কাশেম শাহ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৬, ০৮:০৬ এএম
অনলাইন সংস্করণ

উচ্ছেদ অভিযান চসিকের, দখল অভিযান হকারের

ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান চালাচ্ছে চসিক কর্মীরা। ছবি : কালবেলা
ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান চালাচ্ছে চসিক কর্মীরা। ছবি : কালবেলা

চট্টগ্রাম নগরীতে একদিকে ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করতে ধারাবাহিক উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক), অন্যদিকে কয়েক দিন না যেতেই সেই জায়গা আবার দখল করে বসছেন হকাররা। সিটি করপোরেশনের সঙ্গে হকারদের এই ইঁদুর দৌড় খেলা পুরোনো হলেও তা বন্ধে ব্যর্থ হয়েছে প্রশাসন।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, সড়কে নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা এবং অবৈধ স্ট্যান্ড গড়ে তোলার প্রবণতা। ফলে উচ্ছেদ অভিযান চললেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমছে না। বরং পথচারীদের হাঁটতে নামতে হচ্ছে সড়কে, বাড়ছে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

গত শনিবার (৬ জুন) নিউ মার্কেট মোড় থেকে সদরঘাট রোড পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে প্রায় ২০০ অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করে চসিক। এর পরদিন আন্দরকিল্লা মোড় থেকে দেওয়ানবাজার পর্যন্ত এলাকায় আরও দেড় শতাধিক ভাসমান দোকান সরিয়ে দেওয়া হয়। দুই দিনে মোট সাড়ে তিন শতাধিক অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করা হলেও আদতে ফুটপাত ও সড়কের একাংশ বেদখলই রয়ে যাচ্ছে।

শনিবার বিকেলে সিটি করপোরেশনের স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট (যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ) মো. সোয়েব উদ্দিন খানের নেতৃত্বে নিউমার্কেট এলাকার অমর চাঁদ রোড হয়ে সদরঘাট রোড পর্যন্ত অভিযান চালানো হয়। সিটি করপোরেশন বলছে, এসব অবৈধ স্থাপনার কারণে পথচারী ও যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটত।

স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সোয়েব উদ্দিন খান বলেন, নগরীর ফুটপাত ও সড়ক মানুষের জন্য উন্মুক্ত রাখতে এ অভিযান চালানো হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, নগরের কোনো ফুটপাত বা সড়ক অবৈধভাবে দখল করে রাখা যাবে না। জনগণের চলাচলের জন্য নির্ধারিত স্থান জনগণের কাছেই ফিরিয়ে দিতে হবে। ভবিষ্যতেও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত চালাবে। উচ্ছেদের পর পুনরায় কেউ ফুটপাত ও সড়ক দখলের চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নিউ মার্কেট এলাকায় অভিযানের পরদিন অভিযান চালানো হয় নগরের সিরাজউদ্দৌলা রোডের আন্দরকিল্লা মোড় থেকে সাব–এরিয়া হয়ে দেওয়ানবাজার পর্যন্ত এলাকায়। এ সময় সড়ক ও ফুটপাত দখল করে অবৈধভাবে বসা প্রায় দেড় শতাধিক ভাসমান দোকান উচ্ছেদ করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। রোববার (৭ জুন) বিকেলে পরিচালিত এ অভিযানে নেতৃত্ব দেন সংস্থাটির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চৈতী সর্ববিদ্যা। একই অভিযানে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে দোকানের মালামাল ও নির্মাণ সামগ্রী রেখে চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার অপরাধে চার ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে ১৮ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।

কয়েক দিন পরই ফিরছে হকার

নগরীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, উচ্ছেদ অভিযানের পর কিছুদিন জায়গা ফাঁকা থাকলেও পরে আবার সেখানে বসতে শুরু করেন হকাররা। বিশেষ করে নিউ মার্কেট, আন্দরকিল্লা, জুবিলী রোড, স্টেশন রোড, চকবাজার ও সদরঘাট এলাকার ফুটপাতগুলোতে এই চিত্র নিয়মিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, হঠাৎ হঠাৎ উচ্ছেদ অভিযান হলেও দখল ঠেকাতে স্থায়ী নজরদারি নেই। ফলে কয়েক দিন পরই ফুটপাত আবার পণ্যে ভরে যায়। পথচারীদের জন্য তৈরি ফুটপাত ব্যবসার স্থানে পরিণত হয়।

নিউ মার্কেট এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, দোকানের আয়তন বড় জোর ১০ থেকে ১২ ফুট। কোথাও কোথাও সামান্য বেশি। কিন্তু দোকানের মালামাল রাখা হয়েছে ফুটপাত থেকে শুরু করে রাস্তা পর্যন্ত। ফলে একদিকে যেমন ফুটপাত নিজেদের দখলে নিয়েছে, তেমনি সড়কের একাংশও নিজেদের করে নিয়েছেন দোকানদাররা। এতে করে পথচারীদের বাধ্য হয়ে হাঁটতে হচ্ছে মূল সড়কে, আর গাড়ি চলতে হচ্ছে ধীরগতিতে।

শনিবার অভিযান শেষে আবদুল আলিম নামে নিউ মার্কেট এলাকার এক পথচারী বলেন, অভিযান হয়, দোকান তুলে দেয়। কিন্তু এক সপ্তাহ না যেতেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। আমাদের হাঁটতে হয় রাস্তা দিয়ে।

ফুটপাত ছাড়লেও সড়ক ছাড়ছে না পার্কিং

হকার উচ্ছেদ করলেও নগরীর আরেক বড় সমস্যা যত্রতত্র গাড়ি পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে নগরবাসীর মধ্যে। নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে দিনের পর দিন রাস্তার একাংশ দখল করে রাখা হচ্ছে ব্যক্তিগত গাড়ি, বাস, মাইক্রোবাস ও বিভিন্ন পরিবহনের মাধ্যমে। আগ্রাবাদ থেকে দেওয়ানহাট, মুরাদপুর থেকে বহদ্দারহাট, নিউ মার্কেট, স্টেশন রোড, লালদীঘির পাড়, প্রবর্তক মোড়, চকবাজার, আছদগঞ্জ, খাতুনগঞ্জসহ অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় রাস্তার পাশেই গাড়ি পার্কিং করতে দেখা যায়। কোথাও কোথাও সড়কের একটি লেন প্রায় স্থায়ীভাবে দখল হয়ে থাকছে।

বিশেষ করে হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক এলাকার সামনে এই সমস্যা প্রকট। পাঁচলাইশের হাসপাতাল এলাকায় রোগী ও স্বজনদের চলাচল প্রায়ই বিঘ্নিত হচ্ছে। পার্কভিউ, ইবনে সিনাসহ বিভিন্ন হাসপাতালের সামনে গাড়ির সারি এবং অনিয়ন্ত্রিত পার্কিংয়ের কারণে রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সও আটকে পড়ছে যানজটে। নগরীর বিভিন্ন স্কুলের আশপাশে শিক্ষার্থী আনা-নেওয়ার সময় সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। জামাল খান, বাওয়া স্কুল, চিটাগাং গ্রামার স্কুল, সানশাইন গ্রামার স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে স্কুল শুরুর ও ছুটির সময়ে সড়কে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যায়। অভিভাবকদের গাড়ি এবং বিভিন্ন পরিবহনের অনিয়ন্ত্রিত অবস্থানের কারণে আশপাশের পুরো এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। এতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ যাত্রী সবাইকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

সড়কেই বাস টার্মিনাল

নগরীতে দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের সংকট রয়েছে। এ সুযোগে বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানি রাস্তার পাশেই বাস রাখছে এবং যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছে। অক্সিজেন এলাকায় হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, রাউজান, রাঙামাটি এবং খাগড়াছড়ি বাসের দীর্ঘ লাইন রাত-দিন যানজটের অন্যতম কারণ। অক্সিজেন পুলিশ বক্সের সামনে থেকে শুরু করে প্রায় আধা কিলোমিটারজুড়ে এলাকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম ও উত্তর চট্টগ্রামের বাসগুলো দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলে। এর পাশাপাশি সিএনজি অটোরিকশা এবং টেম্পোও অপেক্ষায় থাকে যাত্রীর। এতে করে মোড় থেকে শুরু করে রাস্তার বেশিরভাগ জুড়ে যানজট লেগে থাকে।

এছাড়া বহদ্দারহাট, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, কদমতলী, দামপাড়া, স্টেশন রোড, বড়পুল, অলংকার, একে খানসহ বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যার পর দূরপাল্লার বাসের সারি দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে সড়কের একাংশ কার্যত বাস পার্কিংয়ে পরিণত হয়। এতে যানজট আরও তীব্র হয়। পথচারীদের চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠে।

প্রশ্নের মুখে সমন্বয়

নগর পরিকল্পনাবিদ ও সচেতন নাগরিকদের মতে, চসিক ফুটপাত উচ্ছেদে অভিযান চালালেও সড়কে অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। ফলে এক সংস্থা উচ্ছেদ করছে, আরেকদিকে নতুন করে দখল তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান স্থপতি আশিক ইমরান বলেন, শুধু উচ্ছেদ অভিযান দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত নজরদারি, হকার ব্যবস্থাপনা, অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। খাতুনগঞ্জের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যানবাহনগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকে। কিন্তু এই খাতুনগঞ্জ হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির একটা প্রাণকেন্দ্র।

দুর্ভোগের শেষ কোথায়?

দুই দিনে ৩৫০-এর বেশি অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করে চসিক নগরবাসীকে কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিয়েছে। কিন্তু ফুটপাত পুনর্দখল, অবৈধ পার্কিং, সড়কে বাস রাখা, নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা এবং ভাসমান ব্যবসার দৌরাত্ম্য অব্যাহত থাকায় সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না।

ফলাফল একটাই— ফুটপাতে হাঁটা যায় না, সড়কে গাড়ি চলে না, যানজটে সময় নষ্ট হয়, আর দুর্ভোগের বোঝা বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকেই। নগরবাসীর প্রশ্ন, উচ্ছেদ অভিযানের পর দখল রোধে কার্যকর ব্যবস্থা কবে নেওয়া হবে? চসিকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আজিজ আহমদ জানান, ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের নির্দেশে এসব অভিযান পরিচালিত হচ্ছে, যা অব্যাহত থাকবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে প্রাণ গেল যুবকের

ব্যভিচারের অভিযোগের মামলায় ক্রিকেটার নাসির ও তামিমা খালাস

‘সুপার’ এল নিনোতে ১০টি বড় বিপদের শঙ্কা

ট্রাক-অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত ২

দুই ম্যাচের ২ পেনাল্টিতে শেষ হলো আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ প্রস্তুতি

বেইলি ব্রিজ ভেঙে ঢাকা-মঠবাড়িয়া-পাথরঘাটা যান চলাচল বন্ধ

নিরাপদ থাকতে চাইলে আমাদের অঞ্চল থেকে চলে যাও, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান

ট্রেন উদ্ধারে যাওয়ার পথে রিলিফ ট্রেনও লাইনচ্যুত

নতুন উপ-উপাচার্য পেল চার বিশ্ববিদ্যালয়

সেনাকুঞ্জে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

১০

ফুটবল খেলে ঘরে ফেরা হলো না ২ শিশুর

১১

সন্ধ্যার মধ্যে দেশের ১৭ জেলায় ঝড়ের আশঙ্কা

১২

ইসরায়েল থামতে না থামতেই নতুন উত্তেজনা শুরু যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের

১৩

দেশে স্বর্ণের বাজারে বড় পতন

১৪

পুশইন ঠেকাতে সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতায় ১৭ বিজিবি

১৫

আগুনে পুড়ল ৭ দোকান, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

১৬

দেশে আজ স্বর্ণের বাজারদর

১৭

ময়মনসিংহ-জামালপুর রেল যোগাযোগ বন্ধ

১৮

এই না হলে মেসি? মাঠে নেমে গোল করেই জানিয়ে দিলেন বার্তা

১৯

বিএনপি নেতার মাথা ফাটালেন আরেক নেতা

২০
X