হুমায়ূন কবির
প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:৩১ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

যেভাবে ট্রাম্পকে কাঁপিয়ে মামদানির রণজয়

যেভাবে ট্রাম্পকে কাঁপিয়ে মামদানির রণজয়

যুক্তরাষ্ট্রে জানুয়ারিতে ক্ষমতায় বসার পর থেকে কী করেননি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প! যুগ যুগ ধরে চলে আসা অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক রীতিনীতি তছনছ করে চলেছেন। শুরু করেছেন বাণিজ্যযুদ্ধ, ‘পায়ে ঠেলে দিয়েছেন’ দীর্ঘদিনের মিত্রদের। অভিবাসীদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করেই চলেছেন, আইন-আদালত তোয়াক্কা না করে মার্কিন শহরগুলোয় সেনা মোতায়েন করেছেন, সরকারি দপ্তরগুলোয় যাচ্ছেতাই করছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এক ধরনের নাজেহাল করে ছেড়েছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেই একচ্ছত্র ক্ষমতা অবশেষে কিছুটা ম্লান হয়েছে। উড়তে থাকা রাজার পা যেন গত সপ্তাহে জমিনে পড়েছে! মঙ্গলবার নিউইয়র্কের মেয়রসহ বিভিন্ন নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রতিপক্ষরা জয় পেয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছেন নিউইয়র্কের নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি। তিনি ট্রাম্পের চোখে চোখ রেখে তার ও মার্কিন আধিপত্যবাদী নীতিতে কুঠারাঘাত করে বাজিমাত করেছেন। যেসব নীতি ও কর্মে ভর করে মামদানি বাজিমাত করেছেন, সেগুলোর বিস্তারিত লিখেছেন হুমায়ূন কবির

রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রায় টাকার জোর ও পেশিশক্তিকেই সবকিছু মনে করা হয়। মামদানির জয় সেই পুরোনো রাজনৈতিক ধ্যানধারণাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। বিরোধী প্রার্থীর নির্বাচনী তহবিলে কোটিপতিদের অকাতর অনুদান, সংবাদমাধ্যমের নিরন্তর নেতিবাচক প্রচার, ইসলামবিদ্বেষ, এমনকি নিজের দলের নেতাদের বিরোধিতা—সব বাধা পেরিয়ে তিনি জয়ী হয়েছেন। এ জয় প্রমাণ করেছে, শুধু টাকা আর প্রভাব থাকলেই এখন আর ক্ষমতা পাওয়া যায় না।

গণমানুষের দাবিকে প্রাধান্য: মামদানির দল ডেমোক্রেটিক পার্টির শীর্ষ নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে জনকল্যাণের ভাষায় কথা বলেছেন, কিন্তু বাস্তবে তারা অর্থশালী দাতা আর লবিস্টদের গোলামিটাই করছেন। তবে প্রচারে নেমেই সেই ভণ্ডামিটা পরিষ্কার করে দিয়েছেন মামদানি। তিনি তাত্ত্বিক বা বড় বড় বুলি আওড়াননি। গেছেন একদম মূল প্রশ্নে, ‘এ শহরে আসলে কারা থাকতে পারে?’

এ প্রশ্নের সরল উত্তর দিয়েছেন মামদানি—সরকার যেন নিজেই ঘর তৈরি করে সাধারণ মানুষের থাকার জায়গা দেয়, ভাড়াটেদের জন্য ন্যায্য ভাড়া ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, সবার জন্য বিনা মূল্যের শিশু যত্নকেন্দ্র (চাইল্ড কেয়ার) করে, শহরের বাস ভাড়া তুলে দিয়ে গণপরিবহন যেন সবার জন্য উন্মুক্ত করে।

মামদানি আরও বলেছেন, সরকারের মালিকানায় থাকা মুদিদোকান গড়ে তোলা উচিত, যাতে সাধারণ মানুষ সাশ্রয়ী দামে খাবার পায় এবং ক্ষুধার সুযোগ নিয়ে ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসায়ী চেইনগুলোর একচেটিয়া দৌরাত্ম্য শেষ হয়। তিনি ধনীদের কাছে রাষ্ট্রের পাওনা ন্যায্য ট্যাক্স দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন।

এই শহর শুধু নাগরিকদের—বার্তা পরিষ্কার: মামদানির বার্তা পরিষ্কার—সরকারের কাজ হলো যারা পরিশ্রম করে, তাদের সেবা করা; যারা টাকার জোরে প্রভাব খাটায় বা লবিং করে, তাদের নয়। তিনি স্পষ্ট করে ঘোষণা দিয়েছেন—এই শহর নাগরিকদের, কোনো ডেভেলপার, ব্যাংকার বা বড় দাতাদের নয়।

প্রতিপক্ষের দুর্বলতা: মামদানির প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যান্ড্রু কুমো এমন এক ধরনের রাজনীতির প্রতীক হয়ে উঠেছেন, যে রাজনীতিকে ভোটাররা এখন ঘৃণা করতে শিখেছেন। ওয়াল স্ট্রিটের বড় বড় ব্যবসায়ী আর দীর্ঘদিন ধরে টাকার বিনিময়ে রাজনৈতিক প্রভাব কেনা দাতাদের সমর্থনে কুমো আবার ক্ষমতায় ফিরে নিজের অতীত কেলেঙ্কারি ঢাকতে চেয়েছিলেন।

কুমোর নির্বাচনী প্রচারে অহংকার ও আত্মগরিমা ভরপুর ছিল। তিনি নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করছিলেন, যেন তিনি খুব অভিজ্ঞ, দক্ষ এবং জানেন কীভাবে শহর চালাতে হয়। তবে বাস্তবে তার ‘অভিজ্ঞতা’র কথা ছিল শুধুই মুখোশ, যার আড়ালে ছিল আত্মম্ভরিতা। ভোটাররা ভালো করেই জানতেন, কুমো ও তার অর্থদাতারা আসলে সেই পচে যাওয়া ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতিচ্ছবি, যে দল বিবেকহীনভাবে ধনীদের সেবা করাকেই রাজনীতি মনে করে।

শুধু মামদানিকে ঠেকাতে...: আরও হতাশাজনক ছিল প্রাইমারির সময় ডেমোক্রেটিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের আচরণ। কুমোর বিরুদ্ধে একাধিক যৌন অসদাচরণের অভিযোগ আছে, যার কারণে তিনি গভর্নরের পদ হারিয়েছিলেন। বিষয়টি সবাই জানত, তা সত্ত্বেও দলের অনেক প্রভাবশালী নেতা তাকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেন। এর মাধ্যমে তারা দেখিয়ে দেন, দাতারা যেদিকে নির্দেশ দেন, তাদের নৈতিকতার দিকনির্দেশনাও সেদিকেই ঘুরে যায়।

শুধু মামদানিকে ঠেকাতেই সাবেক ডেমোক্র্যাট কুমোকে পর্যন্ত সমর্থন প্রতিপক্ষ রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

কুমোকে রক্ষার এ আচরণ রিপাবলিকানদের ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আঁকড়ে ধরা আচরণের থেকে কোনো অংশে আলাদা ছিল না। দুই দলই প্রমাণ করেছে, তাদের রাজনীতি থেকে মূল্যবোধ হারিয়ে গেছে; এখন সেটি কেবল ক্ষমতা আর নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই পরিচালিত হয়।

প্রাইমারি বিতর্ক চলাকালে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীরা একে একে ঘোষণা দিতে লাগলেন, তারা নির্বাচিত হলে প্রথম বিদেশ সফরে ইসরায়েলেই যাবেন। কিন্তু মামদানি স্পষ্ট করে বললেন, তিনি নিউইয়র্কের মেয়র হতে নির্বাচন করছেন, কোনো বিদেশ নীতি-দূত হতে নয়; তাই ইসরায়েল সফরে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনাও তার নেই।

মামদানির এ সোজাসাপটা সততা রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মিডিয়া মহলকে বিস্মিত করে তোলে। ডেমোক্রেটিক পার্টির মূলধারার নেতৃত্ব এবং সংবাদমাধ্যমের বড় অংশ মামদানির এ অবস্থানকে জায়নবাদী লবির তোষণ না করা হিসেবে দেখিয়ে তাকে অযোগ্য প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিল। কিন্তু ভোটাররা বিষয়টি অন্যভাবে দেখেছেন। যখন কুমোর সমর্থকরা মামদানিকে ‘সমাজতান্ত্রিক’ বলে সমালোচনা করতে লাগলেন, তখন সেই পুরোনো ভয় দেখানোর কৌশল আর কাজ করল না। নিউইয়র্কের ভোটাররা বুঝে ফেলেছিলেন, যে বিষয়কে ট্রাম্পের মতো রাজনীতিকরা মামদানির ‘কমিউনিজম’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন, সেটি আসলে ছিল জনগণের অর্থ জনগণের প্রয়োজনেই ব্যয় হবে—এমন নীতির প্রতি তার অঙ্গীকার।

ইসরায়েল ইস্যুতে মামদানির অবস্থান: মামদানি জায়নবাদের সমালোচনা করেছেন এবং গাজায় ইসরায়েলের নৃশংসতার নিন্দা করেছেন বলে তার বিরুদ্ধে ইহুদি বিদ্বেষের (অ্যান্টিসেমিটিক) অভিযোগও আনা হয়েছে। একসময় এ অভিযোগ সত্যিকারের পক্ষপাত বা ঘৃণার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার জন্য ব্যবহৃত হতো। কিন্তু এখন সেটির এত বেশি অপব্যবহার হয়েছে যে, তার নৈতিক গুরুত্ব প্রায় হারিয়ে গেছে।

ভোটাররা ব্যাপারটি ঠিকই বুঝেছিলেন। তারা বুঝেছেন, এটি কেবল মামদানির বদনাম করার রাজনৈতিক কৌশল। এ কারণে তারা সেই প্রোপাগান্ডায় বিভ্রান্ত হননি।

এ দুটি অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে নিউইয়র্কের মানুষ দেখিয়ে দিয়েছেন—নৈতিক স্পষ্টতা ও বাস্তব মানবতা কোনো ‘চরমপন্থা’ নয়; বরং এগুলোই সমাজের জন্য অপরিহার্য। কুমো ও তার সহযোগীরা প্রকাশ্য বর্ণবাদ ও ইসলামভীতি ছড়ানোর আশ্রয় নিয়েছিলেন। ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে পরিণত করতে চাওয়া সেই লোকদের বিরুদ্ধেই মামদানির এই জয়।

এ নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নৈতিক বিভাজন রেখা তৈরি হয়েছিল ইসরায়েল প্রসঙ্গে। মামদানি এমন কিছু করেছেন, যা খুব কম মার্কিন রাজনীতিক করার সাহস দেখিয়েছেন। তিনি ইসরায়েলকে একটি স্থায়ী বৈষম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছেন। তিনি গাজায় ইসরায়েলের হামলাকে গণহত্যা (জেনোসাইড) বলে নিন্দা করেছেন। তিনি বলেছেন, ন্যায়বিচার কখনো মুখ চিনে বা বাছবিচার করে হয় না। অন্যদিকে কুমো সুযোগসন্ধানী ভঙ্গিতে, এমনকি ব্যঙ্গাত্মক পর্যায় পর্যন্ত নেমে এসে ঘোষণা দেন—যদি কোনো দিন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গণহত্যার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হন, তবে তিনি তাকে সুরক্ষা দেবেন। তিনি মামদানির অবস্থানকে ‘চরমপন্থা’ বলে অভিহিত করেন। কিন্তু ভোটারদের দৃষ্টিতে চরমপন্থি ছিলেন কুমো নিজেই।

ভোটাররা এবার কোনো মিডিয়ার ফিল্টার ছাড়াই গাজার বর্বরতার ছবি সরাসরি দেখেছেন। ফলে ইসরায়েল হলো ‘মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র গণতান্ত্রিক দেশ’—এ কথা তারা আর বিশ্বাস করেন না। ইসরায়েলকে বর্ণবাদী দেশ বলতে এখন অনেকেই আর ভয় পান না।

মামদানির জয় হলো এক প্রজন্মের বিদ্রোহের শিখরে পৌঁছানোর প্রতীক। প্রচলিত ব্যবস্থা অসম্পূর্ণ হলেও তা মানতে হবে—এ কথা শুনতে শুনতে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। তারা দেখেছেন, কীভাবে তাদের ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীজীবন ঋণের কাছে বন্ধক হয়ে গেছে, কীভাবে তাদের শ্রমের শোষণ করা হচ্ছে। তারা আর কেবল প্রতীকী উদারবাদের ফাঁকা বুলিতে সন্তুষ্ট নন। তারা এমন রাজনীতি চান, যা সত্য বলে এবং সে অনুযায়ী কাজ করে। তাদের এ প্রতিবাদই নতুন পুনর্নির্মাণের সূচনা। নিউইয়র্ক থেকে আসা বার্তা স্পষ্ট করেছে—যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জটিল এবং বৈচিত্র্যময় শহরের নাগরিকরা আর দ্বৈত চরিত্র ও অনুগত রাজনৈতিক কৌশলকে মেনে নিচ্ছেন না।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জার্মানিতে ভেঙে পড়লো উড়োজাহাজের ল্যান্ডিং গিয়ার

আদ্-দ্বীন হাসপাতালকে শোকজ, জবাব না দিলে লাইসেন্স বাতিল

ভৈরবে রেলপথ অবরোধ, ৫ ট্রেন আটকা

৬ দফা দাবিতে চমেক ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মানববন্ধন, শনিবার থেকে কর্মবিরতির হুঁশিয়ারি

সিএন্ডএফ ভবনেই মিলবে চসিকের ট্রেড লাইসেন্স, বুথ স্থাপনের নির্দেশ মেয়রের

নানার বাড়ি বেড়াতে গিয়ে পুকুরে ডুবে ২ ভাইয়ের মৃত্যু

নানার বাড়ি থেকে ফেরার পথে নিখোঁজ, খালে মিলল মরদেহ

দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষে নিহত ১, একাধিক বাড়িঘরে আগুন

কারাগারে আইভীকে গান শোনাতেন মমতাজ, যে গান না গাইতে অনুরোধ

পাকিস্তানের সিরিজ জয়

১০

ইউক্রেন ছাড় দিলে সমঝোতায় প্রস্তুত রাশিয়া : পুতিন

১১

ডাচদের হারিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজ শেষ বাংলাদেশের

১২

আফগানিস্তানকেও রুখে দিল বাংলাদেশ

১৩

দিল্লির হোটেলে ভয়াবহ আগুনে প্রাণ হারালেন বাংলাদেশি নাগরিক

১৪

পদোন্নতিতে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে সিআইডি প্রধানের পদত্যাগ

১৫

যুবদলের যোগাযোগ বিষয়ক সম্পাদক হলেন নির্যাতিত নেতা সাজিদ হাসান বাবু

১৬

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তথ্য পেয়ে চুক্তি ও ঋণপত্র বাতিল, ফেরত যাচ্ছে ‘এমটি মেমেই’

১৭

ছবি প্রকাশ করলেন রাশেদ খান / সরকার পতনের পর আ. লীগ নেতাদের সঙ্গে কয়েক ধাপে মিটিং হান্নান মাসউদের

১৮

বজ্রপাতে সারা দেশে প্রাণ গেল ১২ জনের

১৯

অবিলম্বে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম কমানোর দাবি এনসিপির

২০
X