

অনেক সময় ‘ভালো মানুষ’রাই সাদা টুপি পরে থাকেন। আমি যাকে ‘ভালো মানুষ’ বলছি, তিনি হলেন ক্যাথলিক চার্চের মার্কিন বংশোদ্ভূত নেতা পোপ লিও চতুর্দশ, যিনি প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের ধর্মীয় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার মাথায় যে সাদা টুপি থাকে, সেটিকে বলা হয় জুকেত্তো। এটি তার কর্তৃত্ব ও বিনয়ের প্রতীক।
সম্প্রতি লিও তার এই কর্তৃত্ব ব্যবহার করছেন এক ধরনের শান্ত ও সংযত ভঙ্গিতে, এমন একজনের মুখোমুখি হতে, যাকে অনেক আগেই চ্যালেঞ্জ করা উচিত ছিল। সেই ব্যক্তি হলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার কূটনীতির ধরন হলো বিশ্বজুড়ে ঘুরে বেড়িয়ে অশালীন ও হুমকিমূলক ভাষায় কথা বলা, যাতে অন্য দেশের নেতারা ভয় পেয়ে তার কাছে নতি স্বীকার করেন। অনেক বছর ধরে এ কৌশল কাজ করেছে। বহু রাষ্ট্রপ্রধান তাকে চ্যালেঞ্জ করার বদলে শান্ত রাখার পথ বেছে নিয়েছেন। তাদের ধারণা ছিল, ট্রাম্পের অহংকে সন্তুষ্ট করলে তার রাগ কমবে। কিন্তু এতে তিনি আরও উৎসাহিত হয়েছেন। কারণ, একজন বুলির মতোই তিনি দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে ভালোবাসেন। লিও এই নীতি মানেন না। তিনি মনে করেন, ভয় দেখানো বা তুষ্ট করা কোনো সমাধান নয়।
অনেক রাজনীতিক যেখানে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলেন, সেখানে লিও স্পষ্ট ও সরাসরি অবস্থান নিয়েছেন। তিনি এ বিপর্যয়কর যুদ্ধের পেছনের নেতাদের প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি শুধু পোপ ফ্রান্সিসের পথ অনুসরণ করেননি; বরং অন্যায় ও কষ্টের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন।
পশ্চিমা অনেক নেতা যেখানে ট্রাম্পের কঠোর বক্তব্যের সমালোচনা করতে দ্বিধা করেছেন, সেখানে লিও কোনো দ্বিধা ছাড়াই তার আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের পুরো জনগণের বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়া সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। তিনি সবাইকে আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নিরীহ মানুষের কথা গভীরভাবে চিন্তা করে।
স্বাভাবিকভাবেই তার এ বক্তব্যে ট্রাম্প ও তার সমর্থকরা অস্বস্তি বোধ করেছে। তাদের কাছে নিরীহ মানুষের কষ্ট নিয়ে ভাবা যেন অচেনা বিষয়। তারা ইরানের ওপর হামলাকে একটি ধর্মীয় যুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। কিন্তু লিও এ ধারণাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
রোববারের প্রার্থনায় তিনি বলেন, তিনি যে ঈশ্বরকে মানেন, তিনি যুদ্ধ সমর্থন করেন না। যারা যুদ্ধ করে তাদের প্রার্থনাও তিনি গ্রহণ করেন না। তাদের হাত রক্তে ভরা। তিনি বলেন, আমাদের ঈশ্বর শান্তির প্রতীক, যাকে ব্যবহার করে কেউ যুদ্ধকে বৈধতা দিতে পারে না। যারা যুদ্ধ করে তাদের প্রার্থনা তিনি শোনেন না। লিও সরাসরি কারও নাম বলেননি, তবে তার বক্তব্য যে যুদ্ধ সমর্থনকারীদের উদ্দেশে ছিল, তা স্পষ্ট। তিনি শুধু ট্রাম্প নন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকেও সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, চারপাশে এক ধরনের সীমাহীন ক্ষমতার ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়েছে, যা ক্রমেই অনির্দেশ্য ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে।
তার মতে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু যেন একই মানসিকতার দুই মানুষ, যারা ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন এবং যুদ্ধের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহী। লিও তাদের আহ্বান জানান সহিংসতা বন্ধ করতে। তিনি বলেন, এখন শান্তির সময়। আলোচনার টেবিলে বসতে হবে, অস্ত্র ও ধ্বংসের পরিকল্পনার টেবিলে নয়। তিনি আরও বলেন, শক্তির প্রদর্শন যথেষ্ট হয়েছে, যুদ্ধও যথেষ্ট হয়েছে। প্রকৃত শক্তি জীবনের সেবা করার মধ্যেই প্রকাশ পায়।
ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশিতভাবেই ছিল কঠোরতা ও আত্মপ্রচারভিত্তিক আচরণের প্রতিফলন। একটি তিক্ত বৈঠকে পেন্টাগনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ভ্যাটিকানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধির কাছে পরোক্ষভাবে হুমকি দেন।
খবরে বলা হয়েছে, কার্ডিনাল ক্রিস্টোফ পিয়েরকে জানানো হয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন সামরিক শক্তি আছে, যা দিয়ে তারা যা খুশি করতে পারে এবং চার্চের উচিত তাদের পক্ষ নেওয়া। এ ধরনের খোলামেলা ও নিয়ন্ত্রণহীন শত্রুতার মুখেও পোপ লিও পিছিয়ে যাননি। বরং তিনি এই অহংকারী আচরণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তার জবাব ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু দৃঢ়।
তিনি বলেন, তিনি ট্রাম্প প্রশাসনকে ভয় পান না এবং তিনি বিশ্বাস করেন তার দায়িত্ব হলো ধর্মের বার্তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা, যেমনটি চার্চেরও দায়িত্ব। একদিকে যখন চাপে থাকা এক প্রেসিডেন্ট দুর্বলতার কথা বলে অভিযোগ করছেন, অন্যদিকে লিও তার কথা ও কাজের মাধ্যমে দেখিয়েছেন প্রকৃত শক্তি নৈতিক স্পষ্টতায় নিহিত, ক্ষমতা বা সম্পদের পেছনে ছোটা নয়। এই সংঘাতের প্রকৃতি আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে যখন ট্রাম্প নিজেকে খ্রিষ্টের রূপে দেখিয়ে একটি ছবি পোস্ট করেন এবং পরে তা মুছে ফেলেন। এটি ছিল নিজেকে অতিরঞ্জিতভাবে তুলে ধরার একটি ব্যর্থ চেষ্টা এবং তার অহংকারের স্পষ্ট উদাহরণ।
এমন একজন মানুষের কাছ থেকে এটি এসেছে, যার জীবন ও আচরণ সেই মূল্যবোধের সম্পূর্ণ বিপরীত, যেগুলো তিনি নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে চান। এই দ্বন্দ্বে পার্থক্য খুব স্পষ্ট। একদিকে শক্তি প্রদর্শনের পরিচিত ধারা, অন্যদিকে সহনশীলতা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে মর্যাদা রক্ষার বার্তা। একজন বুলির কাছে অস্ত্র ও ক্ষমতা থাকতে পারে, কিন্তু এবার তিনি এমন একজনের মুখোমুখি হয়েছেন যাকে ভয় দেখিয়ে, কিনে বা চাপে ফেলে নীরব করা যাবে না।
এবং মনে হয়, এ বিষয়টিই ডোনাল্ড ট্রাম্প সহ্য করতে পারেন না।
লেখক: আল জাজিরার কলামিস্ট। আল জাজিরায় প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ