

ইরানকে পরাজিত করতে না পারা এবং হরমুজ প্রণালি ফের খুলতে বাধ্য করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকে কেউ কেউ ‘হতাশার কৌশল’, ‘ঐতিহাসিক ভুল’ এবং ‘কৌশলগত পরাজয়’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্টের একটি বিশ্লেষণে স্যাটেলাইট চিত্রের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, এ সংঘাতে অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোর যে ক্ষতি হয়েছে, তা মার্কিন সরকার প্রকাশ্যে যতটা স্বীকার করেছে বা আগে যতটা জানা গিয়েছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি। এ যুদ্ধ গোটা বিশ্বের সামনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরেছে। রক্ষণশীল চিন্তাবিদ রবার্ট কাগান পর্যন্ত একে ইরানের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘চেকমেট’ বলে উল্লেখ করেছেন। আবার কেউ কেউ এটিকে ‘আমেরিকার সুয়েজ মুহূর্ত’ বলেও অভিহিত করছেন।
তবে এ ধরনের বিশ্লেষণ অনেকাংশেই বাস্তব পরিস্থিতিকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। কারণ, এতে যেমন ট্রাম্পের প্রকৃত উদ্দেশ্য উপেক্ষিত হচ্ছে, তেমনি সুয়েজ সংকটের ঐতিহাসিক তাৎপর্যও যথাযথভাবে বিবেচিত হচ্ছে না। ১৯৫৬ সালে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েলের গোপন সমঝোতার মাধ্যমে মিশর দখল এবং দেশটির নেতা গামাল আবদেল নাসেরকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মিশরের সামরিক প্রতিরোধ, যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক চাপ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমাণবিক হুমকির কারণে সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। এ সংকট ব্রিটেনের দুর্বলতাকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে দেয়। এর পরের বছর থেকেই ব্রিটেন আনুষ্ঠানিকভাবে উপনিবেশমুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পুরোনো খেলার সমাপ্তি ঘটেছিল। কিন্তু একই সময়ে আরেকটি নতুন খেলা শুরু হচ্ছিল।
অফশোর অর্থব্যবস্থার ইতিহাস নিয়ে লেখা ‘ট্রেজার আইল্যান্ডস’ বইয়ে নিকোলাস শ্যাকসন উল্লেখ করেছেন, ‘এ ঘটনার একটি আর্থিক দিক রয়েছে, যা খুব কম মানুষই জানেন। সুয়েজ সংকটের ধ্বংসস্তূপ ও আগুনের ভেতর থেকে লন্ডনে নতুন কিছু গড়ে উঠতে শুরু করেছিল, যা পরবর্তীকালে পুরোনো সাম্রাজ্যের জায়গা নেবে এবং লন্ডনের আর্থিক কেন্দ্রকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে।’
পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটেন বুঝতে শুরু করেছিল যে, সরাসরি উপনিবেশ শাসনের ব্যয় তার আয়ের তুলনায় বেশি হয়ে যাচ্ছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড ম্যাকমিলান বলেছিলেন, উপনিবেশ ধরে রাখার জন্য যে বিপুল সামরিক ব্যয় করতে হচ্ছে, তা দেশের অর্থনীতিকে ভেঙে দিচ্ছে। বিশেষ করে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ ছিল বিশাল বোঝা। তবে উপনিবেশ ছেড়ে দেওয়ার মধ্যেও একটি বড় ঝুঁকি ছিল। ব্রিটেনের আশঙ্কা ছিল, উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনগুলো নিজেদের ভূমি ও সম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে। এ পরিস্থিতিতে ব্রিটেন এমন একটি ব্যবস্থা চাইছিল, যাতে এ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় দমনমূলক দায়িত্ব অন্যদের হাতে তুলে দেওয়া যায় অথবা ভাগ করে নেওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত তারা অনেকাংশে এ দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় রাজতন্ত্র এবং সাবেক উপনিবেশগুলোয় নিজেদের পছন্দের সামরিক শাসকদের হাতে তুলে দিতে সক্ষম হয়। একই সময়ে এ নতুন ধরনের ‘দায়িত্ব ভাগাভাগির সাম্রাজ্যবাদ’ ব্রিটেনকে ব্যয় কমানোর সুযোগ দেয়। পাশাপাশি লন্ডনের আর্থিক খাতকে নতুনভাবে গড়ে তুলে আয়ের নতুন উৎসও তৈরি করে।
যুক্তরাজ্য সরকার যখন আন্তর্জাতিক স্টার্লিং বাণিজ্যের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করল, তখন লন্ডনের বণিক ব্যাংকগুলো সহজেই ডলারে ঋণ দেওয়া শুরু করল। এরপর এক চমকপ্রদ কৌশলের মাধ্যমে এ ডলার লেনদেনগুলোকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দৃষ্টিতে যুক্তরাজ্যের বাইরে সংঘটিত লেনদেন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাস্তবে সেগুলো অন্য কোনো দেশের আওতায়ও ছিল না। ফলে কোনো রাষ্ট্রই এ নতুন বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। ফলাফল ছিল জল্পনা-কল্পনা, ঋণ ও বিনিয়োগের এক স্বর্গরাজ্য, যেখানে কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রক তদারকি ছিল না। এ বাজার পরবর্তী সময়ে ‘ইউরোমার্কেট’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
শ্যাকসনের ভাষায়, ‘সুয়েজ সংকটের কয়েক মাসের মধ্যেই আধুনিক অফশোর আর্থিক ব্যবস্থার প্রকৃত সূচনা ঘটে। ব্রিটেনের আনুষ্ঠানিক সাম্রাজ্য আরও সূক্ষ্ম ও জটিল এক ব্যবস্থার কাছে জায়গা ছেড়ে দেয়। বাহ্যিকভাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মুহূর্তেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্য যেন নতুন রূপে পুনর্জন্ম নিতে শুরু করে।’
অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ গ্যারি বার্নের মতে, এটি ছিল ‘ব্যাংকনোট আবিষ্কারের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক উদ্ভাবন।’
পরবর্তী এক দশকে ইউরোমার্কেট লন্ডন থেকে ছড়িয়ে পড়ে ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন দ্বীপাঞ্চলে। এভাবেই গড়ে ওঠে বিশ্বব্যাপী করস্বর্গ বা ট্যাক্স হেভেনের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক। চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জ, ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট ছোট দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত এ নেটওয়ার্ক আজও বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো থেকে বিপুল সম্পদ শুষে নিচ্ছে। এর পরিমাণ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং সেই অর্থের বড় অংশই শেষ পর্যন্ত লন্ডনে ফিরে আসে। এভাবে লন্ডন শুধু তার আর্থিক আধিপত্য বজায় রাখার পথই খুঁজে পায়নি, ঔপনিবেশিক বিশ্বব্যবস্থাকে সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগের তুলনায় আরও বেশি লাভজনক ব্যবস্থায় পরিণত করতেও সক্ষম হয়েছে।
নতুন এক সাম্রাজ্য: ১৯৫৬ সালে সুয়েজ সংকটের সময় ব্রিটেন যেমন সামরিক অপমানের মুখে পড়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রও আজ তেমন একটি পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে। তবে একই সঙ্গে তারা আর্থিক আধিপত্যের একটি নতুন কাঠামোও গড়ে তুলছে।
বিশ্লেষক রিচার্ড মেডহার্স্টের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বৃহত্তর এক পরিকল্পনার অংশ। এর লক্ষ্য বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক শক্তিতে রূপান্তরিত করা, যাকে তিনি ‘জলদস্যু রাষ্ট্র’ বলে অভিহিত করেছেন। বর্তমানে বিশ্বের তেল ও গ্যাস সম্পদের ওপর সশস্ত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি মনে করেন। এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ ছিল চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। একই সঙ্গে রাশিয়ার তেলশিল্পের বিরুদ্ধেও একটি বৈশ্বিক অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ক্যারিবীয় অঞ্চল, উত্তর আটলান্টিক, ভূমধ্যসাগর, কৃষ্ণসাগর ও বাল্টিক সাগরে বিভিন্ন তেলবাহী জাহাজ আটক করেছে। পাশাপাশি তেল শোধনাগার ও রপ্তানি কেন্দ্রগুলোও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে রাশিয়ার রপ্তানি সক্ষমতার প্রায় ৪০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। একই সময়ে ট্রাম্পের আরোপিত নৌ অবরোধ ইরানের রপ্তানিকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করেছে। অন্যদিকে ইরানের পাল্টা অবরোধ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানিও ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে বিশ্ব ক্রমশ তেল ও গ্যাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আর এ লেনদেনের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে মার্কিন ডলার। এ পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো মার্কিন জ্বালানির ওপর বৈশ্বিক নির্ভরতা সৃষ্টি করা, যাতে দুর্বল হয়ে পড়া ডলারকে নতুন করে শক্তিশালী করা যায় এবং ডলারের বিকল্প মুদ্রা ব্যবহারের যে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা থামিয়ে দেওয়া যায়।
এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইরানের আত্মসমর্পণ বা ইরান রাষ্ট্রের পতন অপরিহার্য নয়। দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদ কার্ল মার্ক্স একসময় সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘শাসকশ্রেণি যখন নিজেদের সংকট মোকাবিলার জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তখন সেই পদক্ষেপগুলো প্রায়ই ভবিষ্যতে আরও বড় এবং আরও ধ্বংসাত্মক সংকটের ভিত্তি তৈরি করে। একই সঙ্গে সংকট প্রতিরোধের উপায়গুলোও দুর্বল হয়ে যায়।’ ট্রাম্প বর্তমানে ঠিক এমনই একটি পথ অনুসরণ করছেন। আর এ ঝুঁকিপূর্ণ কৌশলের চূড়ান্ত পরিণতি হতে পারে মানবজাতির সবচেয়ে বড় সংকট, অর্থাৎ একটি বৈশ্বিক যুদ্ধ, যার আশঙ্কা দিন দিন আরও বাস্তব হয়ে উঠছে।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক। মিডল ইস্ট আইয়ে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ