

বেশ কয়েক দিন ধরে লক্ষ করছি, পাশের বাসার ছাদের ওপর একটা সাত-আট বছরের শিশু একা একা কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। একটু মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করতেই দেখলাম, বাচ্চাটার হাতে ব্যাট আর সামনে থাকা দেয়ালে নিজেই বল ছুড়ে দিচ্ছে আর সেই দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে যেই বলটা তার দিকে ছুটে আসছে, ঠিক সেই মুহূর্তে সে বলটা তার ব্যাট দিয়ে শট খেলেই দৌড়ে রান নেওয়ার চেষ্টা করছে।
অবশেষে বিষয়টা বোধগম্য হলো, কংক্রিটের দেয়ালকে করেছে অপজিশন দলের বোলার ও খেলার সহযোগী। কংক্রিটের দেয়ালই তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। এ দেয়ালকে সে তার বন্ধু বা প্রতিযোগী বানিয়ে ক্রিকেট খেলছে তার সঙ্গে এবং কথা বলছে। এ দেয়ালকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে তার বাচ্চাটা কথা বলছে কল্পনার রং মিশিয়ে। বিষয়টির গভীরতা ভাবতেই ভেতরটা বেশ বিমর্ষ হয়ে উঠল। আর এভাবেই আমাদের এ শহরের শিশুদের শৈশব ও কৈশোর পেরিয়ে যাচ্ছে কংক্রিটের দেয়ালকে বন্ধু অথবা খেলার কাল্পনিক প্রতিযোগী মনে করে। ফলে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে সিজোফ্রেনিয়া বা অডিটরি হ্যালুসিনেশনের মতো ভয়ংকর রোগে।
একটি শিশু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার চারপাশ থেকে সবসময় সবরকম জ্ঞান আহরণ করতে করতে বড় হয়। একটি শিশু সবচেয়ে বেশি আনন্দ অনুভব করে যখন সে তার সমবয়সী কোনো সঙ্গীর সঙ্গে সময় কাটানো বা খেলার সময় পায়। যেখানে এ শহরে তার কোনোরকম সুযোগ নেই বললেই চলে। একটি বাচ্চা যখন মাঠে খেলতে যায় বা সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে খেলে বা গল্প করে, সেখানে নানা আর্থিক অবস্থানে থাকা পরিবারের শিশুরা আসে। শিশুটি সেসব পরিবারের অবস্থান সম্বন্ধে জানতে পারে। সবাইকে গ্রহণ করতে শেখে। কিন্তু এই একলা থাকা শিশুরা সেসব পর্যায়ে মেশার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এরা বেড়ে ওঠে নীরবে নিভৃতে কংক্রিটের সীমানার চাদরকে সঙ্গী করে।
একটা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বলতে আমরা শিশুদেরই বুঝি যারা ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র তথা বিশ্বকে প্রতিনিধিত্ব করবে। সেই শিশুরা যদি এমন একাকিত্বকে সঙ্গী করে বেড়ে ওঠে, তাহলে সেই শিশু ভবিষ্যতের জন্য কতটা মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে, সেটা ভাবতেই বিস্মিত হতে হয়!
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের স্কুলে বা নগরীর প্রতিটি পাড়ায় সম্ভব হলে প্রতিটি বাসায় খানিকটা করে খেলার জায়গা রাখা প্রয়োজন। তা না হলে শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে আমাদের অতি আদরের শিশুরা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে বেড়ে উঠবে। তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা দেবে। আর শারীরিকভাবে দুর্বল হওয়ার কারণে তার মাঝে যেমন ভীরুতা প্রকাশ পাবে তেমনি কোনো কাজে উৎসাহ পাবে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি প্রতিবেদনে দেখলাম, যে শিশুরা পর্যাপ্ত আলো, বাতাস বা শারীরিক কসরতপূর্ণ খেলাধুলার পরিবেশের সংস্পর্শ পায় না, সেসব শিশু ভবিষ্যতে নানান মানসিক ও শারীরিক সমস্যার ভেতর দিয়ে তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করে; যা ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য মারাত্মক হুমকির বিষয়।
আমাদের শৈশব স্মৃতিগুলো মনে পড়লেই মনের গভীরে ভেসে ওঠে সেই অবারিত সবুজ দিগন্ত, সবুজে ঘেরা খেলার মাঠ, স্কুল ছুটির পর সবাই মিলে একসঙ্গে ক্রিকেট, ফুটবল খেলা। স্কুল ছুটির দিনে নদী থেকে পলায়নপর খালের জলে সবাই মিলে হৈ হৈ করে গোসল করা। কত আনন্দ কত মধুর শৈশব, যা আজকের রোবোটিক প্রজন্ম তা চিন্তাও করতে পারবে না।
অথচ আজকের পুঁজিবাদের চাপিয়ে দেওয়া আধুনিক সভ্যতার নামে যে সভ্যতা এখানে গড়ে উঠেছে, সেখানে আমরা দেখতে পাই বাবা-মা রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়েছে তার চার বছরের বাচ্চাকে নিয়ে কিন্তু বাচ্চা কোনোভাবেই কিচ্ছু খাচ্ছে না। ঠিক কেন খাচ্ছে না তা বোঝা গেল যখন শিশুর মা তার হাতের মোবাইল ফোনে কোনো গেম বা টিকটিক ভিডিও ওপেন করে তার হাতে দিল। আর তখনই শিশুটি নিজের অজান্তে গোগ্রাসে গিলে চলল খাবার নামক অদৃশ্য বস্তু। সে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারছে না খাবার কী এবং এটার গুরুত্ব কতখানি।
শিশুর লক্ষ্য ঠিক তার মোবাইলে আর সে যে খাবার খাচ্ছে, তা ঠিক কম্পিউটারের কোনো ডেটা ইনপুট করার মতোই ব্যাপার, যেখানে সে কোনোরকম স্বাদ অনুভব না করেই গিলে যাচ্ছে—যেটা তার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ।
এখনকার মায়েরা তার সন্তানদের স্কুলে টিফিন দিলে তা শুধু সে যেন একা খায় অন্যকে যেন না দেয় এটা সে কঠিনভাবে বলে দেয়। আমাদের সময়ে তেমন টিফিন ব্যবস্থা ছিল না। আমরা সকালে খেয়ে স্কুলে যেতাম আর দুপুরে সবার কাছে যে টাকা থাকত তা দিয়ে সমানভাবে ভাগ করে খেতাম। যার কাছে টাকা থাকত না সেও সমান ভাগই পেত। কই, আমার তো মনে পড়ে না কারও স্বাস্থ্যের তেমন কোনো অবনতি হয়েছিল বা কেউ অসুস্থ হয়। কিন্তু এখনকার বাচ্চাদের এত পরিমাণে খাওয়ানো হয়, দেখা যায় তারা খুব অল্প বয়সেই থলথলে মাংসের বোঝার মালিকানা লাভ করে।
যে মানসিক পরিচর্যা আগে সহজলভ্য ছিল যৌথ পরিবারে, এখন তা অপ্রতুল। একসঙ্গে এক পরিবারে থাকলে একদিকে যেমন দায়িত্ব, কর্তব্যবোধ গড়ে ওঠে, তেমনই বিপদে একে অপরের পাশে থাকার মতো নির্ভরতাও থাকে, মানসিক বিকাশের পথে যেটা খুবই জরুরি। বেশিরভাগ মা-বাবা শিশুদের ভেতর নিভৃতে স্বার্থের বীজ রোপণ করছে, যা ভবিষ্যতে তাদের জন্যই বিষবৃক্ষ রূপে আবির্ভূত হবে।
আমাদের দাদা-দাদিরা ছোট সময় বিভিন্নরকম গল্প শোনাত। গল্পের ছলে নানান বিষয় তারা আমাদের শেখাত। একটা শিশুর কল্পনার একটা বিশাল জগৎ থাকে আর সেই জগতের প্রসার ঘটানোর জন্য গল্পের কোনো বিকল্প নেই। অথচ আজকালকার বাবা-মারা সন্তানকে নিয়ে আলাদা থাকার কারণে তারা আর সেই গল্পের জগৎ পায় না। এখনকার মা-বাবাদের শিশুদের গল্প শোনানোর মতো যথেষ্ট সময়ও অবশিষ্ট নেই। মোবাইল ফোনে টিকটক চালিয়ে দিয়েই তারা মুক্তি পেতে চায়। অথচ মোবাইল ফোন হাতে না দিয়ে শিশুদের গল্প শোনানো বা গল্পের বই দেওয়া জরুরি। যার মাধ্যমে একটি শিশুর একটি আদর্শ কল্পনার জগৎ তৈরি হতে পারে। যেটা মোবাইল ফোন পারে না।
শারীরিক কোনো কার্যকলাপ না করার কারণে এখনকার শিশুরা অল্প বয়সেই মুটিয়ে যাচ্ছে। ফলে সমবয়সী অন্যান্য শিশু মোটা শিশুদের পছন্দ করে না, পরিণত হয় সহপাঠীদের উপহাসের পাত্রে। এতে নিজের স্থূলতা নিয়ে তারা তাদের আত্মবিশ্বাস হারিয়ে মানসিকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা স্টেট ইউনিভার্সিটির অ্যামান্ডা ডব্লিউ হ্যারিস্ট বলেন, ‘অতিরিক্ত স্থূলতা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ, এমনকি তাদের বয়স ছয় পেরোলেও।’ দেখা যায়, স্থূল শিশুরা প্রতিনিয়ত তাদের সমবয়সীদের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়। ফলে শিশুরা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
তাই আমাদের শিশুরা যেন একটি সুস্থ ও সুন্দর শৈশবের ভেতর দিয়ে বেড়ে উঠতে পারে, সেদিকে অবশ্যই সবার নজর দিতে হবে। আর এ কাজটি করতে হবে প্রত্যেক পিতা-মাতার, তাদের লক্ষ রাখতে হবে যাতে সন্তানরা একাকিত্বে না ভোগে। শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলা করতে হবে, পর্যাপ্ত সময় দিতে তাদের মনের সব প্রশ্নের জবাব দিয়ে তার মনকে স্বচ্ছ পানির মতো নির্মল করে গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, আজকের শিশুই আগামী দিনের সুন্দর পৃথিবী বিনির্মাণের কারিগর।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও সাংস্কৃতিককর্মী