

একজন আর্লিং হলান্ড। অন্যজন মার্টিন ওডেগার্ড। নরওয়ের আক্রমণভাগের দুই কান্ডারি। মজার ব্যাপার কি জানেন। কান্ডারি শব্দটা লেখার সঙ্গে সঙ্গে নৌকার কথা মনে পড়ছে। আর অবধারিতভাবে মনের মধ্যে ঢুকে পড়ছে তরী বাওয়ার দৃশ্য। নরওয়ের বিখ্যাত ভাইকিং রো উদযাপন। নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে হলান্ডের জলদস্যু সাজের উদযাপন কি থামাতে পারবে ব্রাজিল? কার্লো আনচেলত্তির দলে এত বেশি প্রতিভার সমাবেশ আছে যে উত্তর কি হতে যাচ্ছে তা অনুমেয়।
হলান্ডকে থামাতে ব্রাজিলের ভরসা মিডফিল্ড। ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নরওয়ের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে মিডফিল্ডের ভারসাম্য। শক্তিশালী স্ট্রাইকার আর্লিং হলান্ডকে থামাতে হলে শুধু রক্ষণ নয়, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণই হবে কোচ কার্লো আনচেলত্তির প্রধান অস্ত্র। ইতালিয়ান কোচের অসাধারণ খেলোয়াড় ব্যবস্থাপনা, দৃঢ় সিদ্ধান্ত এবং শান্ত নেতৃত্ব প্রতিভাবান সেলেসাও দলকে নতুন আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছে। সমর্থকরাও আবার বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন—ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয় আর কেবল স্বপ্ন নয়। জাপানের বিপক্ষে জয়সূচক গোল করা গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি বলেছিলেন, ‘আনচেলত্তি অসাধারণ একজন মানুষ। তিনি যা যা জিতেছেন, কেন জিতেছেন—তা বুঝতে খুব সহজ। তিনি আমাদের ভীষণ আত্মবিশ্বাস দিয়েছেন। বলেছেন, আমরা সমতা ফিরিয়ে আনব, তার পর জিতবও। শুধু নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। তার শরীরী ভাষাই বলে দেয় তিনি কতটা শান্ত। আর সেই শান্ত আত্মবিশ্বাস আমাদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।’ জাপানের বিপক্ষে শেষ ষোলো নিশ্চিত করার ম্যাচে ব্রাজিল প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়ে বড় চাপে পড়েছিল। বিরতির পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন, অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার ক্যাসেমিরোকে তুলে নেওয়া হবে। কারণ জাপানের গোলের সময় তিনি সহজেই পরাস্ত হয়েছিলেন এবং একটি হলুদ কার্ডও দেখেছিলেন। কিন্তু আনচেলত্তি অন্য সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ক্যাসেমিরোকেই মাঠে রাখেন, আর সেই ক্যাসেমিরোই দ্বিতীয়ার্ধে হেডে সমতা ফেরানোর গোল করে ম্যাচে ব্রাজিলকে ফিরিয়ে আনেন। শেষ মুহূর্তে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় পায় সেলেসাও। এই ম্যাচে আনচেলত্তির আরেকটি চমক ছিল বদলি হিসেবে মার্তিনেল্লিকে নামানো। অনেকেই নেইমার, এন্দ্রিক কিংবা ইগর থিয়াগোর মতো আক্রমণভাগের খেলোয়াড়কে প্রত্যাশা করলেও ইতালিয়ান কোচের পরিকল্পনা সফল হয়। মার্তিনেল্লির উপস্থিতিতে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও রায়ান দুই প্রান্তে প্রতিপক্ষকে ব্যস্ত রাখেন, ফলে মাঝখানে তৈরি হওয়া ফাঁক থেকেই আসে জয়সূচক গোল। ব্রাজিলের দায়িত্ব নেওয়ার পর আনচেলত্তির প্রথম বড় সিদ্ধান্ত ছিল ক্যাসেমিরোকে জাতীয় দলে ফিরিয়ে আনা। দীর্ঘদিন বাইরে থাকার পর ফিরে এসে তিনি দলের রক্ষণ ও মাঝমাঠে ভারসাম্য এনে দেন। এর ফলে ব্রুনো গিমারায়েসও আরও স্বাধীনভাবে আক্রমণে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান এবং নিজের সেরাটা খেলতে শুরু করেন। তবে সমস্যা একেবারে কাটেনি। ক্যাসেমিরো ও গিমারায়েসকে নিয়ে মাত্র দুজনের মিডফিল্ড অনেক সময় প্রতিপক্ষের দ্রুত আক্রমণের সামনে দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিশ্বকাপের আগে পানামার বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচেই এই দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছিল। এর পর আনচেলত্তি লুকাস পাকেতাকে তৃতীয় মিডফিল্ডার হিসেবে খেলানোর সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ইনজুরির কারণে পাকেতা এখন দলের বাইরে, যা ব্রাজিলের জন্য নতুন চিন্তার কারণ।
নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে পাকেতার পরিবর্তে তরুণ মিডফিল্ডার দানিলো সান্তোসকে একাদশে দেখা যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে মাঝমাঠে ভারসাম্য কিছুটা বাড়লেও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ থেকেই যাচ্ছে ক্যাসেমিরোকে ঘিরে। কারণ তাকে সামলাতে হবে নরওয়ের সৃজনশীল মিডফিল্ডার মার্টিন ওডেগার্ডকে, যিনি আবার হলান্ডের অন্যতম প্রধান জোগানদাতা। আরেকটি দুশ্চিন্তার বিষয় হলো ক্যাসেমিরো এরই মধ্যে একটি হলুদ কার্ড দেখেছেন। নরওয়ের বিপক্ষে আরেকটি কার্ড দেখলে সম্ভাব্য কোয়ার্টার ফাইনালে তাকে পাবে না ব্রাজিল। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প হিসেবে ফাবিনহো থাকলেও তার রক্ষণাত্মক সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেকের মতে, তরুণ আন্দ্রেই সান্তোসকে দলে নিলে আরও শক্তিশালী বিকল্প পেত ব্রাজিল। বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ে আনচেলত্তির সামনে তাই বড় প্রশ্ন—অভিজ্ঞ ক্যাসেমিরোর ওপর আস্থা রাখবেন, নাকি কৌশলে পরিবর্তন এনে মাঝমাঠকে আরও শক্তিশালী করবেন? হলান্ডের মতো বিধ্বংসী ফরোয়ার্ডকে থামাতে এই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করে দিতে পারে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ যাত্রার ভবিষ্যৎ।