

ছাত্রজীবনে পরীক্ষার খাতায় গরুর রচনা লেখেননি এমন কাউকে পাওয়া মুশকিল; বিশেষত আমাদের প্রজন্মের। তবে গরু আমাদের লিখন-পঠনের বিষয়ে থাকলেও ছাগল সেখানে জায়গা করে নিতে পারেনি। আজ তাই ইচ্ছা হলো ছাগল নিয়ে একটি রচনা লিখি। ‘ছাগল’ অতিশয় নিরীহ প্রাণী। এতটাই নিরীহ যে, ‘সাত চড়ে রা নেই’ ধরনের। গরুর কোনোকিছু মনঃপূত না হলে ঘাড় বাঁকিয়ে শিং উঁচিয়ে যেমন তেড়ে আসে, ছাগল তা করে না। ছাগলের মাংস খুবই উপাদেয় খাবার। ছাগলের স্ত্রী লিঙ্গ ‘ছাগী’। কোথাও কোথাও বলে ‘বকরি’। আমাদের প্রজন্মের যারা গ্রামে বড় হয়েছেন, তাদের অনেকেই ছাগল পুষে থাকবেন। আমিও পুষেছি। শোনা যায়, ছাগীর দুধ নাকি হাঁপানি রোগ উপশম করে। এজন্য উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও ভারতীয়দের ‘বাপুজি’ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, মানে মহাত্মা গান্ধী সবসময় সঙ্গে ছাগল রাখতেন। তিনি ছাগীর দুধ পান করতেন। ছেলেবেলায় আমাকেও হাঁপানি থেকে বাঁচানোর জন্য ছাগীর দুধ খাওয়ানো হয়েছিল। তবে এ জীবনে অনেকে আমাকে ছেড়ে গেলেও হাঁপানি ছেড়ে যায়নি, পরম মমতায় জড়িয়ে রেখেছে। মহাত্মা গান্ধীকেও বোধহয় ছেড়ে যায়নি। মহাত্মা গান্ধীর ছাগল নিয়ে একবার ঘটেছিল তুলকালাম কাণ্ড। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রশমনের জন্য তিনি এসেছিলেন আমাদের নোয়াখালীতে। সেখানে কে বা কারা চুরি করে তার শখের ছাগলটি খেয়ে ফেলেছিল। এ নিয়ে দাঙ্গার আগুন ফের প্রজ্বলিত হওয়ার উপক্রম হলেও গান্ধীজির হস্তক্ষেপেই তা নির্বাপিত হয়।
ছাগল ক্ষুদ্র জন্তু হলেও অগুরুত্বপূর্ণ নয়। অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি আমাদের নিত্য বলনে এর উপস্থিতি অবহেলা করার মতো নয়। গালি হিসেবেও ছাগল বেশ জুতসই। কারও কাজকর্ম সন্তোষজনক না হলেই আমরা বলি—‘ব্যাটা একটা ছাগল’। আর কাউকে সরাসরি ছাগল বলে গালি দিলে সে জ্বলে ওঠে তেলে-মসলায়। এ এক অদ্ভুত ব্যাপার! ছাগল বলে গালি দিলে যে মানুষটি রাগে ফেটে চৌচির হয়ে যায়, তাকে যদি বলা হয় ‘বাঘের বাচ্চা’ বা ‘টাইগার’, সে খুশিতে ঝলমল করে ওঠে। আমাদের ক্রিকেট টিমকে তো আমরা ‘টাইগার বাহিনী’ বলেই অভিহিত করে থাকি। আর সিংহ বললে তো কথাই নেই, সে জাতে উঠে যায়। একদা লায়ন্স ক্লাবের সঙ্গে সম্পৃক্তির কারণে ‘লায়ন’ বলে সম্বোধিত হতাম। অথচ লায়ন, মানে সিংহও একটি হিংস্র জন্তু। মানুষ যে শক্তির পূজারি এটা বোধকরি তার আরেকটি উদাহরণ।
ছাগলকে আমরা যতই অবজ্ঞা-অবহেলা করি না কেন, আমাদের ব্যাকরণ বা সাহিত্যেও কিন্তু সে আসন দখল করে আছে। ‘পাগলে কি না বলে, ছাগলে কি না খায়’ প্রবচনটি জানেন না এমন কেউ আছেন বলে মনে হয় না। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে, পাগল যেমন আবোল-তাবোল বকে, ছাগলও তেমনি যা পায় তা-ই খায়। অথচ বালকবেলায় ছাগল পোষার সুবাদে জানি, গরু সবকিছু গো-গ্রাসে উদরস্থ করলেও, ছাগল খায় খুব বেছে বেছে। তারা ভেজা ঘাসে ভুলেও মুখ লাগায় না। আমপাতা, কাঁঠালপাতা এদের প্রিয় খাবার হলেও কচুরিপানায় বেজায় অরুচি। এহেন ছাগল আরও একটি প্রবচনের প্রতীক। আজব কোনো ঘটনা শুনলেই লোকজন মন্তব্য করে, ‘আইল কলিকাল, ছাগলে চাটে বাঘের গাল।’ যদিও বাস্তবে এমন ঘটনা সম্ভব নয়। ছাগল বাঘের গাল চাটা তো দূরের কথা, যেখানে বাঘমামার উপস্থিতি থাকে, ছাগল তার ত্রিসীমানায় ঘেঁষে না। আবার কেউ অবান্তর কথা বললেই আমরা কটাক্ষ করি—‘যাহ, ছাগলের মতো কথা বলিস না।’ অথচ কে না জানে, ছাগল কথা বলতে পারে না সৃষ্টিজনিত কারণেই।
কিশোর বয়সে অ্যাডভেঞ্চারবশত ছাগল, মুরগি, ডাব, খেজুরের রস ইত্যাদি চুরি করে খাওয়ার ঘটনা অনেকেরই স্মৃতিতে আছে। এসব নিয়ে অস্বস্তিকর ঘটনাও অনেক ঘটেছে। আমার একটি কিশোর গল্পগ্রন্থ আছে ‘বিল্লু মামার কাণ্ডকারখানা’ নামে। বইটির ছয়টি গল্পের মধ্যে একটির শিরোনাম ‘সাদা খাসি কালো খাসি’। গল্পটি এরকম—গ্রামের কিশোররা এক বাংলা নববর্ষে বনভোজন করবে বলে কিছু অনুদানের আশায় গেল গ্রামের ধনাঢ্য ব্যক্তি তসলিম খাঁর কাছে। তিনি অনুদান তো দিলেনই না, কটুকথা শুনিয়ে ওদের বিদায় করলেন। কিশোররা সিদ্ধান্ত নিল তারা তসলিম খাঁর সাদা খাসিটাকে দিয়েই বনভোজন সারবে। যে কথা সে কাজ। নববর্ষের আগের দিন তারা তসলিম খাঁর সাদা খাসিটাকে গায়েব করে দিল। তারা আরও সিদ্ধান্ত নিল খাসিটাকে জবাই করাবে তসলিম খাঁকে দিয়েই। তাই কালো রং দিয়ে তারা খাসিটাকে কালো খাসি বানিয়ে ফেলল। বিকেলে খাঁ সাহেব মসজিদ থেকে আসার সময় বিল্লুরা বলল, ‘চাচা আমাদের খাসিটা জবাই করে দিন।’ সহাস্যবদনে খাঁ সাহেব তার প্রিয় ‘ধলা’র (তিনি খাসিটাকে এ নামেই ডাকতেন) গলায় ছোরা বসিয়ে দিলেন। রাতে ছেলেরা তাকে ডেকে এনে খাওয়াল। এ পর্যন্ত সবই ঠিকঠাক ছিল। গোল বাধল কয়েক দিন পর। এক বিকেলে গ্রামের মাঠে বসে যখন বিল্লুরা খোশগল্পে মশগুল, তখন এসে উপস্থিত পাশের গ্রামের আবুল কসাই, যাকে খাসির চামড়ার বিনিময়ে গোশত বানানোর কনট্রাক্ট দিয়েছিল। সে এসে বলল, ‘বিল্লু ভাই, সেদিন আমারে দিলেন কালা খাসির চামড়া। বাড়িতে নিয়া পরিষ্কার করার লাইগা পানি ঢালতেই হেইডা হইয়া গেল ফকফকা সাদা। অইডা কি সাদা খাসি আছিল নি?’ কাকতালীয়ভাবে সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন তসলিম খাঁ। তিনি শুনে ফেললেন আবুলের কথা। ব্যাস, ঘটনা মোড় নিল নতুন ক্লাইমেক্সে। এ নিয়ে বিচার বসে, কিশোর গ্যাংটির বিচার হয় ইত্যাদি। গল্পটি আমাদের এলাকার ষোলঘর গ্রামের একটি সত্যি ঘটনা উপজীব্য করে লেখা হলেও সংগত কারণেই ঘটনার হোতাদের নাম-ধাম উল্লেখ করিনি। ঘটনাটিও আমাদের অগ্রজদের সময়ের।
অনেক দিন পর সে ঘটনাটি মনে পড়ল কোনো অজপাড়াগাঁয়ে নয়, খোদ রাজধানীর ভিআইপিদের আবাসিক এলাকায় কয়েকজন ভিআইপির দ্বারা আরেকজন সিনিয়র ভিআইপির ছাগল চুরি ও হজম করে ফেলার ঘটনা গণমাধ্যমে পাঠ করে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর ‘বাংলা আউটলুক’ নামে একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে “মন্ত্রিপাড়ায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ‘গোপন মিশন’, ছাগল অপারেশন” শীর্ষক খবরে বলা হয়েছে, গত ডিসেম্বর মাসের (২০২৪) এক রাতে রাজধানীর মন্ত্রিপাড়ায় ঘটেছিল এক ছাগল চুরির ঘটনা। চুরি করা হয়েছিল আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের দুটি ছাগল। আর চুরি করেছিলেন চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা রিফাত রশিদ। ঘটনার দিন তারা একটি সিরিয়াস বিষয়ে পাশে আরেকজন উপদেষ্টার বাসায় গভীর আলোচনায় মগ্ন ছিলেন। হঠাৎ তাদের মাথায় ‘একটু দুষ্টুমি’ করার খেয়াল জাগল। অমনি ত্বরিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেয়াল টপকে আইন উপদেষ্টার বাসভবনে ঢুকে ছাগল দুটিকে নিয়ে এলেন। তারপর ওই রাতেই একটিকে জবাই করে ভূরিভোজে মেতে ওঠেন। বোঝা যায়, শীতের রাতে খাসির মাংসের সঙ্গে হয়তো গরম খিচুড়ি সহযোগে এক জম্পেশ খাদ্যোৎসব হয়েছিল। দ্বিতীয় ছাগলটির কোনো ক্ষতি তারা করেননি। তবে সেটার গলায় ‘চুপ্পুর পদত্যাগ চাই’ প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে আইন উপদেষ্টার বাসায় ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মান্যবর নেতারা। এ ঘটনায় প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হলেও আইন উপদেষ্টা কিছু বলেননি। তবে বিব্রত আরেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অবশ্য একটি ছাগল কিনে আইন উপদেষ্টার বাসায় পাঠিয়েছিলেন; কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। মুখ ফুটে কিছু বলেনওনি। বলার মুখও হয়তো তার ছিল না। কেননা, যাদের নিয়ে তিনি গর্ব করতেন, তারাই প্রবৃত্ত হয়েছেন সামান্য ছাগল অপহরণ ও হত্যায়, এ কথা কি মনুষ্য সমাজে বলা যায়!
ঘটনাটি গত বছরের শেষ মাসের হলেও প্রকাশ পেয়েছে চলতি মাসের ১৭ তারিখে। ভিআইপি এলাকার এই ‘ভিআইপি ছাগল’ চুরির ঘটনা কেন এতদিন চাপা পড়েছিল, তা অবশ্য জানা যায়নি। কোনো প্রভাবশালী মহলের চাপে তা ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল কি না, তাও হলফ করে বলা যাচ্ছে না। তবে নবজাতক একটি রাজনৈতিক সংগঠনের একজন অতীব প্রভাবশালী নেতা, যিনি সবসময় নীতিনৈতিকতা সম্বন্ধে জাতিকে সবক দেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদের কথা বলেন, তিনি যখন একটি ছাগল চুরিতে নেতৃত্ব দেন, তখন দেশবাসীকে সংগত কারণেই হতাশ হতে হয়। তারা যদি ছাগলটি চুরি না করে আইন উপদেষ্টার কাছে গিয়ে চাইতেন, আমার বিশ্বাস হয়তো তিনি তাদের ফিরিয়ে দিতেন না। কেননা, যাদের বদান্যতায় তিনি মন্ত্রিপাড়ায় বসবাসের সুযোগ পেয়েছেন, তাদের একটা ছোট্ট আবদার রক্ষা করবেন না, তা কী করে হয়? কিন্তু নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীরা কেন সে পথে গেলেন না, আমার মতো ভোঁতা বুদ্ধির মানুষের তা বোধগম্য হচ্ছে না। হয়তো তারা কিশোর বয়সের অ্যাডভেঞ্চারে মেতে উঠতে চেয়েছিলেন। তারা হয়তো ভুলেই গিয়েছিলেন যে, তারা সাবালক হয়ে উঠেছেন। সব মানুষকে সব বয়সে যে সব কাজে মানায় না, এটাও তারা বিস্মৃত হয়েছিলেন। তবে আইন উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। কেননা, তিনি এ ক্ষেত্রে চরম সংযমের পরিচয় দিয়েছেন। তার হাতে আইন ও বিচার মন্ত্রণালয় থাকা সত্ত্বেও আইনের আশ্রয় নেননি, বিচারপ্রার্থীও হননি। তবে এ ঘটনা জানার পর অনেকের মতো আমার মনেও একটি প্রশ্ন বাবলা কাঁটার খোঁচা দিচ্ছে। যারা মাংস খাওয়ার লোভে চুপিসারে অন্যের আঙিনায় প্রবেশ করে তস্করের মতো জলজ্যান্ত ছাগল অপহরণ করে এনে হজম করতে পারে, রাষ্ট্রীয় খাজাঞ্চিখানা তাদের কাছে কতটা নিরাপদ? আসলে আমরা বড় দুর্ভাগা জাতি। পনেরো বছর এক লুটেরা গোষ্ঠীর লুটপাটে অতিষ্ঠ হয়ে তাদের বিতাড়িত করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চাইলাম। আস্থা স্থাপন করতে চাইলাম নতুন বন্দোবস্তের প্রবক্তাদের ওপর। এখন দেখছি সেখানেও বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা! বোধকরি এজন্যই লোকে বলে ‘অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুকিয়ে যায়!’
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক