

বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় অবকাঠামো শিল্পায়ন ও প্রযুক্তির পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতকে মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণখাতে প্রায় ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য বাজেট এবং আগের অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। অর্থনীতিবিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বরাদ্দ বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক; তবে এই অর্থের কার্যকর বাস্তবায়নই নির্ধারণ করবে দেশের স্বাস্থ্যসেবায় কাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে কি না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় এখনও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। ফলে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশ জনগণকে নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করতে হয়। চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে প্রতিবছর বহু পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে, ঋণ নেয় কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যখাতের অন্যতম বড় সমস্যা রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থা। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং আধুনিক রোগ নির্ণয় সুবিধার ঘাটতির কারণে রোগীদের ঢাকামুখী হতে হয়। এতে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বড় হাসপাতালগুলোতেও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর) বলছে, বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্ব, হাসপাতালের অবকাঠামো উন্নয়ন, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সংগ্রহ এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার প্রতি নীতিগত সমর্থন ইতিবাচক অগ্রগতি নির্দেশ করে। তবে জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা কর্মসূচির সুস্পষ্ট রোডম্যাপ, অসংক্রামক রোগের জন্য পৃথক তহবিল এবং স্বাস্থ্য মানবসম্পদ উন্নয়নের পরিকল্পনা আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, সরকার শুধু হাসপাতাল নির্মাণ নয়, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা অবকাঠামো, আধুনিক যন্ত্রপাতি, জনবল বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবাকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। এজন্য এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে আগের তুলনায় দ্বিগুণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে বিএনপি সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এরমধ্যে ই-হেলথ কার্ড বিষয়ে ইতোমধ্যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এসএম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থা হবে প্রযুক্তিনির্ভর। টেলিমেডিসিন, ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোগ নির্ণয় এবং জেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসা সম্প্রসারণে সরকার ধাপে ধাপে কাজ করছে। তিনি বলেন, বাজেটে এখাতে এবার রেকর্ড বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই বরাদ্দ প্রমাণ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের স্বাস্থ্যখাত উন্নয়নে খুবই আন্তরিক।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ এর চেয়ারপারসন ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি অবশ্যই ইতিবাচক। তবে বাজেটকে কেবল ব্যয় হিসেবে নয়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। স্বাস্থ্যবীমা, জেলা হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ক্যানসার ও অসংক্রামক রোগ মোকাবিলা এবং দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী তৈরির মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতকে নতুন উচ্চতায় নেওয়া সম্ভব। আগামী পাঁচ বছরে স্বাস্থ্য খাতের চারটি কৌশলগত অগ্রাধিকার হওয়া উচিত—স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় জিডিপির অন্তত ২ শতাংশে উন্নীত করার রোডম্যাপ তৈরি করা, ধাপে ধাপে জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা বাস্তবায়ন করা, জেলা ও উপজেলা হাসপাতাল আধুনিকীকরণ করা এবং ক্যানসার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যকে কেন্দ্র করে জাতীয় অসংক্রামক রোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ায়। কিন্তু শুধু বরাদ্দ বাড়লেই হবে না, অর্থের দক্ষ ব্যবহার, জবাবদিহিতা ও ফলাফলভিত্তিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তিনি জানান, বাংলাদেশ বর্তমানে একই সঙ্গে সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের দ্বৈত চাপে রয়েছে। ডেঙ্গু, যক্ষ্মা ও হাম মোকাবিলার পাশাপাশি দ্রুত বাড়ছে ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংকট। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী অসংক্রামক রোগ। এসব রোগের চিকিৎসা সুনিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের স্বাস্থ্য বাজেট দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বরাদ্দের স্বচ্ছ ব্যবহার, দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন, দক্ষ জনবল গড়ে তোলা এবং স্বাস্থ্যসেবাকে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সমানভাবে পৌঁছে দেওয়া। এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এবারের বাজেট বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘমেয়াদি আধুনিকায়ন ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।