

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও সংঘাত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বৈরিতা, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক বারবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সীমিত সামরিক সংঘর্ষ ও পাল্টা প্রতিক্রিয়ার পর যে যুদ্ধবিরতির আলোচনা শুরু হয়, তা বিশ্বজুড়ে সাময়িক স্বস্তি এনে দিলেও এর স্থায়িত্ব নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক শুধু দুই দেশের বিষয় নয়; বরং তা বৈশ্বিক শান্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে বর্তমান ‘যুদ্ধবিরোধী’ বা উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে ইতিহাস, বর্তমান সংঘাত, এবং কূটনৈতিক বাস্তবতা—এ তিনটি দিক একসঙ্গে দেখতে হয়। ঐতিহাসিক পটভূমি বিবেচনায় ইরান যেন জন্মেই ছিল স্বাধীনভাবে পথ চলার জন্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার প্রায় ছয় বছর পর অর্থাৎ ১৯২৫ সালে পাহলভি রাজবংশের গোড়াপত্তন ঘটে। এই বংশের সম্রাট মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি ১৯৪১ সাল থেকে আমেরিকার প্রিয়ভাজন রূপে ইরান শাসন করতে থাকেন এবং আমেরিকাকে নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা দিতে থাক। ১৯৭৯ সালে কট্টরপন্থি মুসলমানগোষ্ঠী বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটিয়ে ইরানে ইসলামিক সরকার প্রতিষ্ঠা করে। মূলত এর পর থেকেই আমেরিকার সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে এবং একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। ইরানকে কাবু করতে আমেরিকা ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং আমেরিকায় থাকা ইরান সরকার ও বহু ইরানি কোম্পানির সম্পদ জব্দ করে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ইরান আমেরিকাকে ‘শত্রু শক্তি’ হিসেবে দেখে এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি গড়ার প্রেক্ষাপটে চীন ও রাশিয়ার সাহায্য নিয়ে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে থাকে।
একপর্যায়ে ইরান পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করতে চাইলে দ্বন্দ্ব ও উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়, যা বর্তমান সংঘাতের কারণ বলে দাবি আমেরিকার। নিকট অতীতে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে এবং গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে বিবেচনা করে আমেরিকা জয়েন্ট কম্প্রেহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (Joint Comprehensive Plan of Action) প্রণয়ন কর। তবে রহস্যজনক কারণে পরে আমেরিকা তা থেকে বের হয়ে যায়। এখান থেকেই নতুন করে উত্তেজনার সূত্রপাত। একদিকে ইরান চায় মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব বাড়াতে। আর আমেরিকা চায় ইরানকে সীমিত রাখতে। ফলে প্যালেস্টাইন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেনসহ বহু স্থানে ইরান সরাসরি যুদ্ধ না করে প্রক্সি যুদ্ধ চালিয়ে যায় এবং হামাস, হিজবুল্লাহ, হুতিসহ বিভিন্ন সংগঠনকে গোপনে সহায়তা করে আমেরিকান বলয়ে প্রভাব খাটায়। এতে সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই সংঘাত চলতে থাকে। এর মধ্যে ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর ব্যাপক হামলা চালায়। হামলার শুরুতেই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। এর জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা চালায়। লড়াই দ্রুত তীব্র আকার ধারণ করে এবং লেবানন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে উভয় পক্ষেই হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে থাকে। এরপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ৭ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন প্রথম হামলা চালায়, তখন তারা রাজধানী তেহরান এবং দেশজুড়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো, সামরিক ঘাঁটি এবং নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, যিনি ১৯৮৯ সাল থেকে দেশটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন, প্রথম দফার হামলায় তিনি ছাড়াও শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর আরও কয়েক ডজন শীর্ষস্থানীয় নেতাও নিহত হয়েছেন বলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছ।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘যুদ্ধবিরোধী’ অবস্থার অর্থ হলো, আমেরিকা ও ইরান সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ চায় না। কারণ উভয়েই উপলব্ধি করে যে, এই যুদ্ধ খুব ব্যয়বহুল এবং এমন জোর করতে থাকলে পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে যাবে। তাই তারা সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে যেতে চাইলেও চাপ ও প্রতিযোগিতা চালিয়ে যায়। এটাকে ‘যুদ্ধ নয় আবার শান্তিও নয়’ (‘No war, no peace’) পরিস্থিতি বলা চলে। বাস্তবতা হলো, বর্তমান যুদ্ধবিরোধী অবস্থার পেছনে রয়েছে বিশ্বজুড়ে প্রবল অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক চাপ, বিশ্ব শক্তিগুলো বিশেষত ইউরোপ, চীন ও রাশিয়ার এই যুদ্ধবিরোধী অবস্থান, তেলের বাজারে অস্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক ঝুঁকি, ইসরাইলের সঙ্গে বড় যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ইত্যাদি।
এই সময়ে সরাসরি যুদ্ধ নেই কিন্তু ছোট ছোট সংঘর্ষ আছ। ড্রোন হামলা, প্রক্সি গোষ্ঠীর আক্রমণ, সমুদ্রপথে উত্তেজনা, লেবাননে ইসরায়েলিদের আক্রমণে তিন শতাধিক মানুষের মৃত্যু শান্তির পথে অন্তরায় হয়ে উঠেছে। তাই এ অবস্থানকে স্থায়ী শান্তি নয়, আবার পুরোপুরি যুদ্ধও নয়; বরং নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা বলা যায়। উভয় পক্ষ যুদ্ধ এড়াতে চায় কিন্তু নিজেদের স্বার্থ ছাড়তে চায় না। তারা এমন অবস্থায় আছে, যেখানে যে কোনো সময় যুদ্ধের সম্ভাবনা আছে; কিন্তু তারা তা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
অনেকের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি চলছে, সেটি স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম; বরং পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে যে কোনো সময় ভেঙেও যেতে পারে। তাদের মতে, বৰ্তমান যুদ্ধবিরতি খুবই ভঙ্গুর (highly fragile)। এটি স্থায়ী শান্তি নয়; বরং সাময়িক বিরতি (temporary pause)। সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা সময় কেনা (buying time) বা অনিশ্চিত বিরতি (uncertain pause), যা মুহূর্তেই ভেঙে যেতে পারে।
কারণ এখানে সামরিক ও গভীর ভূরাজনৈতিক বিরোধ জড়িত, যার অন্যতম ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং নিরাপত্তা উদ্বেগ, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, ক্ষতিপূরণ, আটক সম্পদ অবমুক্তি ইত্যাদি। উভয় পক্ষ একে অন্যকে সহজে বিশ্বাস করে না। অতীতে অনেক চুক্তি হলেও পরিস্থিতি ও আস্থা সংকটের কারণে তা টেকেনি। আবার প্রক্সি সংঘাত (Proxy conflicts) তথা ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী বনাম যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের সংঘর্ষ শান্তির বদলে বড় যুদ্ধের কারণ হতে পারে। আকস্মিক কোনো হামলা, ড্রোন আক্রমণ বা জাহাজে আঘাতের মতো একটিমাত্র ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেও যুদ্ধ আবার শুরু হতে পার। তাই বলা যায়, যুদ্ধ আসলে থামেনি—শুধু কমেছে। সরাসরি যুদ্ধ কমলেও পরোক্ষ সংঘর্ষ চলছে। বিশেষ করে লেবাননে হামলা (ইসরায়েল বনাম হিজবুল্লাহ) এরই মধ্যে যুদ্ধবিরতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
হরমুজ প্রণালি (Strait of Hormuz) এখনো সংকটের কেন্দ্র। বিশ্বের ২০-২৫% তেল এই পথে যায়। কিন্তু এখনো জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়নি এই জলসীমায়। বাংলাদেশের জাহাজসহ শত শত জাহাজ আটকে আছে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের জন্য ইরানের অনুমতি না পাওয়ায়। আমেরিকা চায় ইরান বিনা শর্তে এই জলপথ খুলে দিক। ইরান নিয়ন্ত্রণ রাখতে চায়। এই হরমুজ ইস্যুই সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক যুদ্ধের ঝুঁকি বলে বিবেচ্য। এ ছাড়া অন্যান্য অমীমাংসিত সমস্যার মধ্যে রয়েছে ইরানের ওপর পারমাণবিক কর্মসূচি নিষেধাজ্ঞা (sanctions),
ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক প্রভাব ইত্যাদি। অর্থাৎ মূল সমস্যা (root causes) ঠিকই রয়ে গেছে।
এমনই এক প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান সরাসরি যুদ্ধ না করে প্রক্সি হামলা বাড়াতে পারে। এতে আমেরিকার মিত্রদের ওপর আঘাত আসবে। ফলে যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক চাপ পরিস্থিতিকে অস্থির করছে। তেলের দাম হঠাৎ ওঠানামা করছে এবং বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভেঙে পড়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা। উভয় পক্ষই সামরিকভাবে প্রস্তুত। আমেরিকা সেনা ও নৌবাহিনী মোতায়েন রেখেছে। ইরানও তার অবস্থান ধরে রেখেছে। অর্থাৎ কোনো পক্ষই ‘দুর্বল’ নয়।
বিভিন্ন থিঙ্কট্যাঙ্ক অনুমান করছে যে, যুদ্ধবিরতি কিছুদিন চলবে, যার সম্ভাবনা ৫০-৬০ শতাংশ। সীমিত সংঘর্ষ আবার শুরুর সম্ভাবনা ৩০-৪০ শতাংশ। আর পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ আবার শুরুর সম্ভাবনা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। বৰ্তমান সময়টি তাই পরবর্তী পর্বের আগে বিরতি (‘pause before next phase’) হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে আশাবাদী মানুষের ধারণা, উভয় পক্ষই খরচ ও ক্ষতির কারণে বড় আকারের যুদ্ধ এড়াতে চায়। এর ওপর রয়েছে ইউরোপ ও জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক চাপ। যুদ্ধ নয়, শান্তির বার্তা নিয়ে বাংলা নববর্ষের সূচনা হোক, এটাই প্রার্থনা।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট