

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা স্বাভাবিকভাবেই স্বস্তি এনে দিয়েছে। শুক্রবার ইসলামাবাদে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে, যা বড় ধরনের যুদ্ধের ঝুঁকি থেকে কিছুটা পিছিয়ে আসার সুযোগ দিচ্ছে। তবে এ মুহূর্তকে চূড়ান্ত সমাধান মনে করা ঠিক হবে না। বিশেষ করে বুধবার বিকেলে খবর আসে যে, ইরান এখনো হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়নি। তাই এটিকে বিরতি হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত, যেখানে একটি কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজা যেতে পারে।
সব পক্ষই নিজেদের সফল দাবি করলেও বাস্তবতা হলো, কেউই এ যুদ্ধে জিতছিল না। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এটিকে সামরিক বিজয় এবং ইরানে শাসন পরিবর্তনের পথে একটি ধাপ হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু যুদ্ধটি ভুল ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, যেখানে ভাবা হয়েছিল এটি দ্রুত শেষ হবে এবং স্পষ্ট ফল পাওয়া যাবে। বাস্তবে এটি অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এতে কোনো শাসন পরিবর্তন হয়নি। বরং একই রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে নতুন, আরও কঠোর নেতৃত্বের উত্থান ঘটেছে। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের কাঠামো অক্ষত রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে তারা বড় ধাক্কা সামলেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারে।
তবে এটাও ঠিক নয় যে, ইরান জয়ী হয়েছে। দেশটি এবং তার সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু তেহরানের দৃষ্টিতে দুর্বল হয়ে পড়া মানেই পরাজয় নয়। ইরান এখনো কার্যকরভাবে কাজ করতে সক্ষম এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে হুমকি তৈরি করতে পারে। হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের প্রভাব, পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা তাদের এখনো আঘাত হানার এবং সীমান্তের বাইরে পরিস্থিতি প্রভাবিত করার ক্ষমতা দেয়। তবে এর মূল্যও তাদের দিতে হবে। যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের চাপ, অর্থনৈতিক সংকট এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর ক্ষোভের মুখে পড়ে ইরানকে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে, যা তাদের আঞ্চলিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন করে তুলতে পারে।
পুরো অঞ্চলে এর প্রভাব দ্রুত এবং বিস্তৃত ছিল। উপসাগরীয় দেশগুলো অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে ক্ষতির মুখে পড়ে, কারণ তারা প্রতিদিন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে ছিল। ইসরায়েল একাধিক দিক থেকে সংঘাত বাড়ার আশঙ্কার মুখে পড়ে। লেবানন ও ইরাকও এ সংঘাতের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে ছিল। এটি সীমাবদ্ধ কোনো সংঘাত ছিল না, বরং পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া একটি যুদ্ধ।
যদি যুদ্ধবিরতি না হতো, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হতো। যেমন খারগ দ্বীপে হামলা করা বা হরমুজ প্রণালি জোর করে খুলে দেওয়ার চেষ্টা করা। এমনকি ট্রাম্প যে বেসামরিক স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েছিলেন, সেটিও বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ছিল, যা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতো। এসব পথই রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে বড় ঝুঁকি তৈরি করত এবং যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে পারত। অন্যদিকে তেহরান এ পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্থায়ী সমাধানের দিকে এগোনোর সুযোগ দেখছিল।
এই ব্যয় ও ক্ষতির মিলিত চাপই ব্যাখ্যা করে কেন এ মুহূর্তে একটি যুদ্ধবিরতি হয়েছে। তবে এটাও স্পষ্ট করে যে, এ বিরতিকে স্থায়ী চুক্তিতে রূপ দেওয়া কতটা কঠিন হবে। সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলো এখন ইসলামাবাদে আলোচনায় উঠবে। আলোচনার মূল কেন্দ্রে রয়েছে বিশ্বাসের প্রশ্ন এবং বাস্তব বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র কি ভবিষ্যতে আবার হামলা না করার নির্ভরযোগ্য আশ্বাস দিতে পারবে, এবং ইরান কি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে হুমকি দেওয়ার ক্ষমতার ওপর সীমা মেনে নেবে কি না।
নিষেধাজ্ঞা শিথিল করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে কোনো চুক্তি কার্যকর করতে হলে উভয়পক্ষের জন্য উত্তেজনা কমানোকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করতে হবে। চীন, ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্যের মতো বাহ্যিক পক্ষগুলো এ প্রক্রিয়ায় গ্যারান্টর হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আলোচনার একটি প্রধান বিষয় হিসেবেই থাকবে। ছয় সপ্তাহ আগে জেনেভায় হওয়া আলোচনার ধারাবাহিকতায় তেহরানকে সমঝোতার ইচ্ছা দেখাতে হবে। যেমন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে কম ঘনত্বে রূপান্তর করা, যাতে তা অস্ত্র তৈরির জন্য কম উপযোগী হয়, অথবা আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের আবার দেশে কাজ করার সুযোগ দেওয়া। একই সঙ্গে ইরান চাইবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার স্বীকার করুক। এসব পদক্ষেপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কতটা বাস্তবসম্মতভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে প্রস্তুত, সেটিই নির্ধারণ করবে কোনো চুক্তি টিকে থাকবে কি না এবং নিজ দেশের ভেতরে তা কতটা গ্রহণযোগ্য হবে।
একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় হলো বৃহত্তর আঞ্চলিক দিকটি উপেক্ষিত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ইরান চায় এ যুদ্ধবিরতি লেবানন পর্যন্ত বিস্তৃত হোক, কারণ তারা এটিকে একই সংঘাতের অংশ হিসেবে দেখে। কিন্তু ইসরায়েল স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের অভিযান এ যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত নয় এবং তারা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। উপসাগরীয় দেশগুলোও চায় এমন নিশ্চয়তা, যাতে তাদের অবকাঠামো ও জাহাজ চলাচলের পথ বারবার চাপের মুখে না পড়ে। তারা নিজেদের ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণও দাবি করেছে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যৌক্তিক দাবি তুলেছে। অন্যদিকে ইসরায়েল এমন কোনো ব্যবস্থার প্রতি গভীর সন্দেহ পোষণ করে, যেখানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, পারমাণবিক ও আঞ্চলিক সামরিক সক্ষমতা অক্ষত থাকে। যদি ইসলামাবাদের আলোচনা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের স্বার্থে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা সাময়িকভাবে সংকট কমাতে পারলেও বৃহত্তর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা আবারও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এদিকে অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়তে থাকায় এবং আলোচনার ওপর নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকায় যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। এটি নতুন হুমকি, হরমুজ প্রণালিতে চাপ বৃদ্ধি, ধাপে ধাপে হামলা বা আলোচনার সময়সীমা দীর্ঘায়িত হওয়ার মাধ্যমে ঘটতে পারে।
এ যুদ্ধবিরতিকে সংকটের শেষ হিসেবে নয়; বরং একটি নতুন ও অনিশ্চিত পর্যায়ের শুরু হিসেবে দেখা উচিত। ইসলামাবাদের আলোচনা থেকে যে ফলই আসুক, তা হয়তো স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারবে না। কিন্তু বিকল্প পথ, অর্থাৎ আবার সংঘাত বাড়ার দিকে ফিরে যাওয়া, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর। সময় খুব সীমিত, আর এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এ সুযোগটিকে ধরে রাখতে চায় কি না।
লেখক: চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন তহমিনা মিলি