

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র দৃশ্যত গণতান্ত্রিক বিশ্বকে পৃষ্ঠপোষকতা দিত বলে ধারণা করা হয় এবং রাশিয়া ও চীন সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পক্ষে অবস্থান নিত।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন ১৯১৭ সালে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জড়ান, তখন তিনি কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে বলেছিলেন, ‘পৃথিবীকে গণতন্ত্রের জন্য নিরাপদ করে তুলতে হবে।’ তার এ আদর্শ অনুযায়ী, স্বৈরতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে বিশ্বের ছোট-বড় সব জাতিকে নিজেদের সরকার ব্যবস্থা বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। তবে বাস্তব ক্ষেত্রে, আদর্শগতভাবে গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র সবসময় তাদের নিজেদের ভূরাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির এ দ্বিচারিতা ও ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হচ্ছে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের হাত ধরে বিশ্বে গণতন্ত্র প্রসারের নীতি শুরু হয়। কিন্তু বাস্তবে কৌশলগত প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র অনেক অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরশাসককেও সমর্থন জুগিয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বিস্তার রোধ করা। এ উদ্দেশ্যে তারা লাতিন আমেরিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক একনায়কতান্ত্রিক ও সামরিক সরকারকে সমর্থন দিয়েছে।
১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে কংগ্রেসের চাপে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রকে কিছুটা বেশি গুরুত্ব দেওয়া শুরু হয়। স্টেট ডিপার্টমেন্টের আনুষ্ঠানিক নীতিতে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সুরক্ষাকে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলা হলেও, বাস্তব ক্ষেত্রে তারা বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কূটনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তাকেই বেশি প্রাধান্য দিত।
যুক্তরাষ্ট্রসহ যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। প্রায়ই আন্তর্জাতিক যুদ্ধ, সংঘাত বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কোনো স্থায়ী সদস্য নিজের বা মিত্র দেশের স্বার্থ রক্ষায় ভেটো (veto) প্রয়োগ করে থাকে। এর ফলে সংকট নিরসনে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যকার রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সংকট বা যুদ্ধাবস্থায় নিরাপত্তা পরিষদ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে না। এ জন্যই এ পাঁচটি রাষ্ট্র পরাশক্তি হিসেবে পরিচিত। অবশ্য নিরাপত্তা পরিষদের আলোচ্যসূচি নির্ধারণের পদ্ধতিগত বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্থায়ী সদস্যরা ভেটো দিতে পারে না। যাই হোক, সেই রাষ্ট্রকে পরাশক্তি বলা হয়, যে রাষ্ট্র অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রভাবশালী, যা তার অসামান্য সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক আধিপত্য এবং রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বে বা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একচ্ছত্র বা নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।
বিশ্বের সার্বভৌম ১৯৫টি দেশের মধ্যে প্রায় ১৬০টির বেশি দেশে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ১৬০টি দেশ, যার মধ্যে বাংলাদেশও আছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার পরিবর্তে দেশটি তার বলয়ে টানতে বেশি আগ্রহী। এর কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বড় ধরনের বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং প্রবাসী আয়সহ অনেক ধরনের সম্পর্কের পাশাপাশি ‘নিরাপত্তা সহযোগিতা’ আছে, যা মার্কিন জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ মিত্র রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের নানা ধরনের সম্পর্ক রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে ঘিরে ভূরাজনীতি। প্রধানত এ জন্যই যুক্তরাষ্ট্র নানাভাবে বাংলাদেশকে চাপে রেখে চীনের বলয়ের বাইরে রাখতে চায়। এটাই বাংলাদেশের ওপর চীনের অর্থনৈতিক এবং সামরিক প্রভাব ঠেকানোর যুক্তরাষ্ট্রের মূল কৌশল। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (কৌশল) হলো এ অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিহত করা। অন্যদিকে, চীনও যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েনের জন্য ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই বাংলাদেশকে পাশে পেতে চায়।
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি ঘোষণা করে, সেখানে দেখানো হয়েছে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূমি বিশ্বের ২৫ শতাংশ ও সমুদ্র ৬৫ শতাংশ। এ অঞ্চলের দেশগুলোর জনসংখ্যা বিশ্বের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি, যার ৫৮ শতাংশই তরুণ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৈশ্বিক অর্থনীতির দুই-তৃতীয়াংশ, জিডিপি ৬০ শতাংশ ও ভোক্তা ৬০ শতাংশ। এই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীন, ভারত, পাকিস্তান, জাপান, কোরিয়াসহ এক ডজনের বেশি উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ আছে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, সব মিলিয়ে এ অঞ্চল হয়ে উঠছে বৈশ্বিক রাজনীতির ভরকেন্দ্র এবং আগ্রহের কারণ।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চতুর্থ চুক্তি: এদিকে চুক্তির হিড়িক দেখা যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চুক্তি হচ্ছে, মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক বিমানগুলো বাংলাদেশের বন্দর ও বিমানঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা চুক্তি (যেমন: আকসা-ACSA) চূড়ান্ত হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। এর আগে বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির মধ্যে থাকা তিনটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে ‘অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং অ্যাগ্রিমেন্ট’ (ACSA) এবং ‘জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট’ (GSOMIA) চুক্তি দুটি স্বাক্ষরের পর মার্কিন নৌবাহিনী বঙ্গোপসাগরে তাদের অপারেশনাল সক্ষমতা ও কৌশলগত অবস্থান জোরদার করতে পারবে। এর আগে ১৪ মে ২০২৬ তারিখে জ্বালানি খাতে কৌশলগত সহযোগিতার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন জ্বালানি বিভাগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট এ এমওইউ স্বাক্ষর করেন। এই এমওইউতে উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো: এলএনজি, এলপিজি, তেলসহ অন্যান্য জ্বালানি পণ্য প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির পথ সুগম হবে। এর আওতায় আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য কেনার সম্ভাবনা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর জ্বালানিনির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ এমওইউ বা শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া তেল, গ্যাস, ভূতাপীয় শক্তি এবং বায়ো এনার্জি খাতে যৌথ গবেষণা ও প্রযুক্তি বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হবে। জ্বালানির পাশাপাশি লুইজিয়ানা-ভিত্তিক আর্জেন্ট এলএনজির সঙ্গে ২০ বছর মেয়াদে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির আরেকটি প্রাথমিক চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক হ্রাস, অশুল্ক বাধা অপসারণ, ডিজিটাল বাণিজ্য, শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা, জাতীয় নিরাপত্তা সহযোগিতাসহ বিস্তৃত বিষয়ের ওপর ‘আনডিসক্লোজড’ (গোপন) চুক্তি স্বাক্ষর করে। ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘বাণিজ্য চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। এ চুক্তির বিষয়গুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সীমাহীন নিয়ন্ত্রণ বলে দেয়, এ চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের অনুগ্রহ পাওয়ার আশায় বাংলাদেশকে সরাসরি মার্কিন প্রভাব বলয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া। অবশ্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের গোপন চুক্তি বা চুক্তির আওতায় জ্বালানি আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি নেওয়ার দাবি ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’। বিদ্যমান সব চুক্তিই প্রকাশ করা হয়েছে।”
সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও এ চুক্তিটি সম্পর্কে অন্তর্বর্তী সরকার জাতিকে অবহিত করার প্রয়োজন মনে করেনি। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করেছে। ১৫ মে ওয়াশিংটন ডিসিতে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। সাশ্রয়ী মূল্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এবং অন্যান্য জ্বালানি পণ্য আমদানির পথ সুগম করা। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর জ্বালানি নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
তেল, গ্যাস, জিওথার্মাল এবং বায়োএনার্জি খাতে গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দুই দেশ যৌথভাবে কাজ করবে। প্রতি বছর ৩৫০ কোটি ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য কিনতে হবে। সামরিক সরঞ্জামাদি কেনার পরিমাণ বাড়াতে হবে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তিতে উল্লিখিত চারটি বিষয়ের ওপর চুক্তি করেছে বাংলাদেশ সরকার। জাতীয় সংসদেও এ চারটি চুক্তির ওপর সরকারি বা বিরোধী দল কোনো আলোচনাই উত্থাপন করেনি।
অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, চুক্তির আংশিক বাস্তবায়ন হওয়া মানেই পুরো চুক্তি বাস্তবায়ন হওয়ার পথে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের অতিরিক্ত কর আরোপ করা নাকচ করে দিয়েছেন। আমেরিকার বন্ধু দেশের সংগঠন ইউরোপীয় ইউনিয়নও নাকচ করেছে। বাংলাদেশ ছয় মাসের মধ্যে পর্যালোচনা করতে পারত, কিন্তু বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলই চুক্তির বিষয়ে নীরব। জামায়াতে আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিকে ‘বাস্তবতার আলোকে’ দেখতে বলেছেন।
আসলে সত্যটা কী, তা পাঠকের বিচার-বিশ্লেষণের জন্য চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো গত ৩০ এপ্রিল কালবেলায় ‘মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির ফাঁদে বাংলাদেশ’ শিরোনামে প্রকাশ হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকার আমেরিকার সঙ্গে অনেক বিষয় নিয়ে চুক্তি করে বাংলাদেশকে চুক্তি করার ফাঁদে ফেলেছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যতে চুক্তির হিড়িক দেখা যেতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট