেশি। অর্থাৎ আমদানি ব্যয় উচ্চ পর্যায়ে থাকলেও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের গতি সে হারে বাড়েনি।
ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি প্রধানদের মতে, কিছু ব্যাংক প্রবাসী আয়ের ডলার সংগ্রহে প্রতিযোগিতামূলকভাবে বেশি দর দিচ্ছে। পরে সেই ডলার তুলনামূলক কম দামে সরকারি এলসি পরিশোধে ব্যবহার করছে। এতে পুরো বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। তাদের মতে, কোনো ব্যাংক বাজারে অস্বাভাবিকভাবে দর বাড়াচ্ছে কি না, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
এদিকে আইএমএফের সঙ্গে চলমান আলোচনার পর বিনিময় হার আরও বাজারভিত্তিক করার বিষয়ে প্রত্যাশা বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেন নিলামের মাধ্যমে ডলার কেনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দর ধরে রাখছে, সে বিষয়ে আইএমএফ প্রশ্ন তুলেছে। এর পর থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংক পূর্বনির্ধারিত রেফারেন্স রেটের পরিবর্তে ওয়েবসাইটে চলতি আন্তঃব্যাংক বিনিময় হার প্রকাশ শুরু করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে সরকারের আলোচনা চলমান রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ডলারের বিনিময় হার নির্ধারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগের মতো অনানুষ্ঠানিকভাবে বাজারে হস্তক্ষেপ করছে না। এতে চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে বিনিময় হার আরও বেশি নির্ধারিত হচ্ছে।’