

বিভ্রান্তি, রটনা, গুজব কাজে লিপ্তরা নাছোড়বান্দা। তাদের কাছে কিছুতেই ছাড় নেই। তেল-পানি, অসুখ-ওষুধ সবকিছু নিয়েই তারা এ কাজে যারপরনাই সিরিয়াস। রটনা দিয়ে ঘটনা, গুজব দিয়ে গজব নামানো তাদের কাছে নেশার মতো। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা না ছড়ানো পর্যন্ত দম নেয় না। সরকারের দিক থেকে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বারবার জানানো হচ্ছে জ্বালানো তেলের পর্যাপ্ত মজুতের কথা। মজুতকৃত তেলে কতদিন চলবে, তাও নাম ধরে ধরে বলা হচ্ছে। তারপরও নিস্তার নেই। বলার অপেক্ষা রাখছে না, গোটা বিশ্ব ইতিহাসের ভয়াবহ জ্বালানি-সংকটের মুখে। তা বুঝতে রসায়ন, অর্থ, যুদ্ধ বা অন্য কোনো শাস্ত্র জানতে হয় না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়। পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে আলোচিত হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা আসে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রধান এ নৌপথ অচল হয়ে পড়ায় বাংলাদেশেও জ্বালানি আমদানি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। যুদ্ধ শুরুর পর দেশে দেশে জ্বালানি আমদানির পূর্বনির্ধারিত সূচি এলোমেলো হয়ে গেছে। ইরান যুদ্ধ বিশ্বকে ভয়াবহ জ্বালানি-সংকটের তথ্য শিশুশ্রেণির জ্ঞানও নয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা-আইইএ প্রধান ফাতিহ বিরোল সবিস্তারে জানিয়েছেন, গত শতকের সত্তরের দশক এবং কয়েক বছর আগের ইউক্রেন যুদ্ধ যে জ্বালানি-সংকট তৈরি করেছিল, সেই দুই ঘটনা যোগ করলেও এবারের পরিস্থিতির সমান হবে না। তা ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালের ধাক্কা এবং ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের ফলে সৃষ্ট গ্যাস-সংকটকেও ছাড়িয়ে গেছে।
জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলো ১৯৭৩ সালে ইসরায়েলের বন্ধুরাষ্ট্রগুলোতে তেল বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দিলে বিশ্বের জ্বালানি বাজারে তার ধাক্কা লাগে। তার ছয় বছর পর ১৯৭৯ সালে জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী শীর্ষস্থানীয় দেশ ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর আবার জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। এরপর ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার ওপর নানা নিষেধাজ্ঞায় জ্বালানির বিশ্ববাজার আবার অস্থির হয়ে ওঠে। হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং জ্বালানি স্থাপনায় হামলার কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল সরবরাহ প্রতিদিন কমেছে প্রায় ১ কোটি ১ লাখ ব্যারেল। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ নৌপথ বন্ধ হয়ে পড়লে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। একদিকে উৎপাদন কমেছে, চাহিদা বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই তা জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রক্রিয়ায় ছেদ ফেলেছে। বিভিন্ন দেশ যার যার মতো এ সমস্যা মোকাবিলা করছে। কেউ দাম চড়িয়েছে। কেউ ব্যবহারের সীমানা বেঁধে দিয়েছে। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। সরকার রেশনিংয়ে গিয়েও আবার সরে এসেছে।
সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক তেলের দামে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১৯ মার্কিন ডলারে পৌঁছায়, যদিও পরে কিছুটা কমে আসে। এ মূল্যবৃদ্ধি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ প্রভাব আরও তীব্র; কারণ, দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ডিজেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেখানে যুদ্ধ-সংঘাত উত্তেজনার জেরে নির্ধারিত সময়ে একাধিক জ্বালানিবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছাতে না পারায় তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ অমূলক নয়। মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান কেন্দ্র। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। একই সঙ্গে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রধান সরবরাহকারী। ফলে এ অঞ্চলে সংঘাত বা সামরিক উত্তেজনা শুধু তেলের বাজারকেই নয়; বরং পুরো বৈশ্বিক জ্বালানির সরবরাহ-শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতাকেই হুমকির মুখে ফেলে।
সরকার এসব তথ্য ও বাস্তবতা লুকায়নি। বিকল্প উৎস থেকে আমদানির চেষ্টাও করছে। হালনাগাদ তথ্য দিচ্ছে। সরকারের চেষ্টা দৃশ্যমান। সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখার যাবতীয় চেষ্টাও স্পষ্ট। কোথাও জ্বালানি সংকট বা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখা দিলে সরকার তা কঠোর নজরদারিতে আনছে। প্রয়োজনে খোলাবাজার থেকেও পরিশোধিত ডিজেল কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় জনগণকে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ না করার আহ্বানটি অযৌক্তিক নয়। কারণ, আতঙ্কে যে কোনো পণ্য অতিরিক্ত কেনাকাটা করলে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ পড়ে। বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা গেছে, চলতি মাস নিয়ে উদ্বেগ নেই। সরকারের ভাবনায় এখন আগামী দুই মাস। পরিস্থিতি সামলাতে এপ্রিল-মে মাসের জন্য প্রাথমিক আমদানি সূচি তৈরি করেছে বিপিসি। এপ্রিলে সমুদ্রপথে ১৪টি জাহাজ এবং পাইপলাইনে ৩টি পার্সেলের মাধ্যমে ৩ লাখ টন ডিজেল, ৫০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন এবং ৫০ হাজার টন ফার্নেস তেল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত মাত্র ১ লাখ ১০ হাজার টন ডিজেল এবং পাইপলাইনে ২০ হাজার টন সরবরাহের নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোয় জ্বালানি সরবরাহ করে রাষ্ট্রায়ত্ত তিন প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েল কোম্পানি। সারা দেশে তাদের ডিপো রয়েছে। এসব ডিপো থেকে প্রায় আড়াই হাজার ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি পাঠানো হয়।
সংকটের আশঙ্কায় আগাম ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোল কিনে রাখলে কী অবস্থা হয়, তার নমুনা গত কদিন দেখছে মানুষ। এতে কোথাও কোথাও দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল, যা মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসে। বাকি ৮০ শতাংশ পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করা হয়। হালনাগাদ হিসাবে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে এখনো ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল মজুত আছে, যা দিয়ে আরও ১৭-১৮ দিন উৎপাদন চালানো সম্ভব। চিন্তার বিষয় হচ্ছে, নতুন চালান নিয়ে। তা সময়মতো না এলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহে তিনটি বড় চাপ একসঙ্গে কাজ করছে—জাহাজ আসতে বিলম্ব, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, আতঙ্কে চাহিদার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। সমস্যাটা আরও পেকেছে পিক-অফ ও পিক-টাইম নিয়ে। সকালবেলা আগে যেমন ট্যাংক-লরি ওরা ভরত, সারাদিন বিক্রি করেও তেল উদ্বৃত্ত থাকত। কিন্তু ওরা এরকম লাইন দিয়ে বিক্রি করার পরে উদ্বৃত্ত থাকে না। আর আমাদের ডিপোগুলো থেকে তেল ট্রাক দিয়ে ভরতে টাইম লাগে, এজন্য সকালবেলা আর্লি মর্নিংয়ে তেল থাকে না। পরে আবার থাকে। পেট্রোল স্টেশন ও পাম্পগুলো একটা প্রসেসে চলে। এখন ভিড়, হুলস্থুল ও ‘নাই-নাই’ আওয়াজ এবং গুজবে প্রসেসও ভেঙে পড়েছে। ডিপো থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ নেই। কিছু ফিলিং স্টেশন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তেল নিচ্ছে। আবার আগে যেসব স্টেশনে বিক্রি কম ছিল, সেগুলোও এখন বেশি তেল তুলছে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে।
কোনো কিছুর চাহিদা আর জোগানের হেরফেরে কী হয়? তা কানাকড়ির হিসাব জানা ব্যক্তিও জানেন। তারপরও তেলের অভাবে যেন ঈদে কোনো গাড়ি বন্ধ না থাকে সেদিকে নজর ছিল সরকারের। দৃষ্টিপাত দরকার সামনের দিকেও। পরিস্থিতিটা অবশ্যই উদ্বেগজনক। এ দেশ আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, পরিবহন ও কৃষি—সব ক্ষেত্রেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেল এবং এলএনজির ওপর নির্ভরতা চরমে। ফলে এ অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে হুমকিতে ফেলতে পারে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে। এ অবস্থায় সজাগ ও সতর্কতার বিষয় রয়েছে। কিছু অসাধু চক্র ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির লক্ষ্যে বাজারে আতঙ্ক ছড়ানোর অপচেষ্টা করবে, তা অস্বাভাবিক নয়। সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্য কোনো মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য, গুজব থেকে সাবধান থাকতেই হবে। দেশের পেট্রোল পাম্প ও তেলের ডিপোগুলোতে লাইন ধরে পড়ে থাকার পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে ছড়ানো গুজবই মূল কারণ। এ গুজবের অবসানে বিপিসি স্পষ্ট জানিয়েছে, দেশের মোট চাহিদার বড় অংশ আমদানিনির্ভর হলেও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে আমদানি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। কিছু অসাধু ডিলার বা স্টেশনের অতিরিক্ত মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির অপচেষ্টাও খোলাসা হয়ে গেছে। দাম বেশি নেওয়ার সুযোগই নেই। মনে রাখতে হবে, সরকার নির্ধারিত মূল্যে জ্বালানি তেল বিক্রি বাধ্যতামূলক।
লেখক: কলামিস্ট, ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন