

৭ জানুয়ারি ১৯৭৭। এটাই বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্মদিন। কিন্তু কীভাবে? প্রশ্নটার উত্তর পেতে হলে আপনাকে বিরাট একটা গল্পের ভুবনে ঢুকে পড়তে হবে।
ঠিক ৪৯ বছর আগে ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ দল কি প্রথম ওয়ানডে খেলেছিল? না। প্রথম টেস্ট খেলার প্রশ্ন ওঠে না। কারণ, ২০০০ সালের আগে দেশটি টেস্ট স্ট্যাটাসই পায়নি। তাহলে? মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাবের (এমসিসি) বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচটি ছিল ১৯৭৭ সালের ৭ জানুয়ারি। খেলা হয়েছিল ঢাকা স্টেডিয়ামে। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম থেকে বর্তমানে যার নাম ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়াম। এই মাঠেই ৪৯ বছর আগে শামীম কবিরের নেতৃত্বে বিসিবি একাদশ নামে একটি দল খেলেছিল। ওটাই ছিল এ দেশের মাটিতে প্রথম ‘বাংলাদেশ’ নামে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ। আর সেই ঐতিহাসিক ম্যাচটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রবেশাধিকারের পথ খুলে দিয়েছিল।
ম্যাচটা আয়োজনের পেছনে একটা গল্প আছে। ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করতে গিয়েছিলেন সৈয়দ আশরাফুল হক। বিখ্যাত এই ক্রীড়া সংগঠক তখন চুটিয়ে ক্রিকেট খেলেন। এমসিসির বাংলাদেশে আসার পুরো কৃতিত্বটা তার। রবিন মারলারের সঙ্গে যোগাযোগ করেই এমসিসিকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা তিনিই করেছিলেন। সাবেক ইংলিশ ক্রিকেটার ও ক্রিকেট সাংবাদিক মারলার তখন কেমব্রিজে পড়েন। খেলতেন কাউন্টি ক্লাব সাসেক্সে। রবিন মারলার ছিলেন মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাবের সভাপতি। পরে বিখ্যাত দ্য সানডে টাইমসের সাংবাদিক। খেলোয়াড়ী জীবনে ছিলেন একজন দক্ষ অফস্পিন বোলার। সাসেক্স দলের অধিনায়কত্বও করেছেন। স্পষ্টভাষী ও বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য পরিচিত মারলারকে অনেক চেষ্টায় বাংলাদেশ সফরের জন্য রাজি করিয়েছিলেন সৈয়দ আশরাফুল হক।
২০১৭ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট সাপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএসএ) এমসিসির বিপক্ষে সেই ম্যাচে বাংলাদেশ দলে থাকা খেলোয়াড়দের সংবর্ধনা দিয়েছিল। সেখানেই বাংলাদেশ দলের হয়ে সর্বোচ্চ রান করেন ইউসুফ বাবু। ৭ জানুয়ারির ম্যাচের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘পূর্বাণী হোটেল থেকে ঢাকা স্টেডিয়াম (ঢাকা জতীয় স্টেডিয়াম) কতটাই বা পথ। এই পথের দুপাশে আমাদের দেখতে হাজার হাজার লোক দাঁড়িয়ে ছিল। খেলতে নেমে ইনিংসের বেশিরভাগ সময় থাইপ্যাড ছাড়াই ব্যাট করেছিলাম। উপায় ছিল না, পুরো দলের কাছে থাইপ্যাড ছিলই মাত্র তিনটি। সেই তিন প্যাডের একটি ছিল সৈয়দ আশরাফুল হকের। এমসিসির বাংলাদেশে আসার কৃতিত্বটা ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করতে যাওয়া আশরাফুলকে দিতে হবে।’ ইউসুফ বাবুর সঙ্গে একমত তার সতীর্থ শাকিল কাসেমও, ‘রবিন মারলারের সঙ্গে যোগাযোগ করেই এমসিসিকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন সৈয়দ আশরাফুল হক।’ বাংলাদেশ দল সেদিন কোনো কোচ ছাড়াই খেলতে নেমেছিল। ফিজিও ট্রেনার দূরের কথা, ক্রিকেটাররা যে দুধ ও বিস্কুট খেয়েছিলেন, সেটাও এসেছিল বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি থেকে। সেই ম্যাচ খেলা পেসার দীপু রায় চৌধুরী বলেছিলেন, ‘আমরা অনেকেই খেলেছি অন্যের সরঞ্জাম ধার করে।’ এত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের ইনিংসে সর্বোচ্চ ৭৮ রান করেছিলেন ইউসুফ বাবু। সেই ম্যাচে বাংলাদেশ দলের অন্যতম ক্রিকেটার ছিলেন শফিকুল হক হীরা। যিনি বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ নিয়ে সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘মূল প্রশ্ন ছিল আমাদের সহযোগী সদস্য করবে কি করবে না। কারণ, আমরা পূর্ব পাকিস্তান ছিলাম, মুক্তিযুদ্ধের পর দুই বছর এবং শেখ মুজিবুর রহমান মারা যাওয়ার পর বেশ কয়েকদিন ক্রিকেট বন্ধ ছিল। ফুটবল তখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে, সবাই ছিল ক্রিকেটের বিরুদ্ধে। লোকের ঝোঁক ছিল ফুটবলের দিকে। ক্রিকেটকে মনে করা হতো বনেদি খেলা, তাই অনেকেই ক্রিকেটের বিরুদ্ধে ছিলেন। সবাই ভাবত পাকিস্তান ভালো ক্রিকেট খেলত, কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশও যে ভালো ক্রিকেট খেলত, সেটা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ছিল না।’ এমসিসির বিপক্ষে সেই ম্যাচের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মেলে। আর বাংলাদেশ ক্রিকেটও গুটি গুটি পায়ে চলতে চলতে বর্তমানের সাবালক অবস্থায় পৌঁছে যায়।
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের প্রথম ম্যাচে ছিলেন যারা
শামিম কবির (অধিনায়ক), রকিবুল হাসান (সহ-অধিনায়ক), শফিকুল হক হীরা, মাইনুল হক, ওমর খালেদ, এ এস এম ফারুক, সৈয়দ আশরাফুল হক, ইউসুফ রহমান বাবু, দৌলতুজ্জামান, দিপু রায় চৌধুরী ও খন্দকার নজরুল কাদের লিন্টু।