কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৪৯ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সম্পাদকীয়

নদী রক্ষায় নতুন আশা

নদী রক্ষায় নতুন আশা

বাংলাদেশের নদী, খাল ও উপকূলীয় জলাধার শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এ দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের মূল ভিত্তি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দখল, দূষণ এবং অব্যবস্থাপনার কারণে এসব জলাধার ক্রমাগত সংকুচিত ও বিপন্ন হয়ে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে শক্তিশালী ও কার্যকর করতে আইন সংশোধনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী এবং গুরুত্বপূর্ণ।

প্রস্তাবিত ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ খসড়ায় নদী দখল ও দূষণকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং এর জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা একটি বড় অগ্রগতি। এতদিন নদী রক্ষা কমিশন কেবল সুপারিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় বাস্তবায়নে নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। নতুন প্রস্তাবে তদন্ত, অভিযান পরিচালনা, মামলা দায়ের এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ের ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি কমিশনকে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে পারে।

সব নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ও ‘আইনগত অভিভাবকত্বের’ আওতায় আনার প্রস্তাবটিও বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। এতে নদীর ক্ষতিকে সরাসরি আইনি ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করা সহজ হবে এবং পরিবেশগত ন্যায়বিচারের পথ সুগম হবে। বিশ্বে বিভিন্ন দেশে এমন ধারণা এরই মধ্যে কার্যকর হয়েছে এবং তা পরিবেশ সংরক্ষণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

তবে এ আইনের কার্যকারিতা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে দেখা গেছে, আইন থাকলেও প্রভাবশালী দখলদার ও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রায়ই কঠিন হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এ সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। তাই নতুন আইনে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও তা প্রয়োগে যদি দৃঢ়তা না থাকে, তাহলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাবে না।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এখতিয়ার নিয়ে সম্ভাব্য দ্বন্দ্ব। পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের মতো সংস্থাগুলোর ক্ষমতা হ্রাস পেলে সমন্বয়ের অভাব তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতি এড়াতে একটি সুস্পষ্ট কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে দায়িত্ব বণ্টন পরিষ্কার থাকবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। অন্যথায় আইনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পরিবর্তে প্রশাসনিক জটিলতা বাড়ার আশঙ্কা থাকবে।

নদীকে সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বিচার এবং বিশেষ নদী আদালত গঠনের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা গেলে দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে কমিশনের অনাপত্তি বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি নদী তীরবর্তী অবকাঠামো নির্মাণে শৃঙ্খলা আনতে সহায়ক হবে।

তবে আইনের পাশাপাশি প্রয়োজন ধারাবাহিক মনিটরিং, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং জনসম্পৃক্ততা। নদী রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, নাগরিকদেরও। নদীকে ‘পাবলিক ট্রাস্ট প্রোপার্টি’ হিসেবে ঘোষণা করার প্রস্তাব এই দৃষ্টিভঙ্গিকে শক্তিশালী করে, যেখানে জনগণও এ সম্পদের রক্ষক হিসেবে ভূমিকা রাখবে।

সব মিলিয়ে, প্রস্তাবিত সংশোধনী আইনটি নদী রক্ষা কমিশনকে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এটি কেবল একটি আইনি কাঠামো নয়, বাস্তবায়নের মাধ্যমে এর সাফল্য নির্ধারিত হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এ আইন বাংলাদেশের নদী ও জলাধার রক্ষায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায় এটি কাগজে সীমাবদ্ধ আরেকটি উদ্যোগ হিসেবে থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইসরায়েল থামতে না থামতেই নতুন উত্তেজনা শুরু যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের

দেশে স্বর্ণের বাজারে বড় পতন

পুশইন ঠেকাতে সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতায় ১৭ বিজিবি

আগুনে পুড়ল ৭ দোকান, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

দেশে আজ স্বর্ণের বাজারদর

ময়মনসিংহ-জামালপুর রেল যোগাযোগ বন্ধ

এই না হলে মেসি? মাঠে নেমে গোল করেই জানিয়ে দিলেন বার্তা

বিএনপি নেতার মাথা ফাটালেন আরেক নেতা

হাউসবোট ও নৌ-শ্রমিকদের হাতাহাতি, নদীতে পড়ে যুবকের মৃত্যু

বাহরাইন ও জর্ডানে মার্কিন স্থাপনায় হামলার দাবি ইরানের

১০

বিশ্বকাপ শুরুর একদিন আগেই বড় জয় আর্জেন্টিনার

১১

মাঠে নেমেই মেসির ঝলক, পেনাল্টিতে এগিয়ে আর্জেন্টিনা

১২

ঝড়ে লন্ডভন্ড ৩ গ্রাম

১৩

পাল্টা হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া জবাব দিল ইরান

১৪

অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের ঘটনায় ইরানে হামলার পক্ষে ট্রাম্প

১৫

প্রথমার্ধে ১-০ গোলে এগিয়ে আর্জেন্টিনা

১৬

এক মাস আগে লিবিয়ায় আলমগীরকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা

১৭

উচ্ছেদ অভিযান চসিকের, দখল অভিযান হকারের

১৮

দুপুরের মধ্যে দেশের ১২ অঞ্চলে ঝড় ও বজ্রবৃষ্টির আশঙ্কা

১৯

অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ইস্যুতে জবাব দিল ইরান

২০
X