

ফুটবলের ইতিহাস ঘাঁটলে অনেক দুর্ভাগ্যের গল্প পাওয়া যাবে। এবারের বিশ্বকাপের ইরান যেন দুর্ভাগ্যের সংজ্ঞাকে নতুনভাবে লিখল। মাঠের ভেতর-বাইরে—দুই দিক থেকেই নিষ্ঠুর নিয়তির মুখোমুখি হতে হয়েছে দলটিকে।
মার্কিন-ইসরায়েল হামলায় ইরান যখন যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে, তখন বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ নিয়েই ছিল চরম অনিশ্চয়তা। ইরানের প্রশিক্ষণ শিবির অ্যারিজোনার টাকসন থেকে সরিয়ে নিতে হয় মেক্সিকোর তিজুয়ানায়। বাতিল করা হয় দলটির টিকিট বরাদ্দ, ১১ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ভিসা পাননি এবং ইরানি কর্তৃপক্ষ একাধিকবার দল প্রত্যাহারের হুমকি দেয়। তার পরও ‘টিম মেল্লি’ মাঠে নামল। এই একটি সিদ্ধান্তই ছিল অসাধারণ সাহসের প্রমাণ।
ভিসার শর্ত অনুযায়ী ইরান দলকে ম্যাচের মাত্র একদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দলের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করার বাধ্যবাধকতাও ছিল। অর্থাৎ পেশাদার ফুটবলে রিকভারির জন্য যে সময় ও লজিস্টিক্যাল সহায়তা অপরিহার্য, তা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত ছিল দলটি। অধিনায়ক মেহদি তারেমি বললেন, ‘ব্যাকরুম স্টাফরা ভিসা না পাওয়ায় দলের কাছে সঠিক সহায়তা পৌঁছানোই সম্ভব হয়নি।’
এত প্রতিকূলতার মাঝেও ইরান লড়েছে। নিউজিল্যান্ড ও বেলজিয়ামের সঙ্গে ড্র করে সিয়াটলে মিশরের মুখোমুখি হয় দলটি। জয় পেলেই ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নকআউটে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হতো। পঞ্চম মিনিটে পিছিয়ে পড়েও দলটি সমতায় ফেরে। তারপর যোগ করা সময়ে বল জড়ায় মিশরের জালে—শোজা খলিলজাদেহর সেই গোলে সিয়াটল স্টেডিয়াম যেন কেঁপে ওঠে। কিন্তু উদযাপন শেষ হওয়ার আগেই স্কোরবোর্ডে ভেসে ওঠে ভিএআর চ্যালেঞ্জ। কয়েক মিনিটের যন্ত্রণাদায়ক অপেক্ষার পর জানা যায়—গোল বাতিল, অফসাইড। খলিলজাদেহর পায়ের পাতা প্রতিপক্ষের শেষ ডিফেন্ডারের চেয়ে চুলের ফারাকে এগিয়ে ছিল। ম্যাচ ১-১-এ শেষ হলো। ইরানের ভাগ্য চলে গেল অন্যদের হাতে। আলজেরিয়া-অস্ট্রিয়ার ম্যাচে ৯৩ মিনিটে রিয়াদ মাহরেজের গোলে আলজেরিয়া এগিয়ে গেলে ইরানের নকআউটের সম্ভাবনা ফের জাগল। কিন্তু একেবারে শেষ সেকেন্ডে সাসা কালাদজিচের হেডারে গোল শোধ করে অস্ট্রিয়া। ইরানের স্বপ্ন ভাঙল দ্বিতীয়বার, মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে। এ কষ্টের যেন কোনো ভাষা নেই!
মাঠ থেকে বেরিয়ে তারেমি ক্ষোভ ঢালতে থাকেন, ‘এটা একটা দুর্যোগের বিশ্বকাপ, একটা বিপর্যয়। ফিফার উচিত ছিল সব সমস্যার সমাধান করা, কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে শুরু থেকেই তারা পারেনি।’ দলের অধিনায়ক জানান, নিউজিল্যান্ড ম্যাচের পরে ইনফান্তিনো নিজে ড্রেসিং রুমে এসে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু গ্রুপ পর্ব শেষ হওয়া পর্যন্ত তেমন কিছুই বদলায়নি।
কোচ আমির ঘালেনোই বলেন, ‘এই তরুণরা, এই খেলোয়াড়রা যা করেছে তা ইতিহাসে লেখা থাকা উচিত। কারণ আয়োজক দেশ আমাদের সঙ্গে চরম অন্যায় করেছে। তাদের আচরণ সত্যিই ভয়াবহ ছিল এবং আমি আশা করি পুরো বিশ্ব সে সম্পর্কে সচেতন হবে।’ ইরান কোচ আরও বলেন, ‘দুই সপ্তাহ আগে এলে দল আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারত, কিন্তু সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। শরীর ও মন দুদিক থেকেই।’ ঘালেনোই ফিফা প্রেসিডেন্টের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি ফিফাকে অনুরোধ জানাচ্ছি, ভবিষ্যতে আয়োজক দেশ যেন দলগুলোর সঙ্গে এই একই আচরণ করার সুযোগ না পায়। আমি আশা করি, ইনফান্তিনো এই আচরণের বিরুদ্ধে সত্যিই দাঁড়াবেন।’
ম্যাচ শেষে ইরান খেলোয়াড়রা ড্রেসিংরুমে একটি হাতে লেখা চিঠি রেখে গেছেন—সিয়াটলের মানুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা, ইরানিদের প্রতি ভালোবাসা এবং ফুটবলকে ‘চরিত্রের পরীক্ষা’ বলে বর্ণনা করে। এই ছোট্ট চিঠিতে যেন লুকিয়ে আছে পুরো ইরান দলের আত্মার কথা—অবিচারের মুখেও মাথা না নোয়ানোর গল্প।
খেলাধুলার ময়দানে জয়-পরাজয় থাকে। কিন্তু যে দল যুদ্ধ, ভিসা নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক বৈরিতা, ঘুম ও রিকভারিহীন যাত্রা পেরিয়েও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়তে পারে, তারা শুধু পরিসংখ্যানে নয়, মানবিক অর্জনেও অনেক ওপরে থাকে। ইরানের এই বিশ্বকাপ বিদায় হয়তো স্কোরকার্ডে ড্রয়ের সারি, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এটি এক অদম্য লড়াইয়ের দলিল।
এদিকে বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব শেষে সেরা আট তৃতীয় স্থানধারী দলের মধ্যে জায়গা করতে না পারায় টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে স্কটল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়া। দুই দলই একটি করে ম্যাচ জিতলেও বাকি দুটি ম্যাচে হেরে নকআউট পর্বে ওঠার স্বপ্ন ভেঙে যায়।