

প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে। স্বপ্নের সেই বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই প্রতিপক্ষ সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন; বর্তমান ইউরোপজয়ী স্পেন। ২০২৬ বিশ্বকাপ কে জিতবে এই প্রশ্ন করা হলে চার এআই চ্যাট বক্সের মিলে একই উত্তর, আর সেটা হলো স্পেন। লা রোজাদের বিপক্ষে তাই আজ প্রথমবার বিশ্বকাপে অভিষেক ঘটা কেপ ভার্দে কত গোলের ব্যবধানে হারবে? এটাই ছিল দিনব্যাপী ভক্ত-সমর্থকদের মধ্যে মূল্য আলোচনা।
কিন্তু সব আলোচনা আর ভবিষ্যৎদ্বাণীকে বৃদ্ধাঙ্গলি দেখিয়ে গোটা ফুটবল দুনিয়াকে চমকে দিয়েছে কেপ ভার্দে। বিশ্ব ফুটবলের মহামঞ্চে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই রুখে দিয়েছে ইউরো-বিশ্বকাপ-ইউরোজয়ী স্পেনকে। আজ সোমবার রাতে আটলান্টা স্টেডিয়ামে ‘এইচ’ গ্রুপের ম্যাচে স্পেনের সঙ্গে ০-০ গোলে ড্র করেছে কেপ ভার্দে। এর মধ্য দিয়ে চলতি বিশ্বকাপে দেখা গেল প্রথম গোলশূন্য ম্যাচ।
রীতিমতো অবিশ্বাস্যই। রুপকথার মতো যে গল্পের নায়ক ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক। হ্যা, অসাধারণ নৈপূণ্য উপহার দিয়ে গোটা পৃথিবীর কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী মানুষের হৃদয় জয় করা ভোজিনহার দেয়ালেই আজ আটকে গেল স্পেন।
সেইসঙ্গে এবারের বিশ্বকাপেও শুরু হলো অঘটনের। কেপ ভার্দের ‘বুড়ো’ এই গোলকিপারের কাছে ব্যর্থ হলেন বদলি নামা সময়ের সেরা তারকা লামিন ইয়ামালও। নিঃসন্দেহেই গোলপোস্টের নিচে আজ তিনি যা করে দেখিয়েছেন যুগ যুগ ধরেই গল্প চলবে ভোজিনহা ও তার ব্রিগেডের বীরত্বের।
বিশ্বকাপ গড়ালে নিঃসন্দেহে আরও অঘটন ঘটবে। কিন্তু ৬৭ নম্বরে থাকা একটি দেশ স্পেনের মতো মহাশক্তিধর দলকে আটকে দেবে, এর থেকে বড় রূপকথা আর কী হয়!
বিশ্বকাপের আগে চোট পেয়েছিলেন স্পেনের দুই তরুণ উইঙ্গার লামিনে ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামস। আটলান্টা স্টেডিয়ামে ‘এইচ’ গ্রুপের প্রথম ম্যাচে ঝুঁকি না নিয়ে দু’জনকেই প্রথম একাদশে রাখেননি স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। কিংবা হয়তো কেপ ভার্দেকে অতটা গুরুত্ব দেননি। মাঝমাঠে রদ্রি, পেদ্রিরা ছিলেন ঠিকই। তবে আক্রমণ সাজালেন গাভি, ফেরান তোরেস ও মিকেল ওয়ারজাবালকে দিয়ে। তৃতীয়জন তবু ফলস নাইনে খেলতে পারেন। কিন্তু তোরেস বা গাভি উইংয়ের প্লেয়ার নন। ফলে যা হওয়ার তাই হল। মাঝমাঠের দখল পুরোপুরি স্পেনের পায়ে।
কিন্তু খেই হারাল ফাইনাল থার্ডে। গাভি তার নিজের স্বভাবসিদ্ধ মাঝমাঠে নেমে আসছিলেন। অন্যদিকে তোরেস ঢুকে পড়ছিলেন মাঝে। প্রথমার্ধে ওয়ারজাবালকে খুঁজেই পাওয়া যায়নি।
৪০ বছর বয়সে বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ খেলতে নামলেন কেপ কার্দের গোলকিপার ভোজিনহা। প্রথমে তোরেসের হেড আটকালেন, তারপর ফিরতি বলে থামিয়ে দিলেন ওয়ারজাবালের হেডও। এটা সবে শুরু। ভোজিনহার হাতে বন্দি হল স্প্যানিশ আর্মাডার সমস্ত রক্ষণ। ৪৪ মিনিটে ফের তোরেসের মাটি ঘেঁষা শট আটকে দেন তিনি। সামনে ৭ জনের আঁটসাঁট রক্ষণ, তার সঙ্গে ‘বজ্রমুষ্টি’ ভোজিনহার কাছে ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে বারবার হতাশ হতে হল। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল লামিনের অভাব।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও স্পেন কোচ ইয়ামালকে নামাননি। তবে তোরেসকে সামনের দিকে এগিয়ে দেওয়ায় আক্রমণের ঝাঁজ কিছুটা বাড়ে। কিন্তু ওই যে- ভোজিনহা। কখনও স্পেনের ডিফেন্ডার লাপোর্তের হেড, কখনও বা ওয়ারজাবালের শট, সব আটকে গিয়েছিল তার হাতে। একটা সময় ম্যাচটা পরিণত হয়েছিল স্পেন বনাম ভোজিনহা। অবশেষে ৭০ মিনিটে লামিনেকে নামাতে বাধ্য হলেন স্পেন কোচ লা ফুয়েন্তে। সঙ্গে সঙ্গে তার পিছনে তিনজন ডিফেন্ডারকে জুড়ে দিলেন কেপ ভার্দের কোচ বুবিস্তা। ৭২ মিনিটে ফের মার্কাস লরেন্তের শট আটকে দেন ভোজিনহা। ম্যাচের একেবারে শেষের দিকেও অবিশ্বাস্য সেভ করেন তিনি।
গোটা ম্যাচ জুড়ে আফ্রিকার দেশের গোল লক্ষ্য করে ৮টি শট করে স্পেন। বদলে মাত্র একটা শট করেছে কেপ ভার্দে। সেখান থেকে গোল করতেও পারত তারা। সেটা হয়নি। তাতে কিছু যায়ে আসে না। সব সময় গোল করা বা ম্যাচ জেতাটাই সব নয়। তার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মাটি কামড়ে পড়ে থাকা। গল্প তৈরি হয় সেটা থেকেই। স্পেনের মতো মহা শক্তিধর দেশ আটকে গিয়েছে পাঁচ লক্ষের দেশের কাছে। শুধু ট্যাকটিক দিয়ে তা হয় না। বুকের খাঁচার ভিতরে একটা সিংহের মতো বড় হৃদপিণ্ড থাকতে হয়। কেপ ভার্দে সেটা প্রমাণ করেছে। এখন আর তাদের পরিচয় বিশ্বকাপে খেলা সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম দেশ হিসেবে নয়। বিশ্বকাপের মতো বিরাট মঞ্চে তারা থামিয়ে দিয়েছে লা রোজাদের।