

বিশ্বজুড়ে চলতি বছর সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা ভয়াবহ মাত্রায় বেড়েছে। পৃথিবীর পাশাপাশি মহাকাশেও এ লড়াই জোরদার হয়েছে। মার্কিন জেনারেলরা খোলামেলাভাবে সেখানে বিধ্বংসী অস্ত্র স্থাপনের কথা জানিয়েছেন। রাশিয়া তো সেখানে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে! চীনও মহাকাশে এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। তাই বিশ্লেষকদের আশঙ্কা—মহাকাশে বিধ্বংসী মারণাস্ত্র স্থাপনের এমন কার্যক্রম চলতে থাকলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা মহাকাশে হতে পারে। মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন হুমায়ূন কবির
মার্কিন বিজ্ঞানী রবার্ট গডার্ডের প্রথম তরল জ্বালানিচালিত রকেট উৎক্ষেপণের প্রায় এক শতাব্দী পর আজ আমরা আমাদের গ্রহের চারদিকে প্রচণ্ড গতিতে ছুটতে থাকা শত শত মহাকাশযানের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত; কিন্তু পৃথিবীর নিকটবর্তী কক্ষপথগুলো এখন একটি সম্পৃক্ত অবস্থায় পৌঁছে যাচ্ছে—এ বিষয়টি জেমস ক্লে মল্টজের নতুন মহাকাশ ইতিহাসবিষয়ক বই ‘ক্রাউডেড অরবিটস: কনফ্লিক্ট অ্যান্ড কো-অপারেশন ইন স্পেস’-এ গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। আর কক্ষপথের এ প্রতিযোগিতা যে সম্ভাব্য একটি বৈশ্বিক সংঘাতের সূত্রপাত ঘটাতে পারে, সেটিই এ বইয়ের অন্যতম প্রধান মূলভাব।
‘ক্রাউডেড অরবিটস’ বইটিতে ক্যালিফোর্নিয়ার নেভাল পোস্টগ্রাজুয়েট স্কুলের অধ্যাপক এবং মহাকাশ নীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মল্টজ মহাকাশের বেসামরিক, সামরিক এবং বাণিজ্যিক খাতগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার লেখা ও সাক্ষাৎকার নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিশ্ববিখ্যাত মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস।
ভবিষ্যতে কি মহাকাশ যুদ্ধ হবে
বর্তমান প্রবণতা এবং বিভিন্ন দেশের মহাকাশে ক্রমবর্ধমান সামরিক ব্যয় বিশ্লেষণ করলে চিন্তিত হতে হয়। যদি সংঘাত এড়াতে হয়, তবে এ সামরিক শক্তিগুলোকে অবশ্যই পারস্পরিক সংযম বজায় রাখতে হবে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত পারস্পরিক হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি, চলমান আলোচনা এবং ‘স্যাটেলাইট নিরাপত্তা পারমাণবিক স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি’—এই বিশ্বাসের মাধ্যমে শান্ত থাকতে পেরেছিল বিশ্ব। একবিংশ শতাব্দীতে এই সংযম বজায় থাকবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। এ দশকের মধ্যেই প্রায় ডজনখানেক দেশের মহাকাশ অস্ত্র পরীক্ষা বা শত্রু মহাকাশযানে আক্রমণ করার সক্ষমতা তৈরি হবে।
বিজ্ঞানী মল্টজ যুক্তি দিয়েছেন যে কক্ষপথে যুদ্ধ হলে ১৭ হাজার মাইল বেগে অনিয়ন্ত্রিত প্রজেক্টাইল তৈরি হবে। এর তাৎক্ষণিক প্রভাব কী হবে?
২০০৭ সালে চীনের অ্যান্টি-স্যাটেলাইট পরীক্ষা ৩ হাজারের বেশি বড় ধ্বংসাবশেষ (৪ ইঞ্চির বেশি বড়) তৈরি করেছিল, যা আগামী ৪০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে ১৭ হাজার মাইল বেগে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে থাকবে; যতক্ষণ না সেগুলো বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে পুড়ে ছাই হয়।
এই ধ্বংসাবশেষের যে কোনো একটি টুকরো কোনো স্যাটেলাইট বা কোনো মানববাহী মহাকাশযানে আঘাত করে মারাত্মক ক্ষতি, বাতাসের চাপ কমে যাওয়া এবং মৃত্যু ঘটাতে পারে। মহাকাশে যদি মাত্র এক ডজন এমন আক্রমণ ঘটে, তবে তা এত বিশাল ধ্বংসাবশেষ তৈরি করবে যে, পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ নভোচারী বা উচ্চমূল্যের মহাকাশযানের জন্য ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়বে।
ইরান বা উত্তর কোরিয়ার কি মহাকাশ যুদ্ধের প্রযুক্তি আছে
এখনো নেই। বড় চ্যালেঞ্জ হবে—উদীয়মান দেশগুলোকে মহাকাশে দায়িত্বশীল আচরণ করতে রাজি করানো। এর একটি সম্ভাব্য উৎসাহ হতে পারে এই যে, মহাকাশে যে কোনো ধ্বংসাত্মক কাজ (যেমন ধ্বংসাবশেষ তৈরি) সবারই ক্ষতি করে। তাই চীন, রাশিয়া এবং অন্যান্য উন্নত মহাকাশ শক্তিগুলোর মহাকাশে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার বিষয়ে অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে।
বাণিজ্যক মহাকাশের দুর্বলতা
বাণিজ্যিক মহাকাশ খাতের বার্ষিক আয় প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার। ভবিষ্যতে এর প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো— কক্ষপথের ভিড় ও ধ্বংসাবশেষের কারণে ভূ-স্থির কক্ষপথের (২২,৩০০ মাইল ওপরে) অবনতি, রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সির স্বল্পতা এবং দেশগুলো কর্তৃক সিগন্যাল জ্যামিং বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া।
কিউবস্যাট বিপ্লব যেভাবে কক্ষপথের ভিড় বাড়াচ্ছে
কিউবস্যাটগুলোর সাধারণত নিজস্ব কোনো চালিকাশক্তি থাকে না। এর অর্থ হলো এগুলো সম্ভাব্য সংঘর্ষের পথ থেকে সরে যেতে পারে না। এগুলো অনেক সময় একসঙ্গে অনেক উৎক্ষেপণ করা হয়, ফলে নিচে থেকে এদের শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এতে ক্ষতির দায়ভার নির্ধারণে সমস্যা তৈরি হয়।
মহাকাশের নিরাপত্তায় আউটার স্পেস ট্রিটি
১৯৬৭ সালের আউটার স্পেস ট্রিটি মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা রোধে ভূমিকা রেখেছে। এই চুক্তি মহাকাশে সংযমের একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি ‘আন্তর্জাতিক আচরণবিধি’ তৈরির চেষ্টা করছে, যা মহাকাশ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং তথ্য আদান-প্রদানে সহায়তা করবে। তবে মহাকাশ যুদ্ধ প্রতিরোধে এগুলো যথেষ্ট কি না, তা দেখার বিষয়। বর্তমান চুক্তিগুলোয় অস্ত্র পরীক্ষা এবং মোতায়েন নিয়ে কিছু ফাঁকফোকর রয়ে গেছে, যা ভবিষ্যতে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
বিজ্ঞানী মল্টজ উল্লেখ করেছেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিরা আমেরিকায় হামলার জন্য একটি মহাকাশ বোমারু বিমানের পরিকল্পনা করেছিল। এটি ছিল একটি রকেট-চালিত মানববাহী বিমান, যা মহাকাশ দিয়ে উড়ে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাত। এর উড্ডয়ন প্রক্রিয়া অনেকটা বর্তমানের ভার্জিন গ্যালাকটিকের স্পেসশিপ-টুর মতোই ছিল। তবে তথাকথিত সেই ‘আমেরিকা’ বোম্বারের লক্ষ্য ছিল সামরিক হামলা এবং অস্ত্র বহন।
মহাকাশ অস্ত্রের মালিক যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন
বর্তমানে কেবল এই তিনটি দেশ সরাসরি মহাকাশ অস্ত্র পরীক্ষা করেছে। তবে ভারতসহ আরও বেশ কিছু দেশ এ সক্ষমতা অর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। যদিও ১৯৫৮-৬২ সালে মহাকাশে পারমাণবিক পরীক্ষা চালানো হয়েছিল, তবে ১৯৬৩ সালের চুক্তিতে তা এখন নিষিদ্ধ। কেউ যদি এই নিয়ম ভাঙে, তবে সে সব দেশের রোষানলে পড়বে, কারণ পারমাণবিক বিকিরণ সব স্যাটেলাইটের ক্ষতি করবে।
কাইনেটিক অস্ত্র
কাইনেটিক অস্ত্র সরাসরি রকেট দিয়ে আঘাত করে বা লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি গিয়ে তাকে ধ্বংস করে। তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। এ ছাড়া সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যদি রকেট পায়, তবে তারা বালু বা পাথরের টুকরো কক্ষপথে ছড়িয়ে দিয়ে এলোমেলোভাবে স্যাটেলাইট ধ্বংস করতে পারে।
লেজার ও কিলার স্যাটেলাইট
শক্তিশালী লেজার দিয়ে স্যাটেলাইটের সেন্সর নষ্ট করা বা জ্বালানি ট্যাংক বিস্ফোরিত করা সম্ভব। এ ছাড়া মাইক্রোওয়েভ অস্ত্র দিয়ে স্যাটেলাইটের ইলেকট্রনিক্স নষ্ট করা যায়। জ্যামিংয়ের মাধ্যমে সিগন্যাল বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায়ও হস্তক্ষেপ করা যায়। আশার কথা হলো, এখনো মহাকাশে খুব বেশি কার্যকর অস্ত্র পরীক্ষা বা মোতায়েন করা হয়নি। তাই এগুলো প্রতিরোধের সুযোগ এখনো আছে। এখন স্যাটেলাইটের সংখ্যা বাড়লে সংঘর্ষের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে। এর ফলে মহাকাশ ট্রাফিক কন্ট্রোল ব্যবস্থার উন্নতির ওপর চাপ বাড়বে।
স্যাটেলাইট সংঘর্ষ
এখন পর্যন্ত সব থেকে বড় দুর্ঘটনা ছিল ২০০৯ সালে একটি সচল ‘ইরিডিয়াম’ এবং একটি অকেজো রুশ ‘কসমস’ স্যাটেলাইটের সংঘর্ষ। রুশ স্যাটেলাইটটি সচল না থাকায় কোনো দায়ভার নির্ধারণ করা যায়নি। তবে সংকটের সময়ে যদি কোনো প্রধান দেশের সামরিক স্যাটেলাইট এমন ঘটনার শিকার হয়, তবে তা দেশগুলোকে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে।