জাসিম আল আজ্জাওয়ি
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৭ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ইরান যুদ্ধের তিনটি সময়চক্র

ইরান যুদ্ধের তিনটি সময়চক্র

প্রতিটি সংঘাতে সময়ের গুরুত্ব অস্ত্রের মতোই বড়। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে উপসাগরীয় এ যুদ্ধও তার ব্যতিক্রম নয়। সরাসরি প্রতিপক্ষের পাশাপাশি এ তিন পক্ষই সময়ের সঙ্গেও লড়ছে। প্রত্যেকে ভিন্ন রাজনৈতিক সময়সীমার মধ্যে কাজ করছে এবং আলাদা চাপের মুখে রয়েছে।

ওয়াশিংটন: মধ্যবর্তী নির্বাচনের চাপ

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফিরে দ্রুত কূটনীতির একটি ধারণা নিয়ে এগোতে চেয়েছিলেন। তিনি যুদ্ধের বদলে সমঝোতার পথে দ্রুত ফল চান। স্টিভ উইটকফকে ওমানে পাঠিয়ে ৬০ দিনের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করেন। তার বিশ্বাস ছিল, ইরানের নেতৃত্বের ওপর হঠাৎ ও শক্তিশালী চাপ সৃষ্টি করলে কয়েকদিনের মধ্যেই শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। এ ধারণা তাকে দেওয়া হয়েছিল ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা এবং নেতানিয়াহুর পক্ষ থেকে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।

এ দ্রুত সাফল্য না আসায় যুক্তরাষ্ট্র এমন এক দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, যেখানে সময় ইরানের পক্ষে কাজ করছে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন মিয়ারশাইমার সরাসরি বলেছেন, ট্রাম্প একটি বড় ধরনের ভুল করেছেন। সমস্যাটি কাঠামোগত। ইরান হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর বড় প্রভাব রাখতে পারে এবং উপসাগরীয় দেশ ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করার সক্ষমতাও তাদের রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য স্পষ্ট কোনো বের হওয়ার পথ নেই।

দেশের ভেতরে এর রাজনৈতিক মূল্য এরই মধ্যে বড় হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে তেলের দাম ছিল ৬৭ ডলার, তা বেড়ে ৯০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। মার্চ মাসে মুদ্রাস্ফীতি বার্ষিক হারে ৩ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে। জ্বালানির দাম ২১ শতাংশের বেশি বেড়েছে এবং ভোক্তা মূল্য সূচকের বৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে জ্বালানি খাত থেকে। ট্রাম্পের অর্থনৈতিক জনপ্রিয়তা রেকর্ড সর্বনিম্ন ২৯ শতাংশে নেমে এসেছে। এমনকি রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যেও ৪০ শতাংশ এখন মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় তার ভূমিকা নিয়ে অসন্তুষ্ট। মধ্যবর্তী নির্বাচনের সাত মাস আগে তিনি একটি কঠিন অবস্থায় রয়েছেন। তার জনপ্রিয়তা কমছে এবং তিনি এমন একটি যুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা জনগণের কাছে জনপ্রিয় নয়। যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও জ্বালানির উচ্চমূল্যের প্রভাব নির্বাচনের সময় পর্যন্ত থেকে যেতে পারে। এতে কংগ্রেসে অল্প ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা রিপাবলিকানদের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে। সবচেয়ে বড় প্রহসন হলো, যিনি দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনিই হয়তো নতুন এক বড় জ্বালানি সংকটের সূচনা করেছেন। এক রিপাবলিকান কৌশলবিদ সতর্ক করে বলেছেন, যেসব কারণে জো বাইডেন রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, সেগুলোই এখন ট্রাম্প ও তার দলের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

তেহরান: জ্বলন্ত কয়লা হাতে ধরে রাখা

ইরানের হিসাবও সময়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত, তবে ভিন্নভাবে। যেখানে ট্রাম্প দ্রুত সমাধান চান, সেখানে তেহরানের টিকে থাকার কৌশল নির্ভর করছে দীর্ঘসময় ধরে টিকে থাকার ওপর। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এ যুদ্ধ ইরানের ওপর ব্যাপক ক্ষতি ডেকে এনেছে। সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি এবং শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের মৃত্যু, পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা এবং বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা সত্ত্বেও শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। অধ্যাপক জন মিয়ারশাইমার মনে করেন, ইরানের বিশাল ভৌগোলিক বিস্তার এবং ছড়িয়ে থাকা সামরিক সম্পদের কারণে দ্রুত হামলার মাধ্যমে দেশটিকে দুর্বল করা কঠিন। দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালিয়েও তাদের সক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া সম্ভব নয়। ইরান এখনো শক্তিশালী প্রতিরোধ ক্ষমতা ধরে রেখেছে। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের নেটওয়ার্ক দীর্ঘ সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ জেফ্রি স্যাক্স এই যুদ্ধকে শুরু থেকেই কৌশলগতভাবে ভুল বলে মনে করেন। তার মতে, ট্রাম্প আগে যে চুক্তি ছিল, সেটি নিজেই বাতিল করেন, যা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত রেখেছিল। এরপর তিনি সেই ধর্মীয় নেতাকে হত্যা করেন, যিনি দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক অস্ত্রকে ইসলামবিরোধী বলে ঘোষণা করেছিলেন। এর পরিণতিতেই এখন একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ চলছে। ইরান যেন জ্বলন্ত কয়লা হাতে ধরে রেখেছে। এতে প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু তারা হাত ছাড়ছে না। তাদের কৌশল হলো দীর্ঘসময় ধরে চাপ সহ্য করা, যতক্ষণ না যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের রাজনৈতিক চাপ বাড়ে। তেলের দাম যদি ১০০ ডলারের ওপরে থাকে এবং ১৫০ ডলারে পৌঁছে যায়, তাহলে ট্রাম্পের দরকষাকষির শক্তি কমে যেতে পারে, কারণ জ্বালানির বাড়তি দামে তার জনপ্রিয়তা আরও কমবে। স্যাক্স সতর্ক করেছেন, যদি হরমুজ প্রণালি দীর্ঘসময় বন্ধ থাকে, তাহলে বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের জ্বালানি সংকট তৈরি হবে। কারণ এ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এবং প্রায় ৩০ শতাংশ তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়।

তেল আবিব: যে যুদ্ধ শেষ হওয়া চলবে না

ইসরায়েলের সময়ের হিসাব যুক্তরাষ্ট্রের ঠিক বিপরীত। নেতানিয়াহু নিজ দেশে আইনি জটিলতা এবং কয়েক মাস পরের নির্বাচন সামনে রেখে এমন অবস্থায় আছেন, যেখানে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াই তার জন্য সুবিধাজনক। যুদ্ধ হলে সমালোচকরা দুর্বল হয়ে পড়ে, জনগণ জাতীয় পতাকার নিচে একত্রিত হয় এবং লেবাননসহ অন্যান্য জায়গায় তার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা হওয়ার পরও নেতানিয়াহুর দপ্তর জানিয়ে দেয়, এ যুদ্ধবিরতি লেবাননের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

হা’রেতজ পত্রিকার অভিজ্ঞ লেখক গিডিয়ন লেভি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, নেতানিয়াহুর জন্য সামরিক শক্তি শুধু একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার নয়, এটি তার চিন্তার মূল ভিত্তি। তার মতে, ইসরায়েলে যুদ্ধই প্রথম পছন্দ, শেষ উপায় নয়। তিনি উল্লেখ করেন, সেখানে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সামরিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, আর কূটনীতিকে গুরুত্ব কম দেওয়া হয়। ইসরায়েলের ভেতরে এ যুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ খুব কম। জনমতে যুদ্ধের পক্ষে প্রবল সমর্থন দেখা যাচ্ছে।

সাবেক শান্তি আলোচক ড্যানিয়েল লেভি নেতানিয়াহুর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য সম্পর্কে বলেছেন, তিনি আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে এবং নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের দিকে এগোচ্ছেন। তার কৌশল অনেকটা এখনই সুযোগ কাজে লাগানোর মতো। তিনি এমন অবস্থান নিতে প্রস্তুত, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমিয়ে দিতে পারে এবং সেখানে ইসরায়েলের ঐতিহ্যগত সমর্থনও দুর্বল করে দিতে পারে।

তিনটি সময়চক্র, ভিন্ন পথে এগোচ্ছে

এ সংঘাতকে এত বিস্ফোরক করে তুলেছে একটি বিষয়, তিনটি পক্ষ ভিন্ন সময়ের হিসাব নিয়ে এগোচ্ছে। ট্রাম্প নভেম্বরের আগেই একটি সমাধান চান। ইরান চায় নভেম্বর পর্যন্ত টিকে থাকতে। আর নেতানিয়াহু চান যুদ্ধ যতটা সম্ভব দীর্ঘসময় ধরে চলুক, যাতে লেবাননের পরিস্থিতি নিজেদের মতো করে গড়ে নিতে পারেন, হিজবুল্লাহকে দুর্বল করতে পারেন এবং নির্বাচনের সময় জাতীয়তাবাদের আবরণে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারেন।

জন মিয়ারশাইমার তার স্বভাবসুলভ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, প্রথম আঘাতের পর টিকে থাকতে পারা, শাসনব্যবস্থা অটুট রাখা এবং যথেষ্ট সামরিক শক্তি ধরে রাখার মাধ্যমে ইরান এ যুদ্ধে এগিয়ে আছে। তার মতে, শেষ পর্যন্ত যে সমাধান হবে, তা এ বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করবে। জেফ্রি স্যাক্স আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করলেও যে ইরান যুদ্ধবিরতির জন্য মরিয়া, বাস্তবে হোয়াইট হাউসই বেশি আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে এ সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে।

শেষ পর্যন্ত এ সংঘাতে সময়ই এমন একটি শক্তি হয়ে উঠতে পারে, যাকে বোমা মেরে, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বা কৌশলে পরাজিত করা সম্ভব নয়। পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ভর করবে তাদের ওপর, যারা এ বাস্তবতা বুঝতে পারবে এবং এর চাপ সহ্য করার মতো রাজনৈতিক শক্তি রাখবে। বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, মনে হচ্ছে সময় সবচেয়ে দ্রুত ফুরিয়ে আসছে ওয়াশিংটনের জন্য।

লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক ও সাংবাদিক। সংবাদ উপস্থাপক, অনুষ্ঠান সঞ্চালক এবং গণমাধ্যম প্রশিক্ষক। ‘ইনসাইড ইরাক’ নামে একটি সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন। আলজাজিরায় প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইসরায়েল থামতে না থামতেই নতুন উত্তেজনা শুরু যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের

দেশে স্বর্ণের বাজারে বড় পতন

পুশইন ঠেকাতে সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতায় ১৭ বিজিবি

আগুনে পুড়ল ৭ দোকান, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

দেশে আজ স্বর্ণের বাজারদর

ময়মনসিংহ-জামালপুর রেল যোগাযোগ বন্ধ

এই না হলে মেসি? মাঠে নেমে গোল করেই জানিয়ে দিলেন বার্তা

বিএনপি নেতার মাথা ফাটালেন আরেক নেতা

হাউসবোট ও নৌ-শ্রমিকদের হাতাহাতি, নদীতে পড়ে যুবকের মৃত্যু

বাহরাইন ও জর্ডানে মার্কিন স্থাপনায় হামলার দাবি ইরানের

১০

বিশ্বকাপ শুরুর একদিন আগেই বড় জয় আর্জেন্টিনার

১১

মাঠে নেমেই মেসির ঝলক, পেনাল্টিতে এগিয়ে আর্জেন্টিনা

১২

ঝড়ে লন্ডভন্ড ৩ গ্রাম

১৩

পাল্টা হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া জবাব দিল ইরান

১৪

অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের ঘটনায় ইরানে হামলার পক্ষে ট্রাম্প

১৫

প্রথমার্ধে ১-০ গোলে এগিয়ে আর্জেন্টিনা

১৬

এক মাস আগে লিবিয়ায় আলমগীরকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা

১৭

উচ্ছেদ অভিযান চসিকের, দখল অভিযান হকারের

১৮

দুপুরের মধ্যে দেশের ১২ অঞ্চলে ঝড় ও বজ্রবৃষ্টির আশঙ্কা

১৯

অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ইস্যুতে জবাব দিল ইরান

২০
X